
তোমার চলার ছন্দে সঠিক তাল আসছে না, এইভাবে চললে, তুমি দেবদূতের মতো থাকবে না। দানবে রূপান্তরিত হবে
আমি খুব বিশ্বাস থেকে বলতে পারি, রবীন্দ্রনাথের শেষ পর্বের নাটকগুলোর সঙ্গে তাঁর আগেরর নাটকগুলোর কোনো মিল নেই, রবীন্দ্রনাথের সমকালে বাংলা ভাষায় লেখা নাটকগুলোর কোনো মিল নেই, এই সময়ে পৃথিবীতে যেসব দিকপাল নাট্যকাররা নাটক লিখেছেন, তার কোনো মিল নেই।
আমার কাছে খুব রহস্যময় লাগে যে দেশে-বিদেশে, এমনকি তার নিজের লেখা নাট্য সম্ভারের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নচরিত্রের যে-নাটক লেখা তিনি শুরু করলেন, এর আদর্শটা তিনি পেলেন কোথা থেকে? অর্থাৎ ঘরে-বাইরে কোনো মডেলের উপস্থিতি ছাড়াই রবীন্দ্রনাথ এই নাটকগুলো লিখলেন। যেমন ধরা যাক, রবীন্দ্রনাথ যখন নাটক লিখছেন পৃথিবীতে সেসময়ের দিকপাল নাট্যকারদের মধ্যে জেমস ব্যারি আছে, আছেন গলস ওয়ার্দি, বানার্ড শ আছেন, সামারসেট মম লিখছেন, এঁরা প্রত্যেকেই বিশাল শক্তিধর মানুষ; এঁদের নাটকে পরীক্ষা আছে, কিন্তু নাটকের একটা প্রথার মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁরা নাটক লিখছেন। ফর্ম বা প্রথার মধ্যে এঁদের নাটক।
পাশাপাশি যদি ‘রক্তকরবী’ নাটকটাই ধরেন, দেখবেন, এই নাটকটা যেভাবে লেখা হয়েছে, পৃথিবীতে তখন কিন্তু সেই মডেলটা নেই। অর্থাৎ এর কোনো পূর্বাপর নেই। এটা যেন আকস্মিকভাবে তার মধ্যে তৈরি হচ্ছে, অন্তত আমার জ্ঞান-বুদ্ধির মধ্যে এর কোনো দোসর পাই না। দেশের মধ্যেও নেই, বিদেশেও নেই।
হ্যাঁ, ভেবে দেখতে গেলে বোঝা যায়, তখন নাট্যসাহিত্যে একটা পরিবর্তন ঘটছিল, যেমন ইবসেনের মধ্যে, রবীন্দ্রনাথের সে সম্পর্ক সচেতন থাকাটা স্বাভাবিক। ইবসেনের ক্ষেত্রে মধ্যে হয়তো ‘রিয়া্লিজ্ম’ একটা ‘সাফোকেশন’ তৈরি করছিল। তাঁর শেষের দিকের নাটক ওই বাস্তবতাকে ফাটিয়ে একটা সাংকেতিক পথ অনুসন্ধান করছিল। তাঁর শেষের দিকের নাটকের ভেতর সাংকেতিকতা একটা ভিন্ন ব্যঞ্জনা নিয়ে আসছে। স্ট্রিংবার্গের লেখার মধ্যে দেখেছি, বাস্তবতাকে ভেঙে তার মধ্যে একটা স্বপ্নলোক ঢুকছে। এরকম একটা প্রবণতা তখন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ওই নাটকগুলোর সঙ্গে যদি আমরা ‘রথের রশি’, ‘অচলায়তন’, ‘মুক্তধারা’, বিশেষ করে ‘রক্তকরবী’ পাশাপাশি রাখি, দেখব ফর্মের বৈচিত্র্যের দিক থেকে, বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ পরিহার করে একটা রূপক-সংকেতের জগতে, একটা ভিন্ন ধরনের নাটক সৃষ্টি করার আসামান্যতা, বৈপ্লবিক ক্ষমতা সারা পৃথিবীতে তখন একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই ছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আজ পর্যন্ত আমরা যাকে অতিআধুনিক নাটক বলে থাকি তার সঙ্গে ‘ফর্মাল কনটেক্সট’-এ রবীন্দ্রনাথের নাটকের মিল অসাধারণ। প্রথাকে ভেঙে দেওয়া, আপাত বাস্তবতাকে ভেঙে দেওয়া, এটাই তাঁর নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই পর্বের নাটকগুলোর মধ্যে বাস্তবে যা ঘটে তা নেই, ‘ইনার রিয়্যালটি’কে ধরছেন। অন্তর্বাস্তবতার কথা বলছেন। ভাবা যায় না। অথচ গিরীশ কারনাড বলছেন, আজকের যুগের সঙ্গে নাকি রবীন্দ্রনাথের নাটকের মিল পাওয়া যায় না!
