সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ২৭
পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ে মানুষের আর্থিক অসঙ্গতিই তাঁদের পরিবারের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের পথে ঠেলে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে স্কুলে একটা বড়ো ভূমিকা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিছু স্কুল এই পরিস্থিতিতে বাল্যবিবাহ আটকাতে গিয়ে অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যায়। এমন নজির এই রাজ্য শুধু নয় সারা দেশের সমস্ত পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মধ্যেই বিদ্যমান।
পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহের হার বেশি, কেন্দ্রীয় সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের পরই বাল্যবিবাহে দ্বিতীয় স্থানে আছে বিহার। তবে পশ্চিমবঙ্গে যেমন বাল্যবিবাহের হার বেশি, তেমনই বাল্যবিবাহ রুখতে দেশের মধ্যে সবচেয়ে তৎপরতা এরাজ্যেই সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায় বলে মনে করে ইউনিসেফ। কিন্তু, তারপরেও রাজ্যে বাল্যবিবাহ বেশি কেন তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এ বিষয়ে সমাজকর্মীরা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি স্বাধীনচেতা। বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করার প্রবণতা এ রাজ্যেই বেশি। এই সমস্ত কারণে রাজ্যে বাল্যবিবাহের হার বেশি।
এই স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্য মেয়েরা বিংবা ছেলেরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে করে ফেলছে, এমন তথ্য পাওয়া গেল পূর্ব মেদিনীপুরের কন্টাই টাউন বা কাঁথি শহরের রাখাল চন্দ্র বিদ্যাপীঠের (Contai Town Rakhal Chandra Vidyapith) প্রধান শিক্ষক নির্মল কুমার আদকের সঙ্গে কথা বলে। তাঁর কথায়, “আমার স্কুলে ১ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়ে। তাদের মধ্যে বছরে ২ থেকে ৪ জন অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে করে নিচ্ছে। কেউ কেউ নিজে থেকে পালিয়ে বিয়ে করছে। কেউ আবার পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি না থাকার জন্য বিয়ে করে নিতে বাধ্য হচ্ছে, বাড়ির চাপে। আর একটি কারণ পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের সংস্কার।”
প্রধান শিক্ষক নির্মল কুমার আদক
এই ধরনের বিয়ে রুখতে গিয়ে নির্মলবাবুদের এমনও অভিজ্ঞতা হয়েছে, যে বিয়ে আটকাতে গিয়ে তাঁদের অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। “আমরা এই ধরনের বিয়েতে নিষেধ করলে বাবা, মা বলেন, আমরা একটা ভালো ছেলে পেয়েছি। এখন আপনার কথায় মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে পারি, কিন্তু আপনি কি গ্যারিন্টি দেবেন যে আমার মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলে এরকমই একজন ভালো পাত্র আপনি আমার মেয়ের জন্য খুঁজে আনবেন? এই কথা শুনে অসহায় অবস্থায় ফিরে আসতে হয়। কেননা যিনি এই কথা বলছেন, তিনি আর্থিক সামর্থ না থাকার জন্যই মেয়েকে কম বয়সে জেনে, বুঝেই বিয়ে দিচ্ছেন। আমরা অনেক সময় পাত্রকে বলেও দেখেছি, মেয়েটাকে আরও একটু পড়তে দিন, চার-পাঁচটা বছর অপেক্ষা করে যান, তারপর বিয়েটা আপনার সঙ্গেই হবে, তাতে পাত্র বা পাত্রপক্ষ রাজি হয় না। আর থানায় জানালে বিয়ে না হয় রুখে দেবে, তার পর ওই মেয়েটার দায়িত্ব কে নেবে? এই সময় নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।” বলেন নির্মলবাবু।
এঁদের মধ্যে অনেক অভিভাবক আবার সন্তানদের পড়াতে চান কিন্তু কখনও পিছিয়ে পড়া মনোভাব, কখনও আর্থিক অসঙ্গতি, বিভিন্ন কারণে তা আর হয়ে ওঠে না। রাখাল চন্দ্র বিদ্যাপীঠের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয় ১৯৭০ সালের ৬ জুন। তবে স্কুলে পঠনপাঠন শুরু হয় ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি। কাঁথি শহরে এই স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল মূলত পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার আলো দেখানোর জন্য। শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত সেই প্রয়াস জারি আছে। তবে, “শুধুমাত্র পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার আলোয় আনতে গেলে স্কুলের শিক্ষার মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছিল। তাই আমরা শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখতে স্কুলে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদেরও ভর্তি করা শুরু হল, ২০১২ সালে স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি চালু হওয়ার পর।”, বলছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
