দূরদর্শনের দুর্গা সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় সুদূর প্রবাসেও প্রচার করে চলেছেন ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্য

কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বিরচিত একটি অসামান্য বই ‘কুদ্‌রত্‌ রঙ্গিবিরঙ্গী’। সাহিত্যপ্রেমী বাঙালির অনেকেই সে-বই পড়েছেন। এমনকি ‘দেশ’ পত্রিকায় যখন ধারাবাহিক প্রকাশ পেত এই লেখা, শোনা যায় জনমানসে তা নাকি যথেষ্ট আলোড়ন তৈরি করেছিল। বইটি যাঁরা পড়েছেন, জানেন যে তাতে ভারতের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পীর ব্যক্তিসত্ত্বা নিয়ে কৌতুকপূর্ণ বর্ণনা শুধু রয়েছে তা নয় এসবের ঐতিহাসিক মূল্য আজও অনন্যসাধারণ। এই রচনার প্রতিটি ছত্রে একেকজন শিল্পীকে যে মুগ্ধতায় দেখা হয়েছে সেক্ষেত্রে মনে হয় এঁরা কেবলমাত্র শিল্পী নন, জৌলুষভরা নক্ষত্রও বটে। কেশরবাঈ কেরকরের টাকে কাজলের কালি লেপা থেকে শুরু করে আলি আকবরকে বাবা আলাউদ্দিনের বেধড়ক পেটানি এই কুদ্ রত রঙ্গিবিরঙ্গীর সম্পদ।

কিন্তু যতবারই এ বই পড়ি ততবার আক্ষেপ থেকে যায় ভারতবর্ষের শাস্ত্রীয়নৃত্যের শিল্পীদের নিয়ে হায় এমন লেখা লিখিত হল না! তুলনা চলে না ঠিকই কিন্তু একজন শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীর অধ্যাবসায় ও পরিশ্রম কেন জানি মনে হয় নিক্তিতে সংগীতশিল্পীর থেকে যেন বেশি। নৃত্যশিল্পীর প্রাত্যহিক রেওয়াজ, অধ্যয়ন তো আছেই সঙ্গে নৃত্য যেহেতু দৃশ্যমাধ্যম তাই কস্টিউম, শরীর ঠিক রাখা, মেকআপ — এগুলোরও যত্ন নেওয়ার বাধ্যতা থাকে। তাই পরিশ্রম আরও খানিক বেশি হয়। অথচ এ সমস্ত শিল্পীদের প্রকাশ (এক্সপোজার) এখনও আমাদের সমাজে কত কম। ওই দৃশ্যমাধ্যম বলেই নৃত্যশিল্পীদের দেখার বাইরে আমরা আজও ভাবতে অপারগ। তাঁদের ব্যক্তিজীবনের চড়াই-উৎরাই, সংগ্রামের কাহিনিগুলি কেবল চাপা পড়ে থাকে। ওসব নিয়ে গবেষণা, সাহিত্য পত্রিকায় প্রচ্ছদকাহিনি, এসব চোখে পড়ে না বললেই চলে। আর এই বাংলায় তো ওসব প্রায় অদৃশ্য।

কথাগুলো মনে আসছে এ জন্য যে দুর্গাপুজো এই শেষ হল। আর দুর্গাপুজো এলে বিশেষত মহালয়ার সময়টা আমরা প্রায়শই একটা নতুন বিতর্ক তুলে ধরি যে রেডিওর মহিষাসুরমর্দিনী যেমন কালের সব পরীক্ষা পার করে আজও বাঙালি জীবনে অমলিন, ঠিক তেমনই কলকাতা দূরদর্শনের যে দুর্গা নিয়ে অনুষ্ঠান তাতে শ্রীমতি সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনীত দুর্গা যেন সব প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে। ওঁর পরে এত এমনকি ফিল্মের নায়িকারাও দুর্গা করল কিন্তু সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো উৎকৃষ্ট মানের হল কি!

