March 1, 2024 | 5:33 PM

দীপ্তাংশুর কথাকলি আর গার্গীর মোহিনীআট্যম : নৃত্যমঞ্চের সদাব্যস্ত জুটি

পর্ব ২৮

থ আসার আগে আগেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত রথের সাতদিন গুন্ডিচা মন্দিরে যেমন জগন্নাথ, বলদেব, সুভদ্রা মহারানি থাকবেন তেমন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবার। শাস্ত্রীয়নৃত্যই মূলত হবে। তবে আমায় দায়িত্ব দেবার আগে কর্তৃপক্ষ ধরে নিয়েছিলেন যে শাস্ত্রীয়নৃত্যের মধ্যে “কেবল ওডিসি ভগবানের পছন্দ হবে। কারণ, তার আগে অবধি প্রতি সন্ধ্যায় ঠাকুর এক-দেড় ঘণ্টার জন্য কেবল ওডিসি দেখতেই বাধ্য হতেন।” মনে হত কলকাতায় যেন আর কোনও শাস্ত্রীয়নৃত্যের চল নেই। আমায় অনুষ্ঠানসূচি তৈরি করতে বললে ভারতবর্ষের সংগীত নাটক আকাদেমি কর্তৃক নির্দিষ্ট আটটি শাস্ত্রীয়নৃত্যধারা-র নৃত্যশিল্পীদের সঙ্গেই যোগাযোগ করেছিলাম। প্রথম যার সঙ্গে ফোনে কথা হয় তিনি ছিলেন দীপ্তাংশু পাল। দীপ্তাংশুর একটি চারিত্রিক গুণ হলো ওঁর ভদ্রোচিত ব্যবহার।

– নমস্কার! দীপ্তাংশু কথা বলছেন?
– বলছি।
– আমাদের একটা নৃত্যানুষ্ঠান আছে। আপনি কী পনেরো-কুড়ি মিনিট কথাকলি পারফর্ম করতে পারবেন?
– সবই পারবো কিন্তু করবো না যতক্ষণ না আপনি আমায় তুমি করে সম্বোধন করবেন। বুঝলে?

ভীষণ, ভীষণ মজার লেগেছিল দীপ্তাংশুর এই কথা। সেই প্রথমদিনই ওঁর আরেকটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল- হাস্যরসের বোধ। এই জীবনে বহু মানুষ দেখেছি, কিন্তু জীবনের প্রবল অসহায় অবস্থাকেও হাসিঠাট্টা করার মতো সাহস দীপ্তাংশু ছাড়া আর খুব কম লোকের মধ্যেই চোখে পড়েছে।

সে-বছর দীপ্তাংশু পালের কথাকলি নৃত্য দর্শককে মুগ্ধ করেছিল। কথাকলি নৃত্য সত্যি কথা বলতে তার আগে টেলিভিশনের পর্দা ছাড়া আর কিছুতেই আমি দেখিনি। দীপ্তাংশু ওই বিরাট, বিপুল কথাকলির কস্টিউমটা পরে যখন মঞ্চে প্রবেশ করলো জগন্নাথ আর দীপ্তাংশু, এর মাঝে যেন আর কেউ নেই- কেবল সর্বব্যাপী ব্যোম! দীপ্তাংশু ছাড়া আরেকজনের নাচ আমাদের দর্শকমন ভরিয়ে দিয়েছিল। তা হল দীপ্তাংশুর স্ত্রী গার্গী পালের মোহিনীআট্যম। আজ কলকাতায় যত গুরুত্বপূর্ণ মোহিনীআট্যমের মুখ আছে গার্গী নিঃসন্দেহে তাঁদের একজন। ওঁদের সংস্থার নাম গার্গী-দীপ্তাংশু পারফর্মিং ট্রুপ। কিন্তু কীভাবে এলো এই ট্রুপের ভাবনা?