যে সমস্ত ছেলে-মেয়েরা ভালো স্কুলগুলোতে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না, তারা এই স্কুলে পড়ার সুযোগ পাবে, শিক্ষা থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না, এই ভাবনা থেকেই স্কুলের পথ চলা শুরু।
১৯৭৩ সালে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পঠনপাঠন শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের অ্যাফিলিয়েশন পায় স্কুলটি। ১৯৭৩ সালে ক্লাস নাইন শুরু হয়। ১৯৭৪ সালে প্রথম কন্টাই টাউন রাখাল চন্দ্র বিদ্যাপীঠ থেকে ৪ জন মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়। ৪ জনই পাশ করেছিল। ১৯৯৯ সালে প্রথম উচ্চমাধ্যমিক চালু হয় এই স্কুলে।

পীযূষকান্তি দাস নামে এক ব্যক্তি, যিনি অন্য একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, তিনি কন্টাই টাউনে একটা স্কুল তৈরি করার উদ্যোগ নেন। রাখালচন্দ্র দত্ত’র ছেলে সুধাংশু শেখর দত্ত প্রথমে এই স্কুলের জন্য ২১ ডেসিমেল জায়গা দান করেন। সেই জমির ওপরই প্রথম স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়। রাখাল চন্দ্র দত্ত ছিলেন পীযূষকান্তি দাস মহাশয়ের শ্বশুর মহাশয়। দত্ত পরিবারের তিন ছেলে শুধাংশু শেখর দত্ত, হিমাংশু শেখর দত্ত, সিতাংশু শেখর দত্ত এবং এই পরিবারের তিন মেয়ে ইন্দুবালা দত্ত, রেনুকাবালা দত্ত ও গৌড়ীবালা দত্ত, এই ৬ ভাইবোন মিলে আরও ৮৭ ডেসিমেল জায়গা দান করেন স্কুলের জন্য। পরবর্তীকালে ওই জায়গার উপরই স্কুলের এখন যে ভবন, তা তৈরি হয়। ১৯৭০ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময়ই স্কুলটির নাম ‘কন্টাই টাউন রাখাল চন্দ্র বিদ্যাপীঠ’ নামে যাত্রা শুরু করে। ২০০০ সালে স্কুলে উচ্চমাধ্যমিক চালু হয়।
স্কুলক্যাম্পাস
স্কুল তৈরির ইতিহাসের কথা প্রসঙ্গে প্রধান শিক্ষক নির্মলবাবু বলছিলেন, “কাঁথিতে ৭টা হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল আছে। সেগুলো ভালো স্কুল। আমাদের স্কুলটা সবার পরে তৈরি হয়। স্কুলটা তৈরি হয়েছিল এই লক্ষ্য নিয়েই, যে সমস্ত ছেলে-মেয়েরা ওই ভালো স্কুলগুলোতে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না, তারা আমাদের স্কুলে পড়ার সুযোগ পাবে, শিক্ষা থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে না। তাই বলা যায় পিছিয়ে পড়া ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা করার জন্যই স্কুলটি কাজ শুরু করে। পরে ২০১২ সালে যখন প্রবেশিকা পরীক্ষাই উঠেই গেল, তখন যে কোনও ছাত্র-ছাত্রী যে কোনও স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেতে শুরু করল। তখন পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে এসে পাশ করানোর কাজ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হয়েছে। তখন সর্বস্তরের ছেলে-মেয়েরা আমাদের স্কুলে ভর্তি হওয়া শুরু করে। তার পর থেকে আমরা চেষ্টা করছি স্কুলে যাতে ভালো রেজাল্ট করানো যায়। এপর্যন্ত মাধ্যমিকে এই স্কুল থেকে ২০২২ সালে সবচেয়ে বেশি নম্বর উঠেছে ৬৫৯, যা শতাংশের হিসাবে ৯৪.১৪%। ২০২৩ সালে উচ্চমাধ্যমিকে ৪৭৫ নম্বর উঠেছে, শতাংশের হিসাবে যা ৯৫%। ২০২০ সালে উচ্চমাধ্যমিকে ৪৮০ নম্বর উঠেছিল (৯৬%)। এপর্যন্ত স্কুলের ইতিহাসে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত নম্বর এগুলোই।”


