টাইমপাস : শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী প্রতিমা বেদীর আত্মজীবনী

পর্ব ২৩

ভিভাবকের সাফল্য সন্তানের সুরক্ষায়। সেই যে ঈশ্বরী পাটনী বর চেয়েছিল ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’, সেই যুগ থেকে আজ অবধি সন্তান সুস্থ, সুন্দর থাকবে এর থেকে বড়ো-পাওয়া অভিভাবকের কাছে আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু কোনও সন্তান যদি হঠাৎ আত্মহননের পথ বেছে নেয়, অভিভাবক টের পাবার আগেই সে পৃথিবী থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তখন সেই অভিভাবকদের পোড়া-মনে সন্দেহ জাগে: তবে কি তাঁরাই সন্তানকে শেখাতে পারেননি এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে শেষতক কীভাবে লড়ে যেতে হবে? আর কীভাবেই-বা চর্চা করতে হবে প্রাত্যহিক আনন্দের? আমেরিকায় ছেলে সিদ্ধার্থের মৃত্যুর পর প্রতিমা বেদী (Protima Bedi) দিশেহারা হয়ে যান। জীবনে এর আগে অনেক ভেঙে-পড়া এসেছে তাঁর, কিন্তু প্রিয় পুত্রের এ-হেন আত্মহত্যা তাঁকে ছাড়খাড় করে দিয়ে যায়। তিনি বেছে নেন সন্ন্যাসের পথ। নাম নেন প্রতিমা গৌরী। ওই ডাকসাইটে সুন্দরী কুচি কুচি করে সমস্ত চুল কেটে ফেলে মুণ্ডিত মস্তক হন। হিমালয়ের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। বলতেন, পাহাড়ের অনেক কথা বলার আছে, যে শুনতে পায় সে ছুটে যায়। নিজের ‘নৃত্যগ্রাম’-এর কাজ চলছে তখন পুরোদমে। ছাত্রী সুরূপা সেন বা বিজয়িনী শতপথীদের মