পূর্ববঙ্গ ছিল রবীন্দ্রনাথের মাটির স্বর্গ, আর অবসরের আনন্দ ছিল পদ্মাতীরে

রবীন্দ্রনাথের লেখায় বারবার এসেছে পদ্মানদী, শিলাইদহ এবং বাংলাদেশেরশের প্রসঙ্গ

বীন্দ্রনাথের জীবনের বেশ কয়েকটি পর্ব ছিল। অনেকটা সময়ের ব্যবধানে তার একটি সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। জানালার কঠিন গরাদে আকুল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মনখারাপ করা বালক কেমন করে পৃথিবীর বহুদেশ ঘুরে বেড়াবে, বিশ্বজয় করবে তা ভাবলে রূপকথার মতোই আশ্চর্য লাগে। দেশ বিদেশ ঘুরলেও একটি বিশেষ জায়গার সঙ্গে আত্মার বন্ধন ছিল রবীন্দ্রনাথের। পূর্ববঙ্গ, শিলাইদহ। দেবেন্দ্রনাথের কথার মান্যতা দিতেই তরুণ রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন পদ্মাতীরে, শিলাইদহে। সেখানে গিয়ে পদ্মানদীর প্রেমে পড়েছিলেন তিনি, একথা হলফ করেই বলা চলে। নদীর বুকে বজরা ভাসিয়ে কত মুহূর্ত কাটিয়েছেন। সৃজন করেছেন কত সাহিত্য। একজন সৃজনশীল মানুষের একাকী সময় খুব মূল্যবান। সেই অবসর রবীন্দ্রনাথকে পদ্মানদী দিয়েছিল।

পুব বাংলার মানুষজন, উদার প্রান্তর, নদীপথ, সহজিয়া সুর তাঁর সাহিত্যে ভর করেছে নানা সময়। পদ্মাপার এবং রবীন্দ্রনাথ বহুচর্চিত। কিন্তু কেন পদ্মানদী প্রিয়? শিলাইদহ আর পদ্মার বোটের সঙ্গে এই যে আত্মিক বন্ধন, কী তার মনস্তত্ত্ব? আসলে ব্যস্তজীবনে, হাজার দায়িত্বের ফাঁকে একটু অবসর মনকে তৃপ্তি দেয়। ঠাকুরবাড়ির প্রতিভাবান ছেলের অবসরের আনন্দ ছিল পূর্ববঙ্গ।

ছোটোবেলায় ভৃত্যমহলে বেশিরভাগ সময় কাটাতেন। আকস্মিক মুক্তির মতো কলকাতা এসেছিল ডেঙ্গুজ্বর। পেনেটির বাগানবাড়িতে পরিবারের সকলের সঙ্গে চলে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই প্রথম ঘর থেকে বাইরে যাওয়া। ‘জীবনস্মৃতি’-র পাতায় সেই প্রথম আনন্দ শব্দের পাহারায় আজও আছে— ‘কড়ি-বরগা-দেয়ালের জঠরের মধ্য হইতে বাহিরের জগতে যেন নূতন জন্মলাভ করিলাম।’ তবে একলা মুক্তির কোনো আনন্দ নয়। অভিভাবকদের কড়া শাসনের তর্জনী সংকেত ছিল। উপনয়নের পর যখন বাবার সঙ্গে বোলপুর ও হিমালয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তখন এক অন্য অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেবারে প্রথম এবং একমাত্র বিস্ময় ছিল দেবেন্দ্রনাথকে চেনা। প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষ তখনও রবীন্দ্রনাথের ভাবনার কেন্দ্রে আসেনি। একেবারে একলা নিজের দায়িত্ব নিজে নিয়ে প্রথম যেখানে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেই জায়গাই পদ্মাপাড় এবং শিলাইদহ। এই যে প্রবল টান, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি মুক্তিপিয়াসী মনের স্বাধীনতার আনন্দ। রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে  অনুভব করলেন এই অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানুষকে। তাঁর অক্ষরে জেগে উঠল প্রাণের স্পন্দন।

অনেক দেশবিদেশ ঘোরার পরেও বলেছিলেন, ‘নদীপালিত এ জীবন আমার।’ স্মৃতির ভেলায় করে যাওয়া যাক সেইসব মুহূর্তে। রবীন্দ্রনাথের জমিদারি ছিল কুষ্টিয়া, পাবনা ও রাজশাহী এলাকায়। পরে যখন শিলাইদহকে পিছনে ফেলে জোড়াসাঁকো আর বীরভূমেই থাকতে শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথ, তখন হয়তো স্বপ্নে আসত পদ্মার চর, গোরাই, ইছামতী, নাগর, আত্রাই, বড়াল নদী। মনের নাও ভাসিয়ে একলাই হয়তো বেরিয়ে পড়তেন প্রবীণ রবীন্দ্রনাথ। সূত্রটা তিনি নিজেই তৈরি করেছিলেন— ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা মনে মনে।’ সেই আমলে পাবনা, বিশেষ করে রাজশাহীতে বিলের সংখ্যা ছিল বেশি। সাজাদপুর আর পতিসরে ছিল নিচু মাটি। অল্প বৃষ্টিতেই জলাভূমিতে পরিণত হত। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে বর্ষার চিত্রে হয়তো কোথাও এইসব প্রকৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়কার কলকাতা শহর আর পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি ভাবে শুধু নয়, মানুষজন ও তাদের আচার ব্যবহারও ভিন্ন ছিল। যেন দুটি আলাদা ভুবন।

এখনকার পদ্মার চর

এক রবীন্দ্রনাথের মধ্যে মিশেছিল অনেক ব্যক্তিত্ব। ছদ্মবেশী সেইসব সত্তা হারিয়ে যেতে চাইত চেনা ছকে বাঁধা গণ্ডি পেরিয়ে। ঠাকুরবাড়ির রবি পূর্ববঙ্গের সমাজে দিব্যি মিশে যেতেন। আড্ডা জমাতেন হিন্দু মুসলিম প্রজাদের সঙ্গে। অচেনা মানুষজন, তাঁদের সঙ্গে আলাপপরিচয় এ এক নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। স্কুলপালানো ছেলেটি পূর্ণযৌবনে কলকাতার সমস্ত প্রচারের আলো থেকে পালিয়ে যেতেন পদ্মাপাড়ে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তর পেরিয়ে যেতেন পালকি চড়ে। কখনও নৌকায় বসে চর বিল ছাড়িয়ে দূরে চলে যেতেন রবীন্দ্রনাথ। জমিদার পরিচয়টা তখন ঠুনকো। শুধু শহুরে আভিজাত্যের নির্মোক দূরে রেখে প্রকৃতির রহস্য উপভোগ করতেন কবি রবীন্দ্রনাথ, যিনি সবসময় সুদূরের পিয়াসী। মনের ক্যামেরা ছবি তুলে রাত বুঝি। পরে ‘অধিকতর সত্য’-এর মতো ফিরে ফিরে আসবে টিনের ছাতওয়ালা বাজার, বাখারির বেড়া দেওয়া গোলাঘর, বাঁশঝাড়, আম ,কাঁঠাল, কুলের ঝোপঝাড়, ঘাটে বাঁধা মাস্তুলতোলা বৃহদাকার নৌকার দল। নৌকা এগিয়ে চলত আর ঘাটে আসা নিত্যদিনের কর্মে মগ্ন মেয়েদের কৌতূহলী চোখে ধরা পড়তেন অচিন দেশের মানুষ রবীন্দ্রনাথ। তাসের দেশের রাজপুত্রের মতো যিনি বাঁধনছাড়া, নিয়মহারাদের দলে। কত সব সাধারণ ছবি!