উচ্চমাধ্যমিকে কলা এবং বিজ্ঞান বিভাগে পড়ানো হয় এই স্কুলে। বিজ্ঞান বিভাগের জন্য ফিজিক্স কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, কম্পিউটার ল্যাবরেটরি আছে। এছাড়াও ভূগোল, নিউট্রিশানের জন্য আলাদা ল্যাবরেটরি আছে। রয়েছে স্মার্ট ক্লাস। ভোকেশনাল এডুকেশনের ব্যবস্থা আছে। সেখানে আমিন সার্ভে অর্থাৎ জমি জরিপের কাজ শেখানো হয়। স্কুলের নিজস্ব জিম আছে। এই মুহূর্তে স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা ১ হাজারের কাছাকাছি। শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন প্রধান শিক্ষককে নিয়ে ৩৬ জন। অশিক্ষক কর্মী আছেন ৫ জন।
স্মার্ট ক্লাস
স্কুল ভবনটি তিনতলা। মোট শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা ২০। স্মার্ট ক্লাসে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের একটা করে ক্লাস থাকে। তাতে বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোলের ক্লাস নেওয়া হয়। অডিও-ভিস্যুয়াল মাধ্যমে এই ক্লাসগুলি হয়। এটা স্কুলটির একটা বিশেষত্ব।

লাইব্রেরি
স্কুলে প্রথম প্রজন্মের কিছু ছাত্র-ছাত্রী আসে তাছাড়া বাকি সবই দ্বিতীয় প্রজন্মের পড়ুয়া। যারা পড়তে আসে এই স্কুলে তাদের একটা বড়ো অংশ আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা অংশের মানুষ। “কাজেই সমাজের পিছিয়ে থাকা ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাদানের লক্ষ্য নিয়ে স্কুলের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আমরা সেই জায়গা থেকে এখনও বের হতে পারিনি”, বলছিলেন নির্মলবাবু। তিনি আরও বললেন, “শুধু পিছিয়ে থাকা অংশের ছেলে-মেয়েদের জন্য স্কুলটাকে পরিচালিত করলে স্কুলকে এখনকার দিনে টিকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। তাই আমরা পিছিয়ে থাকা পড়ুয়াদের যেমন শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসছি, তেমনই ভালো পড়ুয়াদের ভালো ফলাফলকে সম্বল করে স্কুলকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। দু’টোই সমান্তরাল ভাবে চলছে।”

স্কুলে নিখরচায় প্রতি শনিবার দুপুর দেড়টা থেকে যোগব্যায়াম শেখানো হয়। প্রতি বছর ইন্টার ক্লাস ফুটবল প্রতিযোগিতা হয়, স্কুলে দুটো ওয়াল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। একটা সরস্বতী পূজার সময় অন্যটা শারদীয় সংখ্যা হিসাবে প্রকাশিত হয়, এছাড়া ছাপানো স্কুল ম্যাগাজিন একটা নির্দিষ্ট সময়ান্তে প্রকাশিত হয়। এই ম্যাগাজিনে পড়ুয়ারাই লেখে। প্রতি বছর স্কুল থেকে শিক্ষা মূলক ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হয়। মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা আছে। মেয়েদের জন্য কন্যাশ্রী ক্লাব আছে। কনজিউমার ক্লাব আছে, যেখানে ক্রেতার অধিকার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। তার পর রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা দফতর থেকে যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় সেখানে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে যাওয়া হয়। রাজ্য সরকার আয়োজিত যুব উৎসবে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় কন্টাই টাউন রাখাল চন্দ্র বিদ্যাপীঠ একবার দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে।
গ্রিড নির্ভর সোলার পাওয়ার
স্কুলে এক সময় হস্টেল ছিল। সরকারি অনুমোদন না থাকায় সেই হস্টেলটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে কন্যাশ্রীর আর্থিক সুবিধা পাওয়ার জন্য কিছু ছাত্রী স্কুলে এলেও তাদের সেই অর্থে লেখাপড়ায় আগ্রহ নেই বলেই জানান প্রধান শিক্ষক। তবে কন্যাশ্রীর জন্য স্কুলছুট ছাত্রীসংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে বলেও জানান তিনি। স্কুলে গ্রিড নির্ভর সোলার পাওয়ার জেনারেশন হয়। স্কুলে উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বন্টন বিভাগে চলে যায়। স্কুলের যা বিদ্যুৎ খরচ হয়, স্কুল তার চাইতে বেশি সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তবে স্কুলের যা বিদ্যুৎ খরচ হয় তার ১০% বিদ্যুত খরচের টাকা নিয়মানুযায়ী রাজ্য বিদ্যুৎ বন্টন বিভাগকে স্কুলের দিতে হয় মাসিক ভিত্তিতে, জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক।
____________________________________
তথ্যসূত্র : নির্মল কুমার আদক, প্রধান শিক্ষক, কন্টাই টাউন রাখাল চন্দ্র বিদ্যাপীঠ
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।