নৃত্যশিল্পী পুলকাদিত্য : বাংলার ‘রুডল্ফ নুরেয়েভ’

পর্ব ৮

ছোটোবেলায় বাড়ির সাদা-কালো টিভিটা ছিল আমাদের বহির্জগৎ। ওতে আমরা হিন্দি ডাবিঙের ‘জাঙ্গল বুক’ দেখতাম, গরমের ছুটিতে ‘ছুটি ছুটি’ অনুষ্ঠান আর একটা সিরিয়াল হত ‘এক সমুদ্র অনেক ঢেউ’, ওটাও। ওই টিভিতে আমরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট-ফুটবল যেমন দেখতাম, নাচ-গান-আবৃত্তির অনুষ্ঠানও বাদ দিতাম না। দূরদর্শনে খুব উচ্চমানের নৃত্যানুষ্ঠান মাঝে মাঝে সম্প্রচার হত যেগুলি ভোলবার নয়। একবার দেখানো হল মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারের ডান্সার্স গিল্ড-এর অনন্যসাধারণ নৃত্যনাট্য ‘অরণ্য অমৃতা’। প্রকৃতি যে আমাদেরই একজন, তার ওপরে আঘাত আসলে যে নিজেদেরকেই নষ্ট করে দেওয়া, সেই ধারণার উপজীব্য ছিল অরণ্য অমৃতা। কিন্তু আমাদের তখন যা বয়স তাতে সেই নৃত্যনাট্য যে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি সে তো বলতে পারি না, তবে রঞ্জাবতী সরকার-এর নাচ দেখে যারপরনাই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেটা মূলত তাঁর শরীরের অনায়াস ভাঙাগড়া দেখে। তখন আমাদের চোখ তৈরি হয়নি, নাচের থেকে জিমনাস্টিক দেখলে অবাক হতাম বেশি। তার মানে এই নয় যে ‘নবনৃত্য’ জিমনাস্টিক ছিল। নবনৃত্য আসলে খুব সাংঘাতিকভাবে, খুবই উচ্চমানের নৃত্যশৈলি এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ওই কুশীলবদের শারীরিক ফিটনেস এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে সেটাই চোখে পড়ত আগে। কিন্তু আমি অরণ্য অমৃতা-তে শুধু রঞ্জাবতী সরকারকে দেখিনি। তাঁর সঙ্গী এক পুরুষ নৃত্যশিল্পীর প্রতি ভালোরকম আকৃষ্ট হয়েছিলাম। তখনও অবধি আমরা জানতাম পুরুষদের নাচও মেয়েদের মতো হয়, কারণ নাচ জিনিসটাই মেয়েদের। কিন্তু সেই শারীরিক নমনীয়তা (যেদিকে-খুশি-বেঁকিয়ে দেওয়ার মতো তৎপর এক শরীর) আমাকে ওই ছোটো বয়সেই মারাত্মক মুগ্ধ করেছিল। পরিচয়লিপিতে তাঁর নাম পড়েছিলাম, পুলকাদিত্য।

আরও বহু বছর পর আমি তখন ক্লাস টেন-ইলেভেনে পড়ি, একটি অনুষ্ঠানে আমার নাচ দেখে এক মেয়ে আলাপ করতে এল। মেয়েটির নাম এখন আর মনে নেই কিন্তু সে পরিচয় দিয়েছিল ‘আমি ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর মাসতুতো বোন’। ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত তখন বাংলা সিনেমার মধ্যগগনে। আর্ট-বানিজ্যিক, সব ধারাতেই দাপিয়ে অভিনয় করছেন। তো নায়িকার বোন অচিরেই আমাদের বন্ধু হয়ে গেল। মেয়েটি আমাদের কয়েকজন ছেলেমেয়েকে প্রস্তাব দিয়েছিল ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর যে নাচের দল ‘ভাবনা আজ ও কাল’, তাতে যোগ দিতে। আমি গরীব বাড়ির ছেলে। বাস-ট্রামের টিকিট কেটে নাচের দলে যোগ দিতে যাওয়া খুবই মুশকিল। কিন্তু মাসতুতো বোন আমাদের যাওয়া-আসার খরচ দেবে বলেছিল। আমি তাই এক ছুটির দিনের সকালে বড়দির সঙ্গে ট্রামে করে পৌঁছে গেলাম রাসবিহারীতে ভাবনা আজ ও কাল-এর ঠিকানায়। আমাদের জানানো হল ওটাও ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর বাড়ি। দুটো বাড়ি পরে আরেকটিতে তাঁর বাসস্থান। নাচের দলের ঠিকানায় পৌঁছে দোতলায় উঠে দেখি রিহার্সাল চলছে পাশাপাশি দুটো ঘরে। একটায় ধীমান শঙ্কর বলে একজন রিহার্সাল করাচ্ছেন আর অন্যটায় আরেকজন। অন্য ঘরটাতে আমায় ঢুকিয়ে দেওয়া হল আর বলা হল পরদিন থেকে পাঞ্জাবি-চুড়িদার নয়, ট্র্যাকসুট আর টিশার্ট পরে আসতে হবে।

কিন্তু সেই ঘরে ঢুকে আমার তো উল্টে পড়ার জোগাড়! শেখাচ্ছেন কে? আরে! এই তো পুলকাদিত্য! ফর্সা, ছিপছিপে কঞ্চির মতো শরীর, মাথায় পনিটেল আর পরনে কালো হাতকাটা গেঞ্জি আর কালো হাফ-প্যান্ট। এতক্ষণের ঘেমো শরীর কালো পোশাকের দরুন আরও ফর্সা লাগছে। আমি যখন ঢুকেছি পুলকাদিত্য তখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে মাটিতে বসে। রিহার্সালের বিরতি। আমায় হাসিমুখে নির্দেশ করলেন, ‘বোসো’। আমিও মুগ্ধ নয়নে ওঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছি। উনি বুঝতে পেরে বললেন, ‘কেমন আছো? ভালো?’ কী আশ্চর্য! আমাদের কখনও দেখাই হয়নি অথচ উনি আমায় কুশল জিজ্ঞাসা করছেন! উনি কি তাহলে টের পেয়েছেন আমাদের আলাপ বহু বছর আগেই টিভির পর্দায় হয়েছে? এরপর যখন নাচ শুরু করলেন তখনও অপলক তাকিয়ে ছিলাম আমি, কেমন ধনুকের মতো শরীরটা বাঁকিয়ে দিচ্ছেন তিনি, পুলকাদিত্য। এই মাটিতে শুয়ে পড়ছেন তো পাশে বেঁকে যাচ্ছেন। পা সোজা তুলে ঠেকিয়ে দিচ্ছেন নিজের কপালে। এত ফিটনেস কোনও যোগগুরুরও মনে হয় থাকে না।

সেদিনের রিহার্সালের পর আমার আর ভাবনা আজ ও কাল বাড়িতে যাওয়া হয়নি। আমি পড়াশোনার ছেলে। নাচ-গানে সময় দেওয়া আমার ভাগ্যে বা ক্ষমতায় নেই। কিন্তু পুলকদাকে ভুলতে পারি না। সেই রিহার্সালের দিন নেওয়া ফোন নম্বরে একদিন ফোন করি পিসিও বুথ থেকে। উনি ওঁর বাড়িতে আসতে বলেন দমদম ক্যান্টনমেন্ট।

কিন্তু আমি পৌঁছালাম গিয়ে দুটি বছর পর। আমার এক বন্ধুকে নিয়ে। দমদমে মেট্রো করে নেমে লোকাল ট্রেনে পরের স্টপেজ ক্যান্টনমেন্ট। বহু খোঁজাখুঁজি করে তস্য গলি ঘুরে একটা নর্দমার সামনে দিয়ে দোতলা বাড়িতে উঠলাম। অন্ধকার সিঁড়ি পেরিয়ে ঘরের দরজার নক করলাম যখন একজন বয়স্ক মহিলা, পাকা চুল খুলে দিলেন দরজা। সামনের হলঘরে অর্ধডিম্বাকৃতি বিরাট টেবিলে বসে আছেন পুলকাদিত্য। আমায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি?’ আমি ওঁকে মনে করিয়ে দিলাম সব।

— ফোন না করে আসলে। যদি না থাকতাম?
— আমি জানি আপনি থাকতেন।
— বাড়ি থাকতে আমার একদম ইচ্ছা করে না।

পুলকদা সেদিন খানিক অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন। কিংবা হতে পারে আমার বোঝার ভুল ছিল। তবে শুধু নৃত্য কেন কলকাতার নানা শিল্পমাধ্যমের মানুষেরই সন্ধ্যার সঙ্গী হয় দু-এক পেয়ালা কারণবারি। জীবনের সমস্ত কষ্ট, ব্যর্থতা, না-পাওয়া, অপমান, অসম্মান ওই পেয়ালায় গুলে খেয়ে নেন তাঁরা। কলকাতার নৃত্যশিল্পীদের জীবন যে কত বর্ণময়, আলো-আঁধারে ঘেরা তা যারা গভীর করে না জেনেছে তারা জানে না। কিন্তু পুলকদার কথায় সেদিন কোনও বাধা ছিল না। জড়ানো শব্দও ছিল না কিছু। কত কথা বলে চললেন। নিজের বাবার কথা। ডান্সার্স গিল্ড-এর কথা। ভাবনা আজ ও কাল ছেড়ে দেবার কথা। আরেকটা কথা বললেন যা শুনে থমকে গেলাম। হিন্দিতে ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ যে সিরিয়াল হত আর নাম দেখানোর সময় একটা ছায়ামুর্তি যে অপূর্ব নাচত আর সেই ছায়ার মধ্যে জ্বলত আগুন; যে সিরিয়াল নব্বই দশকের সব ছেলেমেয়ের খুব প্রিয় ছিল- ওই ছায়ামূর্তিটা আসলে পুলকদাই! মুম্বাই গিয়ে রেকর্ড করেছিলেন। সেদিন অনেক কথা বলছিলেন যেমন, তেমন কথার ফাঁকে ফাঁকে বারবারই বলছিলেন, ‘তোমরা বাড়ি ফিরবে কী করে? লাস্ট মেট্রো ছেড়ে দেবে। আমার এখানে থেকে যাও।’

কিন্তু আমরা বেরিয়ে এসেছিলাম। পেয়ে গিয়েছিলাম শেষ মেট্রো। পুলকাদিত্যের সঙ্গে আমার আর কখনও দেখা হয়নি। ওই রকম মানের নৃত্যশিল্পীও আমি কোনওদিন আর দেখিনি। পুলকদাকে বাংলার ‘রুডল্ফ নুরেয়েভ’ বলা যেতে পারে। কী অপূর্ব বিভঙ্গের শরীর! কী অনন্যসাধারণ শৈলি আর নৃত্যপ্রকরণ! বাংলার বহু ছেলেমেয়ে তাঁর কাছে নৃত্যশিক্ষা করেছে। কিন্তু আজ কোনও মঞ্চেই পুলকদাকে দেখি না। কোনও সমাজমাধ্যমেও তাঁর ছবি চোখে পড়ে না। উনি কেমন আছেন কোথায় আছেন তাও জানা নেই। কিন্তু আজ জানা দরকার বাংলার এক সময়ের এত গুণী শিল্পীরা সব কোথায়, কোন কারণে হারিয়ে যান?

চলবে…

____
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও নানা শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর নতুন ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু।

Written by