সকলের আশীর্বাদে দীপ্তাংশু-গার্গীর কথাকলি আর মোহিনীআট্যম রয়ে গেছে ঠিক। সব ঝড়ঝাপটা সহ্য করেই রয়ে গেছে। প্যান্ডেমিকের একটা দমবন্ধ করা সময় গেছে। দিনের পর দিন ডান্সারদের বসে থাকতে হয়েছে। সব মঞ্চ বন্ধ। কল-শোগুলো একে একে ক্যান্সেল হয়ে যাচ্ছে। সেই সময়টাও দুজনে একে অপরের সাথী হয়ে পার করেছেন।

দীপ্তাংশু আর গার্গী-উভয়ই উদাস হয়ে পড়েন। বুঝতে পারি এ-পথ সহজ ছিল না। গার্গী বলেন, “তুমি তো সব সময়ই লেখো এবং জানোও নিশ্চয়ই, আজও পুরো ভারতবর্ষ কি না জানি না তবে বাংলায় মেয়েদের নাচে আসা এবং সেই নাচ চালিয়ে যাওয়া এতটুকু সহজ হয়নি। মেয়েদের নাচের প্রতি সমাজের একটা তির্যক দৃষ্টি। মেয়েরা স্কুলটিচার হোক ভালো, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হলে তো জবাব নেই, এমনকি সংগীতশিল্পী হলেও হবে, কিন্তু নৃত্যশিল্পী মেয়ে? তওবা! তওবা! আর গৃহবধূ যদি নৃত্যশিল্পী হবার স্বপ্ন দেখেন তাহলে তো সব শেষ। তবে দীপ্তাংশুর মতো সঙ্গী এবং বন্ধু পেয়ে আমি ধন্য।”

দীপ্তাংশুর মুখ থমথমে নয় কিন্তু গম্ভীর এখন। দীপ্তাংশুর কথায়, “আমি বরাবর গার্গীর পাশে থাকতে চেয়েছি। দ্যাখো, আমার জীবনও কিছু কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। বউবাজারে আমাদের শরিকি বাড়ি, থাকতাম মা-বাবা, আমি আর দাদা। বাবা সংসারী ছিলেন না একদম। কখনও কখনও অত্যাচারীও হয়ে উঠতেন। মা সহ্য করতেন সব। আমি ছোটোবেলায় খেলাধূলা করেছি, পাড়ার ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে দুরন্তপনা করেছি। আবার পাড়াতেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময় নেচেছি। মা এসব দেখে আমায় বুবুনদা মানে কোহিনুর সেন বরাটের কাছে ভর্তি করিয়ে দেন। তারপর একটা সময় ছিল আমি বুবুনদার ওখান থেকে চুটিয়ে প্রোগ্রাম করতাম। বুবুনদা আমাকে হাতে ধরে নাচ শিখিয়ে ছিলেন। পড়াশোনাতেও মন্দ ছিলাম না। বাবা বলেছিলেন যদি নাচটা মন দিয়ে করতে চাও তাহলে নাচের পড়াশোনাও করো। সেই নাচের পড়াশোনা করতেই আমার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ। মা আমাকে নাচের পথে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি একটা নাচের স্কুলও খুলে দিয়েছিলেন মা-ই। নাম রাখা হয় নৃত্যভাবনা। গার্গী-দীপ্তাংশু পারফর্মিং ট্রুপের অনেক আগে নৃত্যভাবনা দিয়ে আমার পথ চলা শুরু।”

গার্গী যোগ করেন, “আর আমি নাচ করতাম ছোটোবেলা থেকে। কারণ আমার সাজগোজ করতে খুব ভালো লাগত। তবে সেটা একেবারেই ছোটোবেলায় যেমন হয়। পাড়ার প্রোগ্রামগুলোয় করতাম। কিন্তু একটা সময়ের পর মা আমাকে কথকনৃত্যে ভর্তি করিয়ে দেন। মা তখনকার দিনে বাংলায় এমএ। বাবা ছিলেন ডক্টরেট। আমি মমতা শঙ্করের উদয়নে শিখেছি। নরেশ কুমারের কাছে ভরতনাট্যম। নাচ আমার ধ্যান-জ্ঞান-ভালোবাসা কিন্তু মা-বাবার ইন্সপিরেশনে আমি রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি আর শাস্ত্রীয়সংগীতেও ভালোরকম তালিম নিয়েছি বিভিন্ন জায়গায়। ডিপ্লোমা করেছি। মা-বাবাই আমার প্রথম গুরু বলা চলে।”

দীপ্তাংশুর মুখে আবেগ খেলে যায়। কেমন ছিল ওঁর রবীন্দ্রভারতীর দিনগুলো? দীপ্তাংশু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, “আমি কীভাবে যে কথাকলিতে চলে এলাম সেটা ভেবে অবাক লাগে এখন। আসলে তখন ইউনিভার্সিটিতে কথাকলির আসন সীমিত ছিল। তবে এই নাচের প্রতি আমার ইন্টারেস্ট তার কিছু আগে। কলামণ্ডলম গৌতমের সম্বন্ধে তুমি লিখেছো এবং জানো। আমরা রাজাদা বলে ডাকতাম। রাজাদার অকালপ্রয়াণ একটা বিরাট ক্ষতি। আরেকজন আছেন পিয়াল ভট্টাচার্য যিনি সম্প্রতি সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার পেলেন। আমি রবীন্দ্রসদনে রাজাদা-পিয়ালদার যৌথ কথাকলি দেখেছিলাম। ওঁরা তখন সদ্য কেরালা কলামণ্ডলম থেকে কথাকলি শিখে ফিরেছেন। ওঁদের সেইদিনকার কথাকলি আমাকে এত মুগ্ধ করেছিল আমি রবীন্দ্রভারতীতে কথাকলি নিয়ে ভর্তি হতে বিন্দুমাত্র আর দ্বিধা করিনি। তবে তার আগে ভরতনাট্যম শিখেছি শ্রী লোকনাথ সাহার কাছে। পরে যখন নাচ শেখাতে গেছি তখন কিন্তু কথাকলির বেশি স্টুডেন্ট আমি পাইনি। সে-সময় আমার ওই ভরতনাট্যম শিক্ষা অনেক বেশি কাজে লেগেছিল।” গার্গী তার মধ্যেই বলেন, “আমার মোহিনীআট্যমে আসার পুরোপুরি ইন্সপিরেশন কিন্তু দীপ্তাংশু। এক সময় ওডিসি শিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দীপ্তাংশুই সাজেস্ট করেছিল শুধু নয়, আমার গুরু শ্রীমতি মোম গাঙ্গুলি চ্যাটার্জির সঙ্গে যোগাযোগও করিয়ে দিয়েছিল ওই-ই। মোমদি আমাকে তৈরি করে দিয়েছেন। আজ যতটুকু মোহিনীআট্যম করতে পারি সবটুকুই দিদির জন্য। দিদি আমাকে নিয়ে বহু জায়গায় প্রোগ্রাম করেছেন। আমাদের বড়ো গুরুজি ভারতী শিবাজি, আমাদের শ্রদ্ধেয় চেচির কাছেও মোমদি অনেকবার আমাকে নিয়ে গেছেন অ্যাডভান্স ট্রেনিংয়ের জন্য। তবে শুধু শাস্ত্রীয়নৃত্য নয়, আমাদের তো জানো বিভিন্ন রকম নাচের মধ্যে থাকতে হয়।” দীপ্তাংশুও একমত। বলেন, “হ্যাঁ তাও ঠিক। আমি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হয়েছিলাম কথাকলিতে। কিন্তু তারপরও ক্রিয়েটিভ করেছি। পাবলিক তো সব সময় শাস্ত্রীয়নৃত্য নিতে পারে তা নয়। আমরা প্রফেশনাল শিল্পী। শাস্ত্রীয়নৃত্যের পাশাপাশি সবরকম নাচের অনুষ্ঠানেই আমাদের ট্রুপ অংশ নেয়। এতে আমাদের তথাকথিত শুদ্ধতা নিয়ে লোকে টিপ্পনি কাটে। কিন্তু আমাদের তো পেটও চালাতে হবে। তাই আমি, গার্গী-দুজনেই দুটো আলাদা আলাদা স্কুলে নাচের টিচার হিসেবে বহু বছর চাকরি করি, ট্রুপ নিয়ে দেশ-বিদেশ যাই আবার নিয়মিত আমার গুরু শ্রী কলামণ্ডলম ভেঙ্কিট স্যারের কাছে আমি কথাকলি প্র্যাকটিস করি আর গার্গী যায় মোমদির কাছে।”

গার্গী হেসে ওঠেন। বলেন, “আরেকটা জিনিস কিন্তু দীপ্তাংশু বললো না। সম্প্রতি দীপ্তাংশু বিভিন্ন সিরিয়ালে অভিনয় করা শুরু করেছে এবং বেশ জনপ্রিয়তার সঙ্গে করছে। এমন কিছু চরিত্র নিজের অভিনয় গুণে তুলে আনছে টিভির পর্দায় যা বাংলার দর্শক আগে তেমন দেখেনি।” বাঃ! এ তো বড়ো আনন্দের কথা। দীপ্তাংশু-গার্গী জুটি তাহলে সাফল্যের অনেক চূড়া ছুঁয়েছে। এটা শুনে দুজনেই হেসে ওঠেন। দীপ্তাংশু বলেন, “এই জুটির কথা যে বললে এটা খাঁটি কথা। আমাদের জুটির কম চড়াই-উৎরাই পার করতে হয়নি! ব্যক্তিগত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত তো আছেই সঙ্গে এমন অনেক মানুষও ছিল যারা আমার যৌথতা নষ্ট করার অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু সকলের আশীর্বাদে দীপ্তাংশু-গার্গীর কথাকলি আর মোহিনীআট্যম রয়ে গেছে ঠিক। সব ঝড়ঝাপটা সহ্য করেই রয়ে গেছে। প্যান্ডেমিকের একটা দমবন্ধ করা সময় গেছে। দিনের পর দিন ডান্সারদের বসে থাকতে হয়েছে। সব মঞ্চ বন্ধ। কল-শোগুলো একে একে ক্যান্সেল হয়ে যাচ্ছে। সেই সময়টাও দুজনে একে অপরের সাথী হয়ে পার করেছি।”

গার্গী কথাটা শেষ হতে দেন না। যোগ করেন, “সেটা আজকালকার ছেলেমেয়েদেরও উপলব্ধি করতে হবে। নৃত্যশিল্পে যৌথতা, গ্রুপ এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভাঙতে সময় লাগে না কিন্তু গড়তে বছর লেগে যায়। নৃত্যশিল্পীরা একে অপরের পাশে দাঁড়ালে দেখবে এই শিল্পের অনেক বাধা বিপত্তি এমনিতেই কেটে যাবে।” আর দীপ্তাংশু-গার্গীর ভবিষ্যৎ? দুজনে একসাথেই বলে ওঠেন, “স্নেহা। আমাদের সন্তান মৈত্রেয়ী। ওকে সাধ্য মতন গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। যদিও আমাদের ক্ষমতা সীমিত। ও এখন কথকনৃত্য শিক্ষা করছে গুরু অসীমবন্ধু ভট্টাচার্যের কাছে। তাছাড়া আমাদের ছাত্রছাত্রীরাও আছে। আমাদের ফলো করতে কাউকে আমরা বলি না। কিন্তু বিশ্বাস করি নাচকে এরাই এগিয়ে নিয়ে যাবে আরও অনেক দূর আমাদের পরে।”

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by