অধ্যাপকের অবসর

অধ্যাপকের অবসর অবশেষে ৬২ হল। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরেও শিক্ষকরা ৬৫-টির দিকে তাকিয়ে

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সবাইকে ডেকে নিয়ে আলোচনার আয়োজন করেছিল রাজ্য সরকার। অভূতপূর্ব, অসীমসাহসী এবং অবশ্য প্রশংসনীয় এক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে। শিক্ষকরা আশা ও আশঙ্কায় ছিলেন। দলে দলে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর কথা শুনতে। তাঁদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী এক গুচ্ছ ‘সুবিধা দানের প্রস্তাব ঘোষণা করলেন।

অনেকেই খুশি, অবসরের বয়স বাড়ল, সহজবোধ্য কারণেই খুশি। কিন্তু অবসরের বয়স বাড়াটা অপ্রত্যাশিত কী? কিছুটা নিশ্চয়।

অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল না নানা কারণে। এক এক করে বলি।

১৯৮৬ তে ইউজিসি তার বেতন কাঠামোতে প্রস্তাব করেছিল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬০ রেখে বাড়ানো হোক পুনর্নিয়োগের সুযোগ। বামফ্রন্ট পরিচালিত রাজ্য সরকার তা একটা সময়ের পর কলেজ শিক্ষকদের জন্য আর মানেনি। ইউজিসি আরও চেয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মতো কলেজগুলিতেও চালু করা হোক Merit Promotion Scheme, সে প্রস্তাব সকলকে জানতেই দিলেন না সেই সময়ের WBCUTA নেতৃত্ব।

১৯৯৬ এর ইউজিসি বেতন কাঠামোতে অবসরের বয়স ৬২ করার সুপারিশ ছিল স্পষ্ট, মানল না সরকার। আমাদের ছোট সমিতি(ABSGCTA) আইনি সমাধান চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হল, তার রায় (সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে অবসরের বয়স ৬২ করার বিষয়টি রাজ্য সরকারকে বিবেচনার সুপারিশ করেছিল) বেরোতে বেরোতে এসে পড়ল ২০০৬ এর ইউজিসি প্রস্তাব যাতে বলা হয়েছিল কেন্দ্র তার ভাগের টাকা দেবে যদি রাজ্য মূল প্রস্তাবের সবটুকু মানে। মূল প্রস্তাবে বলা হয়েছিল শিক্ষকদের অবসরের বয়স করা হোক ৬৫। সে সময় বামফ্রন্ট সরকারের বিদায় ঘণ্টা বেজে গেছে, তারা কিছুই করল না। সে সরকার করতেও চায়নি, WBCUTA তার ‘বন্ধু’ সরকারকে বিব্রতও করতে চায়নি।

নতুন সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সুবিবেচনার আশ্বাস মিলেছিল। মুখ্যমন্ত্রীর সহানুভূতি ছিল ইউজিসির সুপারিশ ছিল, সর্বোচ্চ আদালতের সুপরামর্শ ছিল, তবু অবসরের বয়স বাড়ানো যায়নি। কেন?

এই সময় মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে সুযোগ পেয়ে শিক্ষকদের অবসরের বয়স ৬৫ বছর করার প্রস্তাব দি’ , এবং অঙ্ক কষে দেখাই যে তাতে সরকারের আর্থিক দায় বাড়বে না, শূন্যপদ পূরণের সমস্যা মিটবে, শিক্ষকমহলে সরকারের সদিচ্ছার বার্তা যাবে। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী একদিন আমাকে বললেন, মুখ্যসচিব তো অন্য হিসেব দিচ্ছেন। মুখ্যসচিবকে ডাকলেন তিনি। সমরবাবু, মুখ্যসচিব, বললেন খরচ বাড়বে তিনগুণ এবং নতুন প্রজন্মের ক্ষতি হবে।

সরকারিভাবে স্বীকৃত শূন্যপদের সংখ্যার দিকে তাকিয়ে এবং শিক্ষাপ্রসারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনের দিকটা আলোচনা করতেই নতুন প্রজন্মের ক্ষতি যে হবে না তা স্পষ্ট হল। কিন্তু খরচ? সময়রবাবুকে বললাম, আমি যে হিসেবটা দিয়েছি তার পাশে আপনারটা রেখে তুলনা করে দেখি না, আসুন।

