তিনি সম্মানিত হয়েছিলেন ‘দ্বিতীয় বিদ্যাপতি’ নামে। যশোরাজ খান তাঁর উপাধি
লোকমতে 'ব্রজবুলি' ব্রজের বোলি বা ভাষা। স্বয়ং রাধা কৃষ্ণ নাকি এই ভাষাতেই রাগ-অনুরাগের কথা বলতেন। এ-ভাষাতেই রাধা নিঙড়ে দিয়েছিলেন কৃষ্ণবিরহের গাঢ় রক্তিম বেদনাটুকু –
ই-সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
ই-ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর।।
অনেকেই বলেন মিথিলার মহাকবি বিদ্যাপতির পদাবলির মৈথিলিভাষা থেকেই জন্ম হয়েছিল কৃত্রিম কাব্যভাষা ব্রজবুলির। তবে পণ্ডিতদের মতে এ-ভাষার জন্ম লৌকিক বা অবহটঠ ভাষার হাত ধরে। মধ্যযুগীয় বাংলাভাষার দ্বিতীয় প্রতিস্পর্ধী কাব্যভাষা ব্রজবুলি। পদলালিত্য ও ধ্বনিঝঙ্কারময়তায় অতুলনীয়। ছন্দপ্রসাধনে, শ্রীখোল-মৃদঙ্গ বাদনের বোল তানে, শ্রবণে-মননে জাগে অপরূপ রতি। ব্রজবুলির উৎপত্তি ও বিকাশ রাজসভাতে – মিথিলা নেপাল উড়িষ্যা আসাম এবং বঙ্গদেশে। আসামে শঙ্করদেব, উড়িষ্যায় রায় রামানন্দ ব্রজবুলিপদ রচনা করে খ্যাতি লাভ করেন।
বাংলাদেশে প্রথম ব্রজবুলি ভাষায় কাব্য রচনা করে যশস্বী হয়েছিলেন যশোরাজ খান। যশোরাজের দৌহিত্র গোবিন্দদাস কবিরাজ ছিলেন বাংলায় ব্রজবুলি ভাষার শ্রেষ্ঠপদকর্তা। গৌরলীলা ও কৃষ্ণলীলার প্রেমামৃতকে ব্রজবুলির আখরে বেঁধেছিলেন। এই কারণেই তিনি সম্মানিত হয়েছিলেন ‘দ্বিতীয় বিদ্যাপতি’ নামে। যশোরাজ খান কবির উপাধি। প্রকৃত নাম দামোদর সেন। নিবাস পূর্ববর্ধমান জেলার কাটোয়ার সন্নিকটে শ্রীপাট শ্রীখণ্ড গ্রামে। সপ্তদশ শতকের কবি রামগোপাল দাসের রসকল্পবল্লীর দ্বাদশ কোরকে আছে –
যশোরাজ খান দামোদর মহাকবি।
কবিরঞ্জন আদিসবে রাজসেবি।।
তিনি আরও জানিয়েছেন যশোরাজ খান জাতিতে বৈদ্য এবং শ্রীখণ্ডের বিখ্যাত রাঘব সেনের বংশধর ছিলেন। রাঘব সেনের প্রতিষ্ঠিত দুগ্ধেশ্বর শিবলিঙ্গ আজও নিত্য পূজিত হয় শ্রীখণ্ডে। রামগোপালের পুত্র পীতাম্বর দাসের ‘রসমঞ্জরী’তে যশোরাজ খানের একটি মাত্র পদ উদ্ধৃত হয়েছে।
এক পয়োধর চন্দনে লেপিত
আরে সহজই গোর।
হিম ধরাধর কোলে মিলল
ভূধরধরা যোর।।
মাধব, তুয়া দরশন কাজে।
আধ পদ চালান করিঞা সুন্দরী
বাহির দেহলী মাঝে।।
নীল ধবল কমল দুঅ চান্দ
পূজল কত কোটি কাম।।
পদটি শৃঙ্গার রসাত্মক। রাধাবাড়িতে প্রসাধন করছিলেন। স্তনে চন্দন আর চক্ষুতে দিচ্ছিলেন কাজল। এমন সময় শুনতে পেলেন তাঁর প্রিয়তম মাধব আসছেন। অমনি অসম্পূর্ণ সাজ-সজ্জা ফেলে দেউড়িতে এসে অস্থির ভাবে পদচারণা করতে লাগলেন। সেই অসম্পূর্ণ প্রণয়প্রসাধনের আলঙ্কারিক চাতুর্য পদের উপজীব্য বিষয়। কবির ভণিতাসূত্রে জানা যায় – তিনি গৌড়েশ্বর হোসেন শাহের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন। হোশেন শাহের রাজত্বকাল ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দ। সুতরাং বোঝাই যায় যশোরাজ খান ষোড়শ শতকের দ্বিতীয় দশকের মধ্যেই কাব্য রচনা করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সংস্কৃতির(প্রথম খণ্ড) লেখক গবেষক বিনয় ঘোষ লিখেছেন – মহাকবি দামোদর গৌড় দরবার থেকে কৃষ্ণমঙ্গলকাব্য রচনা করে যশোরাজ খান উপাধি পেয়েছিলেন।
আরও পড়ুন
ইতুপুজো – ইতিহাস ও লোকাচার
ক্ষেত্রসমীক্ষাসূত্রে জানা যায় দামোদর ঢাকার বিক্রমপুর থেকে আগত ধ্বন্বন্তরী গোত্রীয় বৈদ্য ছিলেন। ইনি ছিলেন দিগ্বিজয়ী কবি পণ্ডিত। গোবিন্দদাস কবিরাজের লেখা সঙ্গীতমাধব থেকে জানা যায় –
পাতালে বাসুকির্বক্তা স্বর্গে বক্তা বৃহস্পতিঃ।
গৌড়ে গোবর্ধনো দাতা খণ্ডে দামোদরঃ কবি।।
শ্লোকটি থেকে জানা যাচ্ছে গৌড়ে তখন দাতা হিসাবে খ্যাত ছিলেন গোবর্ধন নামে জনৈক ব্যক্তি। আর মহাকবি হিসাবে সম্মানিত হয়েছিলেন শ্রীখণ্ডের দামোদর সেন। দামোদরের পিতার নাম ধনঞ্জয়। প্রবাদ আছে দামোদর এক পণ্ডিতকে তর্ক যুদ্ধে পরাজিত করে অভিশাপগ্রস্ত হয়েছিলেন, তাঁর যেন পুত্রসন্তান না হয়। একটি মাত্র কন্যা সুনন্দার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল কুমারনগরবাসী চিরঞ্জীব সেনের সঙ্গে।
দামোদর ছিলেন দশভূজার ভক্ত। অষ্টধাতুর দশভূজা মূর্তিটি কয়েক বছর আগে চুরি হয়ে গেছে শ্রীখণ্ড থেকে। আজও দামোদর সেনের কুলদেবী সেই দশভুজা নিত্য পূজিত হয়ে চলেছে শ্রীপাট শ্রীখণ্ডের রাউবাড়ির মন্দিরে। দামোদর সেনের দুই বিখ্যাত পৌত্র মহাপণ্ডিত রামচন্দ্র কবিরাজ। আর গোবিন্দদাস কবিরাজ প্রথম জীবনে ছিলেন এই দশভূজার সেবক এবং ভক্ত। পরে তিনি শ্রীনিবাস আচার্যের কাছে বৈষ্ণবমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে লিখেছিলেন বৈষ্ণবপদাবলি।