কাজে ব্যস্ত মা আর অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নগ্ন বালক, গরুর জাবনা দিচ্ছে কোনো তরুণী, বিলাপরত প্রৌঢ়া—নিতান্ত সহজ সরল ছবি। অথচ শিল্পীর জহুরি চোখ এইসব ছবিকে একজোট করে কখন বানিয়ে নিয়েছেন তাঁর শিল্পের ঝোলা, তখনও তা ক্রমশ প্রকাশ্য। চিঠিপত্রে প্রায়ই লিখে রাখতেন এইসব অভিজ্ঞতার কথা। গভীর মনোযোগী হয়ে প্রত্যক্ষ করতেন মানুষজন। ভেবেছেন গহীন, গভীর সব কথা। নানা দেশ দিয়ে যেমন নদী চলে, মানুষের স্রোতও তেমনি কলরব সহকারে গাছপালা গ্রামনগরের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চিরকাল ধরে চলেছে— মানুষ নানা শাখাপ্রশাখা নিয়ে নদীর মতোই ছুটে চলেছে। পদ্মাকে তিনি ভালোবেসেছেন। নদীর মতো করে নয়, নারীর মতো অনুভব করে। পদ্মাকে কখনও কখনও তাঁর মনে হয়েছে পাণ্ডুবর্ণ ছিপছিপে মেয়ে। নরম শাড়িটি তাঁর গায়ের সঙ্গে সংলগ্ন। আবার বন্যার সময়কার ভয়াল পদ্মাকে তাঁর মনে হয়েছে শাণিত কুঠার। ভরা পদ্মার উপর একটি সূর্যোদয় দেখেছিলেন তিনি। মনে হয়েছিল। একটি স্নানশুভ্র অলৌকিক জ্যোতিপ্রতিমা যেন উদিত হয়ে নীরব মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে আর ডাঙার উপর কালো মেঘ স্ফীতকেশর সিংহের মতো ভ্রুকুটি করে ধানক্ষেতের মধ্যে থাবা মেলে বসে।

শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি

এই নির্জন প্রাকৃতিক জীবনকে সবচেয়ে ভালোবেসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আসলে এক আশ্চর্য বিচ্ছিন্নতা বোধ ছিল তাঁর মধ্যে। সামাজিক ভাবে পিরালী ব্রাহ্মণ হিসেবেও, ব্রাহ্ম হিসেবেও মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন। যে সময় পূববাংলায় আসা শুরু হয়েছে তাঁর, সেই সময় তাঁর সাহিত্য ও জীবনও অনেকসময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে। এইসব মুহূর্তে আশ্রয়হীনতায় কষ্ট পাওয়া এক মানুষকে ঠাঁই দিয়েছিল পদ্মানদী ও বাংলাদেশের প্রকৃতি। প্রকৃতির কোনো প্রতিদান পাওয়ার চাহিদা ছিল না।

কিন্তু মানুষটির সারাজীবনে রেকারেন্ট মোটিফের মতো ফিরে ফিরে আসবে পদ্মানদী, শিলাইদহ এবং বাংলাদেশ। মনে মনে মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করবেন রবীন্দ্রনাথ— ‘ঐ যে মস্ত পৃথিবীটা চুপ করে পড়ে রয়েছে ওটাকে এমন ভালোবাসি— ওর এই গাছপালা নদী মাঠ কোলাহল নিস্তব্ধ প্রভাত সন্ধ্যা সমস্তটা সুদ্ধ দুহাতে আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে। মনে হয় পৃথিবীর কাছ থেকে আমরা যেসব পৃথিবীর ধন পেয়েছি এমন কি কোনো স্বর্গ থেকে পেতুম?’

প্রতিটি মানুষের প্রিয় জায়গা তাঁর কাছে স্বর্গের মতো। রবীন্দ্রনাথের তরুণ বয়সের অবসরের আনন্দ পদ্মাতীর, পূর্ববঙ্গ ছিল তাঁর মাটির স্বর্গ।

সহায়ক গ্রন্থঃ
চিঠিপত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রমানস ও সৃষ্টিকর্মে পূর্ববঙ্গ, গোলাম মুরশিদ

Developed by DXDasia