কিন্তু আজকের প্রধান সংকটের মূলে তো ধনবাদ রয়েছে। এটা তো একটা আধুনিক সমস্যা- আধুনিক জটিলতা। সে-ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র যে ধনবাদ, শুধু ধনবাদই নয়, আমলাতান্ত্রিকতা নির্ভর ধনবাদ, শ্রমশোষণ এবং মনুষ্যত্বহীন প্রশাসন, যার ফলে চরিত্রগুলো সংখ্যায় পরিণত হয়, পাড়াগুলো ঙ পাড়া, ঠ পাড়ায় পরিণত হয়, ‘ডিহিউম্যানাইজড’ হয়ে যায়… তো… এই যে আধুনিক সমস্যা, যা ‘হিউম্যান রাইটস্’কে কেড়ে নিচ্ছে, মানুষকে ‘ডিহিউম্যানাই্জড’ করছে, এর থেকে সাম্প্রতিক সমস্যা আর কোথায় আছে? রবীন্দ্রনাথ এটা লিখেছেন ১৯২৩ সালে। ‘রক্তকরবী’তে গিরীশ কারনাড যদি আজকের সমস্যা না পান, তবে আমার বলার কিছু নেই। আজকের সমস্যার উৎস নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এবং তাঁর মতো একটা সমাধান তিনি করেছেন।
বুঝতে হবে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন অন্তর্বাস্তবতার কথা এমন একটা বিষয় নিয়ে লিখছেন যেটা পৃথিবীর সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সে-বিষয়গুলির মধ্যে তো ‘সেক্স’ ঢোকার জায়গা থাকে না…। ভাবলে অবাক লাগে, রবীন্দ্রনাথ সারা পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম নাট্যকার, যিনি তাঁর বিষয়গুলো নিয়েছিলেন, চারপাশের ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে নয়, বাঙালি জীবনের স্থানিক সমস্যা নিয়ে উনি নাটক লেখেননি, শেষ পর্বের নাটকগুলোর বিষয় হল, সারা পৃথিবীর সংকট। ‘রক্তকরবী’-র মধ্যে আমলাতান্ত্রিক ধনবাদ, ‘মুক্তধারা’য় দেখা যায় যন্ত্রসভ্যতা যদি মানবতাবর্জিত হয় তার পরিণতি, ‘অচলায়তন’-এ দেখি ধর্মীয় কুসংস্কার, এটা গোটা পৃথিবীর বিষয়। পৃথিবীর সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি ভাবিত হয়েছিলেন, নাটকের বিষয়বস্তুর হিসেবে তিনি সেসবকে গ্রহণ করেছিলেন। এবং এমন একটা ফর্মে তিনি লিখেছিলেন, এমন একটা ‘ট্রিটমেন্ট’ দিয়েছিলেন যেটা ছিল তখনকার পৃথিবীতে অনন্য। এখানেই তাঁর নাটকের নিজস্বতা, বিশালতা। রবীন্দ্রনাথ প্রায় সবক্ষেত্রেই খুবই অরিজিনাল, নাটকের ক্ষেত্রে তিনি ‘অ্যাবসোলিউটলি আরিজিনাল।’ প্রতিভাবান মানুষদের ধর্মই এই, যিনি মডেল সৃষ্টি করতে পারেন।
যেভাবে ‘ডাকঘর’ নাটকটা শেষ হয়, সেখানে কিন্তু কোনো করুণ রসের সঞ্চার হয় না। অমল মারা গেল, একটা গভীর দুঃখবোধ তো আসার কথা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নাটকে এটা নিছক মৃত্যু নয়, একটা বৃহত্তর চৈতন্যের মধ্যে চলে যাওয়া।
