দলে সেন্সরের মুখে বিমান বসু

‘বামেরা আবার রাজ্যে কবে ক্ষমতায় আসবে সেই চিন্তা ধর্তব্যের মধ্যেই আনা উচিত নয়’

বামফ্রন্টের শরিক ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য দপ্তরে গত সপ্তাহে একটি ছোটখাটো মিটিং হয়েছিল। উপলক্ষ ছিল দলের প্রয়াত নেতা অশোক ঘোষের মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন। সেই সভার বিভিন্ন বামদলের অনেক নেতাই বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। তার মধ্যে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু অন্যতম। অশোক ঘোষের সঙ্গে বিমান বসুর বয়সের তফাৎ অনেকটাই। তবে এই দুটি মানুষের মধ্যে যে নিবিড় সখ্য ছিল তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। দুটি পৃথক দলের নেতৃত্বে অধিকারী হলেও কেবলমাত্র বাম ঐক্যের স্বার্থে নয়, একান্ত ব্যক্তিগত স্তরেও তাঁরা পরস্পরের নিকট বন্ধু ছিলেন। দুটি মানুষের মধ্যে কিছু আপাত বাহ্য মিলও ছিল। দুজনেই অকৃতদার। রাজনৈতিক দলের সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে তাঁরা আর সংসার ধর্মের দিকে এগোননি। দু’জনেরই চাল-চুলো বলতে ছিল নিজ নিজ দলের সদর দপ্তর।

বিমান বসু বামেদের নির্বাচনী বিপর্যয়ের আগে থেকেই বিভিন্ন মহলের কাছে নানা কারণে নিন্দিত হাতে শুরু করেছিলেন। সেটা অবশ্য অনেক রাজনৈতিক নেতার কপালেই জোটে। ষাটের দশকে তেমন নিন্দার ভাগীদার হতে আমরা দেখেছি প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে। যেমন একটা জনমত যখন গড়ে উঠতে থাকে তখন এই সব মানুষের অতীত কৃতিত্ব আর তেমন গুরুত্ব পায় না। বিমান বসু সম্পর্কেও চলিত কথাগুলি হল তিনি মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক হয়ে উঠতে পারেননি। তিনি সর্বদা বেশি কথা বলেন। ধরে নেওয়া যাক এমন সব অভিযোগ সত্য। কিন্তু তারপরেও এই কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে তিনি একটি মতাদর্শ আঁকড়ে আছেন। কোন জায়গায় উলটো পথে তিনি হাঁটেননি। 
২০১১ সালে বামেরা যখন হেরে গেল তখন সিপিআই(এম) দল এবং বামেদের প্রচারমুখ ছিলেন বিমানবাবু এবং বুদ্ধবাবু। দলের নেতা হিসাবে বিমানবাবু কতখানি বিফল বা মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে বুদ্ধবাবু কতখানি ব্যর্থ সেই আলোচনা দলের মধ্যে যেমন হবে তেমনি সাধারণ মানুষও করবেন। তাকে কোনও ভাবেই আটকানো যাবে না। কিন্তু একটা বিপরীত পরিস্থিতিতে দলের মুখ হিসাবে বিমানবাবু কিন্তু নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। কিন্তু তার জন্য তিনি কোনও পলায়নপর মনোভাবের পরিচয় দেননি।

ফরওয়ার্ড ব্লক অফিসে বিমানবাবুর যে ভাষণ তাঁর আলোচনার সবার আগে এই পরিপ্রেক্ষিতটি তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল। সেদিনের সভায় বিমানবাবু প্রায় খোলাখুলি জানিয়ে দেন যে, আজকের যে পরিস্থিতি তাতে বামেরা আবার রাজ্যে কবে ক্ষমতায় আসবে সেই চিন্তা ধর্তব্যের মধ্যেই আনা উচিত নয়। রাজ্যস্তরে কেন্দ্রীয় সরকার যে জনবিরোধী গতিগুলি অনুসরণ করে চলেছে তার প্রতিবাদে বামেদের দীর্ঘস্থায়ী সংগঠিত আন্দোলনে যেতে হবে। সেদিনের সভায় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা কেউই এমন মন্তব্য বিরোধিতা করেননি। কিন্তু আমরা প্রমাদ গুণলাম যখন দেখতে পেলাম যে সিপিআই(এম) এর মুখপত্র ‘গণশক্তি’তে এই সংবাদটি তেমন গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়নি। আর বিমান বসুর ভাষণের ভাষণের ওই কথাটাই উহ্য রাখা হয়েছে।

দলের মুখপত্রে সংবাদটির এমন পরিবেশন কিন্তু আমাদের অনেকগুলি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। বিমানবাবু বর্তমানে সিপিআই(এম) দলের অন্যতম প্রবীণ নেতা এবং পলিটব্যুরোর সদস্য। দলীয় মুখপত্রে যখন তাঁর ভাষণের মূল অংশ বাদ গেল তখন ধরে নিতে হবে যে দল তাঁর এমন উক্তি সমর্থন করে না। অর্থাৎ দলের মধ্যে তাঁকে সেন্সর করা হয়েছে।

তাতে এই কথাই বোঝা যায় যে সিপিআই(এম) দলটি এই মূহূর্তে আবার যেন তেন প্রকারের ক্ষমতায় আসাটাকেই মুখ্য উদ্দেশ্য হিসাবে বিবেচনা করছে। বিমানবাবু যে দীর্ঘস্থায়ী গণসংগ্রামের বার্তা দিয়েছেন তাতে দলের সায় নেই। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দলের কাছে এটা যে বুদ্ধিভ্রষ্ট হওয়ার একটা চূড়ান্ত নমুনা তা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। দলের মধ্যে যাঁরা অতি সত্বর নির্বাচনী জয়ের স্বপ্ন দেখছেন তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাই, ২০১৬ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধার পরেও ২০১১ সালের তুলনায় বামেদের আসন উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। তাই রাজ্যসভায় নিজস্ব ক্ষমতায় একজন প্রতিনিধি পাঠানোর ক্ষমতাও তাঁদের নেই। এটা হল পাটিগণিতের অঙ্ক। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল এই রাজ্যের মানুষের মানসিকতার যে ধারাবাহিকতা আছে কোনও দলকে ক্ষমতাসীন করায় সেই বিষয়টি। এই রাজ্যে ক্ষমতাসীন কোন রাজনৈতিক দল একবার নির্বাচনে হেরে গেলে তারা আর আগের চেহারায় ক্ষমতায় ফিরে আসে না। ১৯৬৭ সালে সাবেক কংগ্রেস, পরের যুক্তফ্রন্ট সরকার, তারও পরে সিদ্ধার্থ রায়ের সরকার কেউই পুনরায় ক্ষমতায় ফেরেনি। সেই অর্থে আজ সিপিআই(এম) তথা বামেরা যে চেহারায় আছে তা আগামী দিনে গ্রহণযোগ্য না হওয়ারই কথা।

গত সত্তর বছর ধরে এই রাজ্যে ভোটব্যাঙ্ক বাম এবং কংগ্রেসের মধ্যেই বিভাজিত হয়ে আছে। কিন্ত জনগণের আস্থা পাওয়ার জন্য পরাজিত দলকে বারেবারে তার পোশাকি নাম বদল করতে হয়েছে।

বিমানবাবু সেদিন এত কথা ভেবে ভাষণ দিয়েছিলেন কিনা আমরা জানি না। কিন্তু তিনি যে দীর্ঘস্থায়ী সংগঠিত সংগ্রামের কথা বলেছেন তার মধ্যে যে অদলবদলের পরোক্ষ ইঙ্গিত রয়েছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

Developed by DXDasia