সেই রাতেই জ্যোতি বসুর সঙ্গে তিলুর ২৩ খানা ছবি নিয়ে থানায় গিয়ে বড়বাবুকে বাপ তুলতে বাকি রেখেছিল

আজ শহিদ দিবস। একেবারে ঘড়ি মিলিয়ে আশু মুখার্জির গোঁফের তলায় দাঁড়িয়ে আছেন ত্রিলোচন পান্ডে। তাঁর দু’পাশে দুজন এবং পিছনে একজন ব্ল্যাক ক্যাট। তারা স্মার্ট ফোনে অনবরত কথা বলে চলেছে। ত্রিলোচনের কপালে রক্ত তিলক, হাতে প্রমাণ সাইজের মালা, মুখে মাপা হাসি।

ঠিক সময়ের নেতারা যেভাবে মানুষকে wish করতে করতে এগিয়ে যায় ত্রিলোচন এমনি করেই মালা হাতে এগিয়ে চললেন। দিদি জিজ্ঞেস করলেন কাঁহাসে? মালা পড়িয়ে বিগলিত গলায় ত্রিলোচন বললেন, বিহার সে। লালুজীকা শুভকামনা লেকে আয়াহুঁ।

আপাতত তাঁর কাজ শেষ। কিছুদূরে দাড়িয়ে থাকা জিপ নিয়ে ত্রিলোচন ছুটলেন চিৎপুর রোডের দেশওয়ালি ভাইয়ের বাড়িতে।

বিটি রোড থেকে রতনবাবুর ঘাটে যেতে যে রাস্তা তার উপরেই ত্রিলোচন পান্ডের চায়ের দোকান। দোকানের সামনে জ্বল জ্বল করছে দিদির সঙ্গে ত্রিলোচন পান্ডের ছবি। পাড়ার সবাই তাকে তিলু পাঁড়ে বলে ডাকে। একজন জিজ্ঞাসা করলো, কিরে তিলু, গতবারের ছবি এবারের বলে চালাচ্ছিস না তো?

-তিলু পাঁড়ে দুনম্বরি করে না। গতবারের ছবিখানা দেখিয়ে বলল, আমার কুর্তার রং আলাদা, দিদির ব্ল্যাক ক্যাটের সকলও আলাদা। অনেকেই বলল, না, তিলুর এলেম আছে।

গতকাল তিলুর ধকল গেছে। যখন যারা শাসকদলে থাকে তিলু তাদের কেন্দ্রীয় সভায় যোগ দেয়। সেদিন তার গয়া টি-স্টল খোলে না। শেষ রাতে এসে বন্ধ দোকানে পোস্টার ঝোলায় ‘দলে দলে যোগ দিন’। তার পর কড়া মাঞ্জা দেওয়া ধুতি-চাদর-কুর্তা প্যাকেট করে চিৎপুর। ধোপদুরস্ত হয়ে ভাড়া করা ব্ল্যাক ক্যাট নিয়ে যথা সময়ে আশুবাবুর গোঁফের তলায়।

তিলু বোঝে জীবন গঙ্গার মতই বয়ে যাবে। তার বুকে ফুল-বেলপাতা-ডাব-কাচা আম-ঘাটের মরা সবই ভাসবে, কিন্তু তাকে বয়ে যেতে হবে। এই সার কথাটা সে বুঝেছে গেছো চণ্ডীর কাছ থেকে। সে রতনবাবুর ঘাটে রিক্সা ইউনিয়নের নেতা, বাম আমলেও এবং ঘাসফুলের জামানাতেও। গেছো চণ্ডীর মূল পেশা হল- বিটি রোডের ধারে গাছ উপড়ানো। জমানা বদলায়, কিন্তু গাছেদের রতনবাবুর ঘাটে যাওয়া বন্ধ হয় না। চিতা তো জ্বালতেই হবে। চণ্ডী বুঝিয়েছে, যা করবি তার পিছনে যেন সমাজসেবার ছাপ্পা থাকে।

গয়া টি-স্টলে সকালে চণ্ডীর রুটি-অমলেট-চা ফ্রি। শাশ্মানের শেরদের হাতে রাখা দরকার। গয়া টি-স্টলে এখন শোভা পায় নীতীশকুমারের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। এই দোকানের সঙ্গে বিহারের যোগসূত্রতা তিলু অক্ষুন্ন রেখেছে। আগের শোভা পেত জয়প্রকাশের পাশে জ্যোতি বসু- যেন মায়ের পেটের দুই ভাই। তারপর লালুর পাশে বুদ্ধ ভট্টাচার্য- দুজনেই যেন দুজনকে ধরায় আগন্তুক ভাবছে। এখন নীতিশ-মমতা। দুজনেই অসম্ভব গম্ভীর। তিলু ব্যাখ্যা দিয়েছে দুই ব্যাচেলরের হাসি হাসি মুখ ভালো দেখায় না।

গয়া টি-স্টল সামলায় স্ত্রী-ধবলী। তিলু যখন ধবলীকে গলা ছেড়ে আদর করে ডাকে তখন মনে হয় গোয়ালের পোষা গরুকে ডাকছে। কলকাতার নাগরিক চাতুরি তিলুর দেশওয়ালি ভাবমূর্তিকে চিন্তাই করতে পারে না। বাম জমানায় যখন প্যারেড গ্রাউন্ড থাকতো সেদিনও বন্ধ দোকানের সামনে ‘দলে দলে যোগ দিন’ ঝোলানো হত। টানা তিন-চার বছর সে যে জ্যোতিবাবু ও বুদ্ধবাবুর সঙ্গে ছবি তুলেছে সেখানেও প্রতিবছর সে কুর্তার রং বদলাতো। সে মোট ছয়টি কুর্তা বানিয়েছিল। টিভির রিপিট টেলিকাস্টের মত ছয় বছর অন্তর একটা ফিরে আসত।

তিলুর দুই ছেলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। সে গয়া জেলার উচ্চ বর্গীয় পাঁড়ে ব্রাহ্মণ। তিলু স্থির করেছে দুই ছেলেকে আইএস বা আইপিএস বানাবে। তাহলে বিয়ের বাজারে সে পাঁচ কোটি করে পণ হাঁকতে পারবে। তখন সে ধবলিকে নিয়ে বছরে একবার প্লেনে চড়বে।

গেছো চণ্ডীর মতো তিলুরও পাল্টি ব্যবসা আছে। তার দোকানে দুটি বিজ্ঞাপন শোভা পায়। একটি হল ‘এখানে আগ্নেয়াস্ত্র রাখা হয় না’ এবং অপরটি ‘গয়ার পিণ্ড দানের সু-বন্দোবস্ত করা হয়।’ দ্বিতীয়টা সন্ধ্যের পর নিয়নে জ্বলে। যে ছোকরা কাপ-প্লেট ধোয় তার দ্বিতীয় কাজ হল মরা দেখলেই খই ছেটানো। এটা অগ্রিম বিনিয়োগ।

তিলু বিপাকে পরেছিল বুদ্ধবাবু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর। পাড়ায় তখন নন্দীবাবু আর চক্রবর্তীবাবুর গোষ্টী দ্বন্দ্ব চলছে। তিলু চক্কত্তীদের দিকে একটু হেলে ছিল। মাঝরাতে তাকে বাড়ি থেকে তুলে গারদে পোরা হয়। অভিযোগ, গয়া টি-স্টল আসলে মুঙ্গেরি ঠেক। অর্থাৎ বেআইনি অস্ত্রের ঠিকানা। ধবলি সেই রাতেই জ্যোতি বসুর সঙ্গে তিলুর ২৩ খানা ছবি নিয়ে থানায় গিয়ে বড়বাবুকে বাপ তুলতে বাকি রেখেছিল। তিলু ছাড়া পেয়ে সকালে ঠিক সময়েই দোকান খুলেছে, গলায় নিজের পয়সায় কেনা বিরাট মালা জিজ্ঞাসুদের প্রশ্নের জবাবে সে লাজুক মুখ করে বলে, থানা সে মিলা।

গয়া টি-স্টল কে পিছনে ফেলে তিলুর পিণ্ডদানের ব্যবসা এখন তুঙ্গে। গেছো চণ্ডীর বিজনেস লাইন অব্যর্থ- সমাজ সেবার ছাপ্পা থাকলে তার মার নেই। গয়ার পিণ্ডঘাটের ধোপা-নাপিত পুরুত-হোটেল সব তিলুর নখ দর্পনে। অগ্রিম বুকিং করলে বাড়ি থেকে তুলে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, সব দায় তিলুর।

একবার কমরেড তোপদার ঠিক করেছিলেন ভোটে আগের মাথা কামিয়ে প্রত্যেকের মাথায় চুল দিয়ে কাস্তে হাতুড়ি তারা বানাতে হবে। তিলু গয়া থেকে আঠেরো জন নাপিত এনে সে রোড শো সফল করেছিল।

থানার বড়বাবু একদিন তিলুকে তলব করে বললেন তিনি গয়া যাবেন সৎ মায়ের পিণ্ড দিতে। তিলু মুখ কাচুমাচু করে বললঃ স্যার সৎ মায়ের কিন্তু ডবল রেট। বাল্যকালে সৎ মায়ের হাতে অত্যাচারিত বড়বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেনঃ তাই দেব।

জ্যোতি বসু, বুদ্ধ ভট্টাচার্য, মমতার সঙ্গে তিলুর ছবি দেখে সবজান্তা বাঙালিরা ঠাট্টা মশকরা করে। কিন্তু গয়ায় এই সব ছবিই তিলুর তুরুপের তাস। তিলু বিটি রোডে প্রলেতারিয়েত, কিন্তু গয়ায় মেহমান। গয়ার স্টেশনে নামলে তার জন্য স্করপিয় গাড়ি অপেক্ষা করে।

তিলু জানে সব কিছু বুকে করেই গঙ্গার মত বয়ে যেতে হবে। তবেই মোহনায় পৌঁছন সম্ভব।

তিলু অনেক সাধ করে দুই ছেলের নাম রেখেছিল জ্যোতি পাঁড়ে এবং বুদ্ধ পাঁড়ে। জমানা বদলের পর তিলু একদিনও অপেক্ষা করেনি। এফিডেভিড করে দু’জনের নামই বদলে নিয়েছে। এখন তাদের একজন হয়েছে কার্তিক পাঁড়ে এবং আরেক জন গণেশ পাঁড়ে।

Developed by DXDasia