এই যে দার্শনিক চিন্তা-চেতনা, এটা একান্ত ভারতীয়। আমরা কখনোই ট্র্যাজেডিতে বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস এই, সবকিছু আনন্দ থেকে আসে, আনন্দের মধ্যেই থাকে এবং আনন্দে বিলীন হয়ে যায়। গ্রিক নাটকে, প্রাচীনকালে, কীসব মহৎ ট্র্যাজিডি তৈরি হয়েছে। ভারতীয় দর্শন ট্র্যাজিডিতে বিশ্বাস করে না। তাঁরা জীবনের যুক্তিতে বিশ্বাস করে, মৃত্যুও তাদের কাছে চিন্তা-চেতনা নিয়ে আসে। তো, অমলের মৃত্যুর ঘটনাকেও অনেকে ট্র্যাজেডি বলে চিহ্নিত করেন। আমি মনে করি এটা ট্র্যাজেডি তো নয়ই, ‘ইটস্ এ কমেডি’। অমলের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে মুক্তির চেতনাটা প্রকাশ পেয়েছে, সেটাও কিন্তু ভারতীয় দর্শন থেকে পাওয়া।
আরও একটা জিনিস আমি বলি, অনেকে খেয়াল করেন না, ‘রথের রশি’-তে যখন অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষরা এসে রথের দড়িটি ধরলেন, এবং রথ চলল, তখন রাজনৈতিক জগতের অনেকে মনে করেন, এমন একটা নাটক যেখানে আমাদের সভ্যতার পিছিয়ে যাওয়া মানুষ, অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষদের স্পর্শে সভ্যতার অগ্রগতির কথা পাওয়া গেল। কথাটা ঠিক, কিন্তু নাটকটা তো ওখানে শেষ হয়নি, তারপরেও আরও কিছু কথা আছে। নাটকের একেবারে শেষে একজন কবিকে রবীন্দ্রনাথ এনেছেন। যে কবি ওঁদের সঙ্গে চলছেন। একজন কবি, একজন সত্যদ্রষ্টাকে ওখানে আনা হল কেন? তার দরকার আছে। যাঁরা রথের দড়িকে ধরে টান দিলে রথ চলছে, যাঁরা সভ্যতার আসল চালিকাশক্তি, তাঁরা যেভাবে পা ফেলছেন, তাঁরা ঠিক ছন্দে পা ফেলছেন কি না দেখবে কে? যাঁরা সভ্যতাকে চালাচ্ছেন তাঁদের চলার ছন্দটা বদলে গেলে কিন্তু এই মানুষগুলোই ভয়ংঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। তাই কবি চলেছেন এঁদের সঙ্গে, দেখছেন যাতে ছন্দের পতন না হয়। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের এই সতর্কবাণীটা বিশেষ জরুরি হয়ে উঠেছে। উনি বলতে চাইছেন, যাদের ‘নিয়ে চলতে চাইছি, তারা সঠিক ছন্দে পা না ফেললে, সহযোগী শক্তিও বিপজ্জনকে হয়ে উঠতে পারে, এটাই রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে না কী? কবি বা সত্যদর্শীই পারেন এ কথা বলতে। তোমার চলার ছন্দে সঠিক তাল আসছে না, এইভাবে চললে, তুমি দেবদূতের মতো থাকবে না। দানবে রূপান্তরিত হবে।
(২০১০-এ নেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ। সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন কথা সাহিত্যিক সাধন চট্টোপাধ্যায়, নাট্যকার উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় এবং সুকল্প চট্টোপাধ্যায়, মূল সাক্ষাৎকারটি নীললোহিত পত্রিকায় মুদ্রিত হয়। পরে সুকল্প সম্পাদিত ‘সংলাপ সংলাপ’ সংকলনে মুদ্রিত হয়। প্রকাশক-ধানসিড়ি।)