সমরবাবু বিজ্ঞানের নামী ছাত্র ছিলেন, তিনি জরুরি কাজ আছে বলে উঠে পড়লেন, সে তুলনা তথা অঙ্ক কষা আর হল না। এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে বুঝলাম দেশের আমলাবাহিনি এই প্রস্তাব কার্যকর হোক চায় না। সম্ভবত, তাদের চাপে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রিয় সরকার ও ইউজিসি পিছু হঠল, সুপ্রিম কোর্টও জানিয়ে দেয় যে ইউজিসি সুপারিশ বাধ্যতামূলক নয়, অবসরের বয়স ৬০ই থাকল, কিছু রাজ্য অবশ্য অবসরের বয়স বাড়াল।

আমলাদের কোনও ক্ষতি হয়নি, তাদের জেদ বজায় রইল, বোঝা গেল তাদের হাত বেশ লম্বা। ক্ষতি হল রাজ্য সরকারের, শিক্ষকদের। এবং অবশ্যই শিক্ষার।

কেবল অবসরের বয়স নয়, আজও শিক্ষকরা ২০০৬ এর বেতনক্রমের বকেয়ার পুরোটা পাননি, CAS এর সুফল বা ন্যায্য প্রাপ্য আজও পুরোপুরি পাননি সব শিক্ষক, ইউজিসির প্রস্তাবে থাকা অন্য সুযোগ-সুবিধার কথা ভুলতেই হল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনর্নিয়োগের রীতিতে অবশ্য বদল হয়নি (ঢালাও পুনর্নিয়োগের কথা কিন্তু কোথায়ও বলা ছিল না, বামফ্রন্ট আমলেও কেউ কেউ পাননি এবং তাঁরা পাননি একেবারেই সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির কারণে। সেসব কথা WBCUTA ও বলে না, বর্তমান কর্তারা জানেন না বা মহাসুখে ভুলে গেছেন)।

ক্ষতস্থানে প্রলেপ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। শিক্ষকদের ক্ষোভ বাড়ছিল নানা সঙ্গত কারণে। অনেক না-পাওয়ার বেদনার পাশাপাশি উপেক্ষা ও অপমানও ছিল, ছিল অসঙ্গতিতে ভরা উচ্চশিক্ষা বিল, শিক্ষামন্ত্রীর উদ্ধত আচরণ, শিক্ষানীতি নির্মাণে ও তার প্রয়োগে অবাঞ্ছিত বামশিক্ষকদের কাঁধে ভর দেওয়া শিক্ষাদপ্তর, শিক্ষাপ্রসারে অপরিকল্পিত সরকারি উদ্যোগ, বেসরকারি ব্যবসায়িক উদ্যোগে ধোঁয়া দেওয়া ইত্যাদিও ক্ষোভ বাড়াচ্ছিল। মুখ্যমন্ত্রী যথাসময়েই হাল ধরলেন। ‘তোমার জয় তো আমারই জয়’। নজর ঘোরালেন। শিক্ষাপ্রাঙ্গণে অশান্তি, মারপিট, দুর্নীতি- এসব চাপা দেবার প্রয়োজনটাও খুব জরুরি হয়ে উঠেছিল।

এর জন্য তাঁকে কিছু মূল্য নিশ্চয় দিতে হয়েছে। বিনি পয়সায় ভোজ তো হয় না। আমলাদের পাশে টানতে হয়েছে সেটাইতো এক মস্ত কাজ (তাঁদের খুশি করতে আগেই অনেক দিয়েছেন তিনি, তাঁদের পদোন্নতির সুযোগ বেড়েছে, ক্ষমতা বাড়াতে  হয়েছে)। রাজ্যের বেহাল অর্থভাণ্ডারকে কিছুটা স্বস্তি দিতেও এই উদ্যোগ সাহায্য করবে। কেউ অবসর নিলে তাঁর প্রাপ্য মেটাতে তো কম টাকা লাগে না। এখন যা হাল তাতে ‘রাই কুড়িয়ে বেল’ তত্ত্বও ম্যানেজারদের বুকে কিছুটা বল জোগায় বৈকি।

Developed by DXDasia