যখন সংযুক্তাদিকে ফোনে এ-কথা বলি উনি রিনরিনে ভঙ্গিতে ওপার থেকে হেসে ওঠেন— “আসলে কী জানো কোনও কিছুর সঙ্গেই কোনও কিছুর তুলনা চলে না। তখন আমার নৃত্য বা অভিনয় শুধু না পুরো ডান্স-থিয়েটারের যে কনসেপ্টে ওটা দূরদর্শনে হত সেটাই তখন খুব অভিনব আর আলাদা ছিল। একটা ফিল্মের শুটিং যে কায়দায় চলে ঠিক সেরকম পরিশ্রম সকলকে করতে হত। প্রথমদিকে ডিরেক্টর ছিলেন শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত। তারপর কল্যাণ ঘোষ এসেছিলেন সে জায়গায়। কখনও শিপ্রা বসু আবার কখনও সুভাষ দাস। দিনের পর দিন রিহার্সাল চলত। আমার তখন ফার্স্ট ইয়ার ইংলিশ অনার্সের পরীক্ষা, সেটে বই নিয়ে যেতাম। শুটিংয়ে তথ্যগত কোনও ভুল যেন না হয় সেজন্য সংস্কৃত পণ্ডিত শ্রী অজয় ভট্টাচার্য সেটে উপস্থিত থাকতেন। এমনকি ওই যে মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের আইকনিক সিন তার জন্য ফাইট মাস্টার আসতেন। রীতিমতো প্র্যাকটিস চলত। তারপর ফাইনাল টেক। শুধু আমাদের অংশটা কেন এখন তো পুরো নির্মাণের ধারাটাই বদলে গেছে। তাই হয়তো মানুষ নস্টালজিক হয়ে পড়েন।”

সেটাও ঠিক। দূরদর্শন আর আজকের স্যাটেলাইট টেলিভিশনের যুগ তো অনেক তফাতেরই। তাও জানতে ইচ্ছে করে সংযুক্তাদির এই নৃত্যাভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হবার কাহিনিটি— “আমি মূলত কথকনৃত্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম খুবই ছোটোবেলায়। আমার মা-বাবা সরাসরি নৃত্যশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও শাস্ত্রীয়সংগীতের নিয়মিত শ্রোতা যাকে বলে তেমন ছিলেন। কলকাতার সব মিউজিক কনফারেন্সের পরিচিত মুখ ছিলেন। এবার আমার যখন একটা সময় এল যে নাচে অনেককিছু শেখা হয়ে গেছে কিন্তু জাস্ট বয়স হয়নি বলে কোনও পরীক্ষা দিতে পারছি না অতএব নাচের প্রতি কোনও টানও অনুভব করছি না তখন মা-বাবা ডিসিশন নিলেন অন্য কোনও নাচে (অবশ্যই শাস্ত্রীয়নৃত্যে) আমায় ভর্তি করবেন। আর তখন কলকাতার শাস্ত্রীয়নৃত্য বলতে অবিসংবাদীশীর্ষ গুরু শ্রী গোবিন্দন কুট্টি ও গুরু শ্রীমতি থাঙ্কমণি কুট্টিকেই বোঝাত। গুরুজি আর আন্টি তখন থাকতেন একদম আমাদের পাশের পাড়াতেই কিন্তু সেই খোঁজটা পেতে আমার মায়ের সময় লেগেছিল বেশ কয়েকদিন। কিন্তু মা গুরুজি-আন্টির হাতে, তাঁদের কলামণ্ডলম-এ আমাকে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। আর আমিও খুব খুশি হয়েছিলাম। ভরতনাট্যম যেমন শিখেছি তেমনই আন্টি মোহিনীআট্যমে আমাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন। ওঁদের প্রতি আমার ঋণের শেষ নেই। আরেকটু বড়ো হলাম যখন স্কুল পাশ করে কলেজে, এক দুপুরে গুরুজির ফোন দূরদর্শনে একটি অনুষ্ঠানের জন্য আমাকে ওঁদের বাড়ি যেতে হবে। আমি ভেবেছিলাম আসলে আমাদের কলামণ্ডলম-এর কোনও প্রোগ্রাম দূরদর্শনে হবে কারণ আমি দূরদর্শনে তার আগে হরেকরকম্বা, তরুণদের জন্য অনুষ্ঠানগুলোতে বহুবার সেই ছোট্টবেলা থেকে নেচেছি। কিন্তু গুরুজির বাড়িতে যখন গেলাম যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা আমি এবং আরও কয়েকজন ছাত্রীকে দেখলেন, কোনও প্রশ্নও তেমন করলেন না। আমি বাড়ি চলে এলাম এবং পরে শর্মিষ্ঠা দাশগুপ্ত নিজে ফোন করে জানালেন আমি কলকাতা দূরদর্শনের মহিষাসুরমর্দিনী-র জন্য সিলেক্টেড হয়েছি। সেটাই শুরু!”

সেই শুরুটা বাংলার জনজীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে। আমরা যারা রেডিওর পর মহালয়ার সকালে দূরদর্শনের মহিষাসুরমর্দিনীর জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম তাদের কাছে সংযুক্তাদির শুরুয়াতটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মোহিনীআট্যম নৃত্যশিল্পী সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী হল তারপর? সেটা জেনে রাখাও যে জরুরি। এমনিতে মোহিনীআট্যমে কলকাতার অবস্থা খুব আলোকিত নয়। তুলনামূলকভাবে ভরতনাট্যম, ওডিসি, কথক, মণিপুরীতে কলকাতার শিল্পীরা যে গতিতে গোটা ভারতবর্ষে এগিয়ে গেছেন মোহিনীআট্যম নৃত্যশিল্পীরা রয়ে গেছেন হাতে-গোনা অবস্থায়। একসময়ের উমা ভেঙ্কিট, তারপর মোম গাঙ্গুলি চ্যাটার্জি, প্রিয়দর্শিনী ঘোষ আর কলামণ্ডলম স্বর্ণদীপা ছাড়া চোখে পড়ার মতো তো কেউ নেই। আর সংযুক্তাদি আজ কলকাতা ছাড়া প্রায় বহু বছর। সেই ২০০৭ সাল থেকে তিনি প্রথমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তারপর কানাডা নিবাসী।

“হ্যাঁ, শিল্পী হিসেবে আমার একটা ডিসপ্লেসমেন্ট হয়েছে ঠিকই কিন্তু কী জানো বিদেশে এসে ইসতক আমি নিরন্তর মোহিনীআট্যমের চর্চা করে গেছি। এবং গবেষণাও চালিয়ে গেছি। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছি নাচ নিয়ে। স্থাপন করেছি আমার নৃত্যবিদ্যালয় সৌগান্ধিকম ডান্স একাডেমি। আর প্রতি বছর একটা বড়ো সময় আমি দেশে বিশেষত কলকাতায় কাটাই। তখন দূরদর্শন সহ বহু জায়গায় প্রোগ্রাম থাকে। মোহিনীআট্যমের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যের ওপরেও বিশেষ করে কবিপক্ষে অনেক কাজ করি।”

সংযুক্তাদি এর মধ্যে ওঁর বিনীতচরিত্রবশত যেটা বললেন না তা হল উনিই প্রথম এবং এখনও অবধি একমাত্র মোহিনীআট্যমে অ-দক্ষিণ ভারতীয় সিনিয়র স্কলারশিপ প্রাপক। ভারত সরকারের সংস্কৃতি দফতর এমনিতেই ভীষণ কম সংখ্যক স্কলারশিপ মোহিনীআট্যমের জন্য ছাড়ে। তার মধ্যে বেশিরভাগ কেন পুরোটাই পায় হয় খোদ দক্ষিণ ভারতের কেউ অথবা দিল্লিস্থিত দক্ষিণ ভারতীয় পদবীর কেউ! কথাটা বলতে দিদি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হেসে ওঠেন— “আমার এই স্কলারশিপ পরীক্ষার সময় তুমি চিন্তা করতে পারবে না প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ক্রমাগত নাচতে হয়েছিল। কতবার যে ওঁরা কতরকম প্রশ্ন করেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই। সেটা অবধি ঠিক ছিল। কিন্তু একটা যে কোয়েশ্চেন ওঁরা বার বার করছিলেন যে আমি কেন হঠাৎ বাঙালি হয়ে মোহিনীআট্যমের মতো দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্যের আর্টফর্ম বেছে নিলাম সেটা শুনে একটু হলেও খারাপ লাগছিল। যে গুরুর কাছে শিখেছি তিনি তো বিদ্যা দান করেছেন আমি বাঙালি জেনেই। আর আমারও তাঁকে কখনও দক্ষিণ ভারতীয় মনে হয়নি। বরং গুরুজি-আন্টির বাড়ির সম্বৎসরের নানা অনুষ্ঠান যেমন ওনামে আমরা তো প্রবল উৎসাহেই যোগ দিতাম। তাই না? তাহলে কেন এমন সূক্ষ্ম জাতিভেদ শাস্ত্রীয়নৃত্যের ক্ষেত্রে থাকবে? তবে বিদেশে আমি যখনই মোহিনীআট্যম পারফর্ম করি অনেক তথাকথিত দক্ষিণ ভারতীয় বিশেষত বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা জিজ্ঞেস করেন আমি এই স্টাইলটা কোথা থেকে শিখলাম কারণ আমার যে মোহিনীআট্যম সেটা কিন্তু আন্টি কেরালা কলামণ্ডলম থেকে শিখেছিলেন সরাসরি এবং উনি ওখানকার অতীব উজ্জ্বল ছাত্রী ছিলেন। এমনকি কে.কল্যাণী কুট্টি আম্মা কলামণ্ডলমে ঢোকার অনেক আগেই আন্টি পাশ করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কেরালা কলামণ্ডলমে আন্টির গুরু ছিলেন শ্রীমতি চিন্নাম্মু আম্মা। আমার যে স্টাইল সেটা ওই চিন্নাম্মু স্টাইল। এই স্টাইলের প্রাচীনতা ও গভীরতা অনেকটাই বেশি এবং সেটা অনেক কম লোক নাচে কারণ বেশিরভাগ এটা জানেই না।”

এখানেই একটা প্রশ্ন রয়ে যায়। এত প্রতিভা সম্পন্ন একজন নৃত্যশিল্পী সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দেশে তো বটেই বিদেশের মাটিতেও ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্য প্রচার করে চলেছেন ক্রমাগত অথচ আমরা এখনও তাঁকে কেবল আমাদের দুর্গা বানিয়ে রাখতে ভালবাসি। হতে পারে এখনকার ফিল্মি নায়িকাদের আমরা তাঁর জায়গায় দেখতে পছন্দ করি না, তিনি আমাদের নস্টালজিয়া কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই কলকাতা দূরদর্শনের সেই অনুষ্ঠানের আগে-পরে সংযুক্তাদির নাচের যে ব্যাপ্তি তার খোঁজ রাখেনি। এটা দুঃখজনক। তাতে সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবশ্যই কিছু যায়-আসেনি কিন্তু আপামর বাঙালির যে এই স্বল্প নৃত্যজ্ঞান ও উদাসীনতা সেটা একটা গোটা সংস্কৃতির ক্ষতি। এই যে কলকাতার আকাশে-বাতাসে এখন বিসর্জনের সুর, কার্নিভালের জন্য তৈরি হল শহর, হেমন্ত নেমে আসছে ঘাসে ঘাসে; এই আবহেই শপথ নিতে হবে যে এই অজ্ঞানতা থেকে আমাদের জাগতে হবে। তবেই না কুদ্‌রত্‌ রঙ্গিবিরঙ্গীর মতো একটি বই নৃত্যশিল্পীদের নিয়েও লেখা হবে কোনও একদিন।

চলবে…

Written by