কেমন আছে ঐতিহ্যের শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন?

শিলিগুড়ির সঙ্গে তখন দার্জিলিং পাহাড়ের ১৯ মাইল পথ রেল দ্বারা যুক্ত হয়েছিল

দেশপ্রেমিক ও মনিষীদের স্মৃতিধন্য শিলিগুড়ির ঐতিহ্যমণ্ডিত টাউন স্টেশনে চলছে এখন জঙ্গলরাজ।

ইতিহাসবিদেরা বলেন, শিলিগুড়ির এই রেল স্টেশন হয় ১৮৭৮ সালের পর। শিলিগুড়ির সঙ্গে তখন দার্জিলিং পাহাড়ের ১৯ মাইল পথ রেল দ্বারা যুক্ত হয়েছিল। ১৮৮১ সালের পর যখন কলকাতার সঙ্গে দার্জিলিং-এর রেল যোগাযোগ পুরোপুরি চালু হল তখন থেকে সেই শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত ভারতবিখ্যাত ও ভারতের বাইরের স্বনামধন্য অনেক মানুষ এই শিলিগুড়ির রেল স্টেশনে কিছু সময় কাটিয়ে টয়ট্রেনে দার্জিলিং পাহাড়ে গিয়েছেন। কোচবিহারের মহারাজা, নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ আসেন এই স্টেশনে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের হাত ধরে আসেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি একাও আসেন পরে। আমেরিকার সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন, স্বামী বিবেকানন্দ, নিবেদিতা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ শিলিগুড়ির এই স্টেশন দিয়েই দার্জিলিং গিয়েছেন। স্বর্ণলতা দেবী, পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী, স্বামী নির্ভয়ানন্দ, সাহিত্যিক জলধর সেন, দেবেন্দ্রনাথের কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবী, যতীন্দ্রভূষণ আচার্য, সাংবাদিক লেখক গোপাল নারায়ণ মজুমদার, হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ প্রমুখ এই স্টেশন দিয়েই দার্জিলিং গিয়েছেন। তাঁরা এখানে বিশ্রামও নিয়েছেন। বিপ্লবী বাঘাযতীনের সঙ্গে ইংরেজ সৈনিকদের যে বিবাদের কথা প্রচলিত আছে তা এই স্টেশন ঘিরেই। ১৯০৬ সালে বাঘাযতীন দার্জিলিং-এ কর্মরত ছিলেন। কলকাতা থেকে দার্জিলিং যাওয়ার সময় ওই স্টেশনে একবার বাঘাযতীন দেখেন, এক মহিলার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছেন জনৈক ইংরেজ। তা দেখে সেই সাহেবকে ঘুষি মারেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও কয়েকবার এই স্টেশনের ওপর দিয়েই কার্শিয়াং যান।

এই রকম দেশপ্রেমিকদের স্মৃতিধন্য শিলিগুড়ির টাউন স্টেশনকে রেলমন্ত্রী থাকার সময় হেরিটেজ হিসাবে ঘোষণা করেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কিছুই হয়নি স্টেশন চত্বরে। ওই স্টেশনে মহিষীদের স্মৃতিধন্য প্ল্যাটফর্মে আজ সবসময় ভবঘুরেদের আনাগোনা। স্টেশনে ঘুরে বেড়ায় কুকুর, ছাগল, শুয়োর। স্টেশনের পাশেই জঙ্গল। দিনের পর দিন তা পরিষ্কার করা হয় না, ঘুরে বেড়ায় সাপ। স্টেশনের সব ঘর দিয়েই জল পড়ে। আরপিএফের কর্মীরা বেশি বৃষ্টি হলে প্ল্যাটফর্মে চেয়ার পেতে কাজ করেন। দিন রাত সবসময় বসছে নেশার আসর। ঐতিহ্যমণ্ডিত স্টেশনের গায়ে নতুন রূপে ষ্টেশন সম্প্রসারণ না হলেও হেরিটেজ বিল্ডিং-এর কোনও সংস্কার হয়নি। স্টেশনের চারপাশে রেলের জমি দিনের পর দিন দখল করে যাচ্ছে দুষ্কৃতীরা। আর সেখানেই বসছে বাজার। স্টেশন দিয়ে বহুদিন চলে না ট্রয় ট্রেন। এখন সেখানে হলদিবাড়ি প্যাসেঞ্জার, আলিপুরদুয়ার ও বামনহাট প্যাসেঞ্জার দিনে দুবার দাঁড়ায়। আর সারাদিনে তার ওপর দিয়ে যাতায়াত করে ৩০টি ট্রেন। প্রতিদিন সেখানে ৫০০ জন যাত্রী ওঠা নামা করেন। এন এফ রেল এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন এর যুগ্ম শাখা সম্পাদক তনুজ দে বলেন, তারা চাইছেন এই স্টেশনের অবস্থার উন্নতি হোক। স্টেশনের সামনে ফুলের বাগান তৈরি করে দেশের গান আর মনিষীদের ছবি টাঙানো যেতে পারে। রেলের পদস্থ আধিকারিক পার্থ শীল বলেন, তারা বেশ হতাশ ওই স্টেশন নিয়ে। স্টেশনের চারপাশে জবরদখল করে বস্তি, বাজার হচ্ছে। সে সব তুলে সৌন্দর্য বাড়ানো যায়। কিন্তু জবর দখল তোলা যাচ্ছে না। রেল সেখানে কাজ করতে চায়। কিন্তু বাধা পাচ্ছে। আর দিনের পর দিন নানান বাধা চলতে থাকায় ওই স্টেশনের জন্য আসা রেল দফতরের প্রায় এক কোটি টাকা ফেরত চলে গিয়েছে। সেখানকার এক আরপিএফ কর্মী বলেন, তাঁরা এখন কোনওমতে দেখে রাখছেন। তাঁরা না থাকলে স্টেশনটিই ধীরে ধীরে দখল হয়ে যাবে।

Developed by DXDasia