
মা মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের সঙ্গে মেয়ে রঞ্জাবতী
পর্ব ২০
‘একজনই হন’ কথাটা বাংলাতে জিনিয়াস বোঝাতে আমরা ব্যবহার করে থাকি। আমরা বলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজনই হন, সত্যজিৎ রায় একজনই হন, অমর্ত্য সেন একজনই হন, উদয়শঙ্কর একজনই হন। লাইন দীর্ঘ। এবং কথাটার মধ্যে সত্যই থাকে বেশিরভাগ। এমন অনেক ক্ষেত্র থাকে যেখানে একটি প্রতিভার এক অলৌকিক স্ফুরণের জন্য তার আগেও কাউকে দেখা যায় না এবং পরেও কেউ গড়ে ওঠে না।
ডঃ মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার-কে আমি সেই কোন ছোটোবেলায় প্রথম দেখি টিভির পর্দায় এক সাক্ষাৎকারে। খুব সম্ভবত সে-বার তিনি সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন সদ্য। একটা কথা উনি বলেছিলেন সাক্ষাৎকারে যে আফ্রিকা-আমেরিকায় প্রফেসরি (তাঁর স্বামী পার্বতী সরকার ছিলেন আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক) ও সাংসারিক জীবনের বিশিষ্টতা কাটিয়েও তিনি সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। তাঁর শিকড় তাঁকে হাতছানি দিচ্ছিল। এই শিকড় বলতে তিনি অবশ্যই বাংলার কথা বলেননি, নৃত্যশিল্পের কথা বলেছিলেন। অ্যান্থ্রোপলোজিতে ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করেও তিনি নাচের যে অন্বেষণ সেটা থেকে দূরে যেতে পারেননি কোনওদিন। বিদেশ যাওয়ার আগেই তিনি বাংলার বিদূষীদের মধ্যে একজন ছিলেন। দেবব্রত বিশ্বাসের মতো মহীরূহ তাঁর নৃত্যচর্চায় মুগ্ধ। তাঁদের যৌথ অনুষ্ঠানে প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ থাকে। কিন্তু পাঁচ বছরের বিদেশযাপনে তিনি আফ্রিকা, আমেরিকা, শ্রীলঙ্কা এমনকি বাংলার ছৌ-নৃত্যকেও আপন করে নিয়েছিলেন। ভরতনাট্যম, কথাকলি এবং মণিপুরিতেও তিনি ছিলেন ‘সিদ্ধপদ’। তবে মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের সম্বন্ধে প্রথম যে বৈশিষ্ট্যটি প্রতিভাত হয় তা হলো তাঁর পাণ্ডিত্য।

মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার
শম্ভু মিত্রের আগে রবীন্দ্রনাথের নাটককে কেউ অভিনয়যোগ্য মনে করতো না। কিন্তু শম্ভু মিত্র এমনকি টেক্সটও কখনও অক্ষুণ্ণ রেখে দুনিয়াকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের লেখা নাটকের মঞ্চাভিনয় কাকে বলে। ঠিক তেমনই মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের রবীন্দ্রনৃত্য। মনে রাখতে হবে রবীন্দ্রনৃত্যের আঙ্গিক কেমন হবে, কী হবে তার পোশাক, কেমনভাবে হবে অভিনয়- এত সব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। ভারতবর্ষের নানা প্রান্ত থেকে তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রের নৃত্যগুরুদের শান্তিনিকেতনে আহ্বান করেছিলেন, শান্তিদেব ঘোষকে কেরালা কলামণ্ডলমে পাঠিয়েছিলেন। বাটিক প্রিন্টের শাড়িকেই রবীন্দ্রনৃত্যের কস্টিউম করে তুলেছিলেন। সঙ্গে ফুলের গয়না। অথচ মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার যখন চন্ডালিকা নৃত্যনাট্য ভেঙে ‘তোমারি মাটির কন্যা’ নির্মাণ করলেন তাবড় রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ ও নৃত্যবিশারদ নড়েচড়ে বসেছিলেন। ‘তোমারি মাটির কন্যা’ আমরা দূরদর্শনে কিছু কিছু দেখতে পেতাম। এক ‘তাসের দেশ’ ছাড়া মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার নির্মিত ডান্সার্স গিল্ড-এর কোনও নাচের অনুষ্ঠান আমি অন্তত পুরোটা দূরদর্শনে দেখিনি কখনও। কিন্তু ‘তোমারি মাটির কন্যা’-ও যখন যেটুকু দেখেছি, সব সময়ই মনে হয়েছে যেন সম্পূর্ণ নতুন এক নির্মাণ। এর আগে সুচিত্রা মিত্র-হেমন্ত মুখার্জি-সুপ্রীতি ঘোষদের একটা গানের ক্যাসেট বাজত বাংলার ঘরে ঘরে, ক্লাবের রবীন্দ্রজয়ন্তীগুলোয়। আমরা ‘চন্ডালিকা’ নৃত্যেনাট্যকে ভাবতাম মা-মেয়ের কথোপকথন ও জাদুটোনার গল্প। মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার অন্য কাহিনি চেনালেন। সেই যে প্রকৃতি ও তার মা এক জায়গায় হচ্ছে আবার ফুলের প্রস্ফুটনের মতো খুলে যাচ্ছে; প্রকৃতির ভূমিকায় মঞ্জুশ্রী কন্যা রঞ্জাবতী অপূর্ব দেহবিভঙ্গে মেয়েদের তৈরি করা একটা সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসছে যেন তার পুনর্জন্ম হল কিংবা অর্ধেক বসা প্রকৃতি-পেছনে তার মা এবং মা-মেয়েকে ঘিরে কয়েকটি মেয়ে-প্রকৃতি অর্ধচন্দ্র হস্তমুদ্রাতে যোনির প্রতীক তৈরি করেছে- এগুলো যেন শাক্ত পূজার্চনা থেকে সরাসরি তুলে এনেছিলেন মঞ্জুশ্রী। ‘চন্ডালিকা’ থেকে একই টেক্সটের ‘তোমারি মাটির কন্যা’ হয়ে ওঠার যে যাত্রা এবং টেক্সটের লুক্কায়িত নারীবাদের একেবারে উপরে উঠে এসে নিজেকে জাহির করার যে বৈপ্লবিক ভঙ্গি- তা আজও আমাদের মুগ্ধ করে। এমনকি ‘তাসের দেশ’-এও আমরা দেখি এক বাক্স তাস ফাটালে যে-সব ভঙ্গিমা তৈরি হয় মঞ্জুশ্রীর ছাত্রছাত্রীরা অবিকল তা তুলে আনছে তাদের দেহবিভঙ্গে। উদয়শঙ্করের মতো মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারও ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যের গহীন পথ ঘুরে নতুন এক নৃত্যের জন্ম দেন, যার নাম রাখেন নবনৃত্য।

মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের নাচে শরীরী ভাষ্য
মুশকিল হলো শাড়িকে ধুতির মতো পরে, পা তুলে মঞ্চে শুয়ে-বসে এদিক ওদিক করলেই যে ‘নবনৃত্য’ হয় না এটা আমাদের বুঝতে হবে। যে আধুনিকতায় নৃত্যকে মঞ্জুশ্রী মুড়ে দিয়েছিলেন তা বোধ হয় রবীন্দ্রনাথের থেকে তিনি প্রাপ্ত হয়েছিলেন। সঙ্গে ছিল নিজস্ব পাণ্ডিত্য। আজকাল ‘ক্রিয়েটিভ ডান্স’ নাম দিয়ে যা খুশি যারা করে, সেই রিল-প্রজন্মকে উপলব্ধি করতে হবে বাংলার তথাকথিত ক্রিয়েটিভ ডান্স-এর ধারক-বাহক ছিলেন উদয়শঙ্কর, মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার, শম্ভু ভট্টাচার্য, অনাদিপ্রসাদের মতো মহারথীরা। চোখ ধাঁধানো জামা-কাপড় পরে, সাহিত্য-ইতিহাস বিমুখ হয়ে, হিন্দি সিনেমার প্রচ্ছন্ন নকলনবিশি করে ক্রিয়েটিভ ডান্স হয় না। শাস্ত্রীয়নৃত্যের পাশাপাশি বাংলায় এই নৃত্যশিল্পেরও একটা গম্ভীর ইতিহাস আছে।
‘তাসের দেশ’-এও আমরা দেখি এক বাক্স তাস ফাটালে যে-সব ভঙ্গিমা তৈরি হয় মঞ্জুশ্রীর ছাত্রছাত্রীরা অবিকল তা তুলে আনছে তাদের দেহবিভঙ্গে। উদয়শঙ্করের মতো মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারও ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যের গহীন পথ ঘুরে নতুন এক নৃত্যের জন্ম দেন, যার নাম রাখেন নবনৃত্য।

স্বামী ও কন্যার সঙ্গে মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার

নবনৃত্য
১৯৯৯ সালে, একই বছরে ডঃ মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার ও তাঁর সুযোগ্য কন্যা রঞ্জাবতীর অকালপ্রয়াণের পর ‘নবনৃত্য’ তো অস্তিত্বের সংকটে পড়েইছিল সঙ্গে বাংলার সৃজনশীল নৃত্যের যে ধারা তারও উজ্জ্বলতা বেশ অনেকটাই ম্লান হয়েছিল। সর্ব ভারতীয় ক্ষেত্রে পিছিয়েও পড়েছিল। সেই ধারা যে অব্যাহত নয়, তা বলা যায় না। এখন কেন্দ্রীয় কিংবা রাজ্য সরকার নৃত্যক্ষেত্রের উজ্জীবনের জন্য অনেক পৃষ্ঠপোষকতা করেন। নতুন সব গ্রান্ট তৈরি হয়। বহু পুরোনো নৃত্যশিল্প শাস্ত্রীয়ের তকমা পেতে পারে কি না তা নিয়ে বিতর্ক চলে। কিন্তু বাংলার সৃজনশীল নৃত্য-এর যে ধারা, তার আলোকিত ইতিহাসটা ফিরিয়ে দেবার জন্যও সব পক্ষের উদ্যোগ জরুরি। তেমন হলেই মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারদের মতো মহীরূহদের ফেলে যাওয়া শূন্যস্থান খানিক পূর্ণ হলেও হতে পারে। যদিও আমরা বলব ডঃ মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার ‘একজনই হন’।
চণ্ডালিকা – মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।
