সিপিআইএমের খেলাটা এবার বোঝা যাচ্ছে

বিজেপি বিরোধী মহাজোটে ফাটল ধরাতে চায় মার্কসবাদীরা

সিপিআইএম নিয়ে কিছুদিন আগেও কাগজপত্রে প্রচুর লেখালেখি হতো। টেলিভিশনে চুলচেরা বিশ্লেষণে অনেক সময়ই বিষয় থাকত সিপিআইএমের নানা কীর্তিকলাপ। ইদানিং সেই মাতামাতি প্রায় থেমেই গিয়েছে। রাজ্যবাসী তথা সংবাদমাধ্যমের লোকজন ধরেই নিয়েছে, এককালের দৌর্দণ্ডপ্রতাপ দল ধীরে ধীরে কালের গর্ভে ক্রম-বিলীয়মান। সিপিআইএম নিজেও যে তা না জানে, তা নয়। তাই যা কিছু দলটার ভালো ছিল, সবই একে একে হারাতে বসেছে এই একদা প্রবল মার্কসবাদী দলটি। কিন্তু সবথেকে দুঃখ হয়, যখন দেখি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এমনকী বিজেপির সঙ্গেও গোপন বোঝাপড়া করতে পিছপা হচ্ছে না তথাকথিত মার্কসবাদের ধ্বজাধারী সিপিআইএম। অতি সম্প্রতি সেই মনোভাবটাই আবার রাজ্যসভা ভোটকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে।

এ রাজ্যে রাজ্যসভা ভোট
১৮ আগস্ট এ রাজ্য থেকে নির্বাচিত ৬ জন রাজ্যসভার সদস্যের কার্যকাল শেষ হচ্ছে। তাই পশ্চিমবঙ্গের বিধায়কদের আবার ছয়জন রাজ্যসভা সদস্য নির্বাচন করতে হবে। যে ৬ জনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, তাঁরা হলেন সুখেন্দু শেখর রায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন, দেবব্রত বন্দ্যেপাধ্যায়, দোলা সেন, সীতারাম ইয়েচুরি ও প্রদীপ ভট্টাচার্য। এর মধ্যে প্রথম চারজন তৃণমূল কংগ্রেসের, পঞ্চম সাংসদ সীতারাম ইয়েচুরি বর্তমানে সিপিআইএমের সাধারণ সম্পাদক ও ষষ্ঠ জন কংগ্রেস নেতা।

সারণি-১
কোন রাজ্য থেকে কতজন রাজ্যসভার সদস্য
অন্ধ্রপ্রদেশ – ১৮
অরুণাচলপ্রদেশ – ১
আসাম – ৭
বিহার – ১৬
ছত্তিসগঢ় – ৫
গোয়া -১
গুজরাত – ১১
হরিয়ানা – ৫
হিমাচল প্রদেশ – ৩
জম্মু ও কাশ্মীর – ৪
ঝাড়খণ্ড – ৬
কর্ণাটক – ১২
কেরালা – ৯
মধ্যপ্রদেশ – ১১
মহারাষ্ট্র – ১৯
মণিপুর -১
মেঘালয় – ১
মিজোরাম -১
নাগাল্যান্ড – ১
দিল্লি – ৩
উড়িষ্যা – ১০
পুদুচ্চেরি – ১
পাঞ্জাব – ৭
রাজস্থান – ১০
সিকিম – ১
তামিলনাড়ু – ১৮
ত্রিপুরা – ১
উত্তরপ্রেদশ – ৩১
উত্তরাখণ্ড – ৩
পশ্চিমবঙ্গ – ১৬
মনোনীত – ১২
—————–
মোট – ২৪৫

রাজ্যসভাতে সর্বোচ্চ আসন হতে পারে ২৫০। এর মধ্যে ২৩৮ জন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি থেকে নির্বাচিত ও ১২ জন মনোনীত। বর্তমানে ২৪৩ জন রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলগুলি থেকে নির্বাচিত হন এবং ১২ জন রাষ্ট্রপতি দ্বারা মনোনীত হন।
২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে যে নতুন শক্তির বিন্যাস হয়েছে, তাতে তৃণমূল কংগ্রেস একাই এই ছয়টি আসনের মধ্যে ৫টিতে জিততে পারে। তৃণমূল সেই অনুযায়ী ৫ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বেশ কয়েকিদন আগেই। এঁরা হলেন ডেরেক ও’ব্রায়েন, সুখেন্দুশেখর রায়, দোলা সেন, মানস ভুইঞা ও শান্তা ছেত্রি। ষষ্ঠ আসনে যেমন তৃণমূলের একার জেতার সম্ভাবনা নেই, তেমনই বর্তমানে কংগ্রেসের যে অবস্থা তাতে তারাও একা জিততে পারবে না। আর বামফ্রন্টের তো কোনও প্রশ্নই নেই।

সারণি-২
১) রাজ্যসভা ভোটে কেবলমাত্র বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যরাই ভোট দেন। কোনও কোনও রাজ্যে মনোনীত বিধান পরিষদ থাকলেও সেই সদস্যরা ভোট দিতে পারেন না।

২)প্রতি বিধায়কের ভোটমূল্য = মোট যতজন বিধায়ক ভোট দিয়েছেন+ ১
মোট যতগুলি আসনে ভোট হচ্ছে+১

অর্থাৎ যদি এ রাজ্যে ২৯৪ জন বিধায়কই ভোট দেন, তবে ৬টি আসন পূরণের জন্য প্রতি বিধায়কের ভোটমূল্য হয় (২৯৪ ভাগ ৭)+১=৪৩

৩) ভোটের পদ্ধতির নাম সিঙ্গল ট্র্যান্সফারেবল্ ভোট পদ্ধতি। এখানে একজন বিধায়ক প্রথম পছন্দের ভোট দেওয়ার পরে দ্বিতীয় পছন্দের ভোটও দিতে পারেন। যদি ২৯৪ জনই ভোট দেন, তবে যে প্রার্থী ৪৩টি বা তার বেশি প্রথম পছন্দের ভোট পেয়ে যাবেন, তিনিই নির্বাচিত হয়ে যাবেন। এভাবে ৬ জনই নির্বাচিত হয়ে গেলে গণনা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু যদি তা না হয়, যেমন ধরা যাক, ৫ জন ৪৩-এর বেশি ভোট পেল, তবে ওই ৫ জন নির্বাচিত হবেন এবং বাকি ২ জন প্রার্থী থাকলে তাদের মধ্যে যার ভোট সবথেকে কম তাঁর প্রার্থীপদ বাতিল করা হবে এবং অন্যজন নির্বাচিত হবেন। কিন্তু যিদ সর্বনিম্ন প্রথম পছন্দের ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বাতিল করার পরেও একাধিক প্রার্থী থেকে যান, তবে দ্বিতীয় পছন্দের ভোট গোনা হবে।

৩) কংগ্রেসের বর্তমান অবস্থায় ৩৪টি প্রথম পছন্দের ভোট পাওয়াও কঠিন। আর বামফ্রন্ট ৩০-৩১টি প্রথম পছন্দের ভোট পেতে পারে।

৪) তবে অনেক নাটকের পর বামেদের প্রার্থীপদ বাতিল হওয়ায় এবার এ রাজ্যে ভোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

এই অবস্থায় তৃণমূল নেত্রী তথা রাজ্যের মু্খ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চেয়েছিলেন, বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যের চেহারা ফুটিয়ে তুলতে ষষ্ঠ আসনে এমন একজনকে প্রার্থী করা হোক যিনি সবার পছন্দের। মাত্র ক’দিন আগেই রাষ্ট্রপতি ভোটে মীরা কুমারকে তৃণমূল, কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট সবাই ভোট দিয়েছে। সেই মীরাদেবীই যদি প্রার্থী হন, তাহলে তৃণমূল তাঁকে সমর্থন করবে বলে আগাম ঘোষণাও করে দেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু সিপিআইএম সেই উদ্যোগে জল ঢেলে দিল। তাদের কেন্দ্রীয় কমিটি ঠিক করল, তারা নিজেরাই প্রার্থী দেবে। কেন?

এই কেনটার উত্তর খুঁজতেই আমাদের একটু আলোচনা করতে হবে সিপিআইএমের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কাজকর্মে। যে দলটা একসময় নিজেদের দেশের প্রধান বামপন্থী রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচয় দিত, তারাই বর্তমানে সব নীতি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে একমাত্র তৃণমূল বিরোধিতাকেই সম্বল করেছে। ফলে তাদের প্রতিটি কার্যকলাপে গভীর বৈপরীত্ব চোখে পড়েছে। রাষ্ট্রপতি ভোটে নিজেদের প্রার্থী দেবার ক্ষমতা নেই, আবার সোজাসুজি বিজেপির প্রার্থীকে সমর্থন করারও মুখ নেই, তাই বাধ্য হয়ে তৃণমূল নেত্রী প্রস্তাবিত কংগ্রেস নেত্রী মীরা কুমারকে সমর্থন জুগিয়েছে। কিন্তু যখনই রাজ্যসভার ভোটের প্রশ্ন এসেছে, এমন রাজনীতি করতে শুরু করলেন, যাতে মনে হয়, বিজেপি বিরোধী জোটের কোনও অস্তিত্ব নেই।এমনকী এ-ও নানা মহল থেকে বলা হয়েছিল, মীরা কুমারেক পছন্দ না হলে এমন কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হোক, যাঁকে কারোরই সমর্থন দিতে অসুবিধা হবে না। কিন্তু বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে সিপিআইএমের দরকার ছিল এমন রাজনীতি করা, যাতে মনে হয়, বিজেপি বিরোধী কোনও জোট হওয়া সম্ভব নয়। এমনিতেই বিহাএর নীতিশ কুমারের বিজেপির কোলে গিয়ে বসার পরে ধর্মনিরপেক্ষ জোটে কিছুটা ভাঙন ধরেছে। এবার রাজ্যসভা ভোটেও সিপিআইএম বুঝিয়ে দিল, আর যা-ই হোক, ধর্মনিরপেক্ষ মহাজোটে তারা নেই। কিন্তু এই অর্থহীন এবং ভয়ংকর রাজনীতি করে তারা কী টিকতে পারবে? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটাও জানা। এই মুহূর্তে ভোট হলে একটিও লোকসভা আসন তো দূরের কথা এমনকী বিধানসভা আসনেও তারা জিততে পারবে না। ইতিহাসে লেখা থাকবে, অবশেষে সূর্য-বিমানদের হাত ধরে প্রায় একশো বছরের দলটি যাদুঘরে স্থান পেয়েছে। কমরেডরা একটু ভাববেন কি?

Developed by DXDasia