নাচের মুহূর্ত ফ্রেমবদ্ধ করেন যাঁরা…

অরিজিৎ রায়ের তোলা ছবি

পর্ব ৩০

কটা ছবি কেবল স্মৃতি মাত্র নয়। একটা ছবি তার মধ্যে বহন করে অনেক গল্প, ইতিহাস। ঠিক ওই মুহূর্তটা সারা জীবনের জন্য ধরে রেখে ক্যামেরা শিল্পের অনেক উপকার করে। নৃত্যশিল্পের জন্যও তা সত্য। আজ হয়তো ছবি আর ছবির বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যাচ্ছে কিন্তু মঞ্চে নৃত্যশিল্পীর একটি নৃত্যরত ক্ষণের ছবি তুলে স্মৃতি-গল্প-ইতিহাসের পাতায় সুন্দরাক্ষরে লিপিবদ্ধ করেন একজন ফটোগ্রাফার (নাচের ফটোগ্রাফার)। হ্যাঁ, ইংরেজি শব্দ ‘ফটোগ্রাফার’-ই ব্যবহার করছি। কলকাতার নৃত্যবিশ্বে বহু ভালো ফটোগ্রাফার আছেন। সমাজমাধ্যমে সেসব শিল্পীদের তোলা পরম সুন্দর ছবি (নাচের ছবি/ Dance Photography) দেখে বিস্মিত হতে হয়। নৃত্যশিল্পকে কত গভীর করে বুঝলে এত অপূর্ব সব ছবি ওঠে এসব ফটোগ্রাফারদের হাতে তা ভাবলে অবাক হই। আবার এ-ও সত্যি শুধুমাত্র ফটো তোলার জন্য কিংবা সমাজমাধ্যমে কেবল লাইক বাড়ানোর জন্য অনেক রকম নৃত্য আর নৃত্যশিল্পীদের ছবি উঠছে। সেসবের কোনও শৈল্পিক গুণ যেমন নেই তেমন তাদের ভিড়ে ভালো ছবিরও মানুষের নজরে আসতে দেরি হচ্ছে।

তরুণ বোস, অনুদীপা মজুমদার এবং অরিজিৎ রায়

কলকাতার নৃত্যবিশ্বে বহু ভালো ফটোগ্রাফার আছেন। সমাজমাধ্যমে সেসব শিল্পীদের তোলা পরম সুন্দর ছবি দেখে বিস্মিত হতে হয়। নৃত্যশিল্পকে কত গভীর করে বুঝলে এত অপূর্ব সব ছবি ওঠে এসব ফটোগ্রাফারদের হাতে তা ভাবলে অবাক হতে হয়।

আমি অরিজিতের সঙ্গে আলোচনা করি সর্বপ্রথম। অরিজিৎ রায় এ শহরে নাচের-ছবির জন্য খুব অল্প দিনেই খ্যাতিমান হয়েছে। সব ভালো ভালো অনুষ্ঠানেই তার ডাক আসে। বয়স কম, কিন্তু অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেকটাই ভর্তি। অরিজিৎ বলে, “তুমি যেটা বলছো সেটা ঠিক। খারাপ ছবির ভিড়ে ভালো ছবি ঢেকে যায় আবার এটাও সত্যি এসবের বিচারক কে? ছবির কারুকৃতি নাচকে ছাপিয়ে যাচ্ছে নাকি উল্টোটা, সেটা কজন ভেবে দেখেন? কিংবা নাচের-ছবির যে আলাদত্ব সেটা নিয়েই বা কোথায় আলোচনা হয়? যেমন ধরো আমি অনেক বছর নাচ নিজে শিখেছি। ভরতনাট্যমের ছাত্র ছিলাম। অতএব, মঞ্চের একজন শিল্পী শুধু আমার বিষয় নন, তিনি আমার সহকর্মীও। আমি জানি একটা নাচ কোথায় শেষ হয় কোথায় তার শুরু। সব থেকে বড়ো কথা তোমার সাবজেক্ট তো মোশনে আছে এবং তোমার ডিরেকশনে সে চলবে না। নাচের-ছবি তোলা কিন্তু খুবই কঠিন কাজ তাই। আর তারপরে আসে প্রফেশন। মানে ছবি তুলে কিন্তু আমার গ্রাসাচ্ছাদন চলে। সমাজমাধ্যমে দেবার জন্য শখের ছবি যারা তোলে তারা অবলীলায় ফটোগ্রাফারের এই প্রফেশনাল সিরিয়াসনেসটা নষ্ট করে।”

অনুদীপা মজুমদারের তোলা ছবি

 

