অধ্যাপকের অবসর

অধ্যাপকের অবসর অবশেষে ৬২ হল। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরেও শিক্ষকরা ৬৫-টির দিকে তাকিয়ে

সেদিন, ৭ জানুয়ারি, ২০১৭, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসভায় মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী অনেক কিছু বলেছেন, আবার অনেক কিছু বলেননি, তা নিয়ে দুচার কথা বলা প্রয়োজন।

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী আরও একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার কথা বললেন। বর্তমান সরকার নেই নেই করেও ন’টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে। আরও একটি! এর কী কোনও প্রয়োজন আছে? আমি বলব, অবশ্যই আছে, যদি তা হয় মডেল বিশ্ববিদ্যালয়।

বামফ্রন্ট সরকার শস্তায় বাজিমাত করতে কলেজে স্নাতকোত্তর লেখাপড়ার আয়োজনে উৎসাহ দিয়েছিল। সেই পথ পরিত্যক্ত হয়নি, প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু, অধিকাংশ কলেজে স্নাতকোত্তর লেখাপড়ার যোগ্য কাঠামো (শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, লাইব্রেরি, গবেষণাগার ইত্যাদি) নেই, এবং, স্নাতকোত্তর লেখাপড়ার চাপে স্নাতক স্তরের লেখাপড়াও তাই গোল্লায় যাবার পথে। শিক্ষার মান – যা ছিল আমাদের গর্ব –  তা দ্রুত নেমেছে।

শিক্ষার মান রক্ষা করতে চাই ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয়। ভালো মানের শিক্ষার আয়োজন করতে পারলে আমাদের ছেলেমেয়েদের ধরে রাখা শুধু নয়, আমরা ভিন রাজ্যের/দেশের ছেলেমেয়েকেও টানতে পারব। আমাদের ছেলেমেয়েদেরও আর বিদেশ-বিভুঁয়ে দৌড়োতে হবে না।

প্রশ্ন হল – ভালো মানের শিক্ষার আয়োজন করতে পারব কী? পারব, যদি শিক্ষাক্ষেত্রে দখলের রাজনীতি তথা রাজনৈতিক দলের নাক গলানো বন্ধ হয়, কাঠামোর উন্নতি হয়। মুখ্যমন্ত্রী তাই চান, কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী? সংশয় থেকেই যায়, কারণ তিনি শিক্ষা নামের বিজ্ঞানটি শিখতেও চান না, জানতেও চান না এবং তিনি কিছু বামফ্রন্টীয় বন্ধুর কাঁধে চেপে বৈতরণী পার হতে চাইছেন। এবং তাঁর ভরসা RUSA-। RUSA-র টাকা যে ঘটির জল তা খেয়ালে রাখছেন না, বিলাসব্যসনে, অপ্রয়োজনে অপচয়িত হচ্ছে। যা দিয়ে গড়তে পারতাম প্রতিমা তা দিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে কাদা বা পাঁক।

এখনও সময় আছে – চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে ভালো মানের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার দক্ষতা, যোগ্যতা ও সঙ্গতি আমাদের আছে। প্রসঙ্গত বলতে চাই যে, দীর্ঘকাল সরকারি কলেজ শিক্ষকরা দাবি জানিয়ে আসছেন, সরকারি কলেজগুলি, যেগুলিকে বলা হয় মডেল কলেজ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাতার তলায় আনা হোক, শিক্ষা কমিশনের সুপারিশও ছিল তাই। এতে Convoy সমস্যার মতো অনেক সমস্যার সহজ সমাধান সম্ভব। এখনও সময় আছে, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বিবেচনা করতে পারেন।

এই রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা প্রাইভেট টিউশন। পশ্চিমবঙ্গেই নাকি প্রাইভেট টিউশন নামের বাজারটি সবচেয়ে তেজী। মুখ্যমন্ত্রী প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেছেন। ভালোই করেছেন। একথা মানতেই হবে যে  প্রাইভেট টিউশন অসুখের লক্ষণ, কারণ নয়। কারণ খুঁজতে যেতে হবে সমাজে, মানুষের উচ্চাশার মর্মে, বাজারে, শিক্ষার্থীর শৈশবে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার আয়োজনে। প্রাইভেট টিউশন ছিল, আছে ও থাকবে। সীমিত প্রয়োগে তা শিক্ষার্থীর উপকারে আসে, অপরিমিত প্রয়োগে বিপর্যয় ঘটায় এই কথাটি বুঝতে হবে অভিভাবকদেরও। কোনও সরকার এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। বিধি বা আইন দিয়ে তো নয়ই।

শিক্ষার মান যে পড়ছে তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। হয়তো তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ – শিক্ষকের অভাব। আংশিক সময়ের বা চুক্তিবদ্ধ শিক্ষক দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সমস্যা মেটেনি, আরও গভীর হয়েছে – ভাড়াটে সৈনিক দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ছ’মাসের মধ্যে শূন্য পদ পূরণ করা হবে। এটা যে হবে না তা জোর দিয়েই বলা যায়। তাঁর সদিচ্ছায় বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, কিন্তু সন্দেহ আছে শিক্ষাদপ্তরের কর্মদক্ষতায়।  কাজটা করতে পারে শিক্ষা অধিকার, কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে  দেখা গেল শিক্ষাদপ্তরই সব, শিক্ষা অধিকার(Directorate) বলে কিছু আছে বলে বোঝা গেল না। যেন দপ্তর আর অধিকার দেওয়াল গেঁথে আলাদা করে তোলা, যেন  জাতপাতের লড়াই আছে সেখানে। দপ্তর চালান আমলারা, অধিকার চলে শিক্ষকদের নেতৃত্বে। শিক্ষা অধিকারের যে বিপুল ঐতিহ্য আছে, ইউরোপীয় শিক্ষা ও জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চায় তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে মন্ত্রী বা দপ্তরের কর্তারা সম্ভবত তা জানেন না বা মানেন না। দুটো পাই আছে, কিন্তু শিক্ষা কর্তারা দৌড়োতে চান এক পায়ে, এরই নাম বুঝি আত্মঘাতী বুদ্ধি!

Developed by DXDasia