অরিজিতের কথার সঙ্গে অনেকাংশেই একমত অনুদীপাদি। অনুদীপা মজুমদার আজ নাচের-ছবি তোলার জন্য কলকাতায় প্রখ্যাত শুধু নন মহিলা ফটোগ্রাফার হিসেবে তাঁর বাড়তি সাফল্য কুড়ি-বাইশ বছর এই কাজে টিকে থাকা। তিনি বলেন, “প্রথম প্রথম অনেক সময়ই হয়েছে ঠিক যেন পাত্তা দিতে চাইত না। কিন্তু যখন আমার ছবির কদর বাড়লো তখন তারাই ফোন করত। নাচের-ছবি তোলবার জন্য, কিন্তু নাচ জানাটা সত্যিই দরকার। আমি যেমন অসমে ছিলাম ছোটো বয়সে অনেকগুলো বছর, শাস্ত্রীয়নৃত্যের পাশাপাশি রবীন্দ্রনৃত্যের চর্চাও সেখানে ভালোরকম চলতো। সে-কারণে নাচের প্রতি ভালো লাগা তো জন্মেই ছিল, সেই সঙ্গে নাচের ভঙ্গিমার যে সেন্স ডেভেলপ করেছিল সেটা পরবর্তীকালে আমার ফটোগ্রাফিতে অনেকটাই হেল্প করেছে। তারপর আমার মেয়েও নাচে এলো। একটা খুব ভালো সাবজেক্ট হাতের কাছেই পেলাম! তবে এটা ঠিক যে ফটোগ্রাফারের প্রফেশনাল দিকটাও দেখা প্রয়োজন। একটা সিনেমা থেকে অভিনেতারা যেমন অর্থ রোজগার করেন, ক্যামেরাশিল্পীও করেন। তেমনই নৃত্যশিল্পে শত অসুবিধার মধ্যেও যেমন অর্থের দিকটা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের কাছে, নৃত্যের ফটোগ্রাফিতেও তো তেমনই হওয়া উচিত। এবং সেটা পুরুষ ফটোগ্রাফার, মহিলা ফটোগ্রাফার নির্বিশেষেই হওয়া উচিত। তুমি মহিলা ফটোগ্রাফার বলে উল্লেখ করেছো আমায়, কিন্তু এমন অনেক সময় হয়েছে আমার পুরুষ সহকর্মীরা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। আমিও তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি সাধ্য মতন।” এই বলে অনুদীপাদি হেসে ওঠেন।

তরুণ বোসের তোলা ছবি

নাচের-ছবি এবং সেই ফটোগ্রাফারদের প্রফেশনালিজম নিয়ে তো কথা হলো। নাচের-ছবির যে আলাদত্ব সেটার উল্লেখও এলো। কিন্তু এই জগতে যাঁরা আসতে চান তাঁদের কোন শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন? এর উত্তর পাওয়া গেল তরুণদার কাছে। কলকাতা শুধু নয়, ভারতবর্ষের সব প্রান্তের নৃত্যশিল্পীদের কাছেই তরুণ বোস পরিচিত। আশি বছর পার করা এই কিশোর নাচের-ছবি তোলায় একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি বলেন, “দ্যাখ! নাচের-ছবির জন্য যেমন নাচ জানা গুরুত্বপূর্ণ তেমনই দরকার ফ্রেমের সেন্স। নাচের-ছবি যেন হাত-পা কাটা না হয়। একটা মুদ্রা আর মুভমেন্টের যেন পরিপূর্ণতা সেই ছবিতে ফুটে ওঠে। আর সব চেয়ে বড়ো ব্যাপার কালার। নাচের ছবি এই যুগে আমি অন্তত মনে করি না সাদাকালো আর হওয়া উচিত। একজন পারফর্মারের কস্টিউম আছে, মেকআপ আছে- এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ছবিতে। আর অকারণ এডিটিং একদম জঘন্য একটি জিনিস। নাচের-ছবিকে ন্যাচারাল হতে হবে। আমি ছবি তেমন তুলতে পারলাম না আর ফিল্টার দিয়ে এডিট করলাম সেটা ভীষণরকম খারাপ। তবে নতুন ছেলেমেয়েরা এসব অনেক সময় জেনেই আসছে। সেটা ভালো দিক।”

ঠিক কথা। এইসব কথাগুলো খেয়াল রাখলে নাচের-ছবি আরও সুন্দর হবে। এবং একেকটা ছবি প্রকৃতরূপে বহন করবে একেকজন শিল্পীর নৃত্যবিশ্বের নানা কাহিনি।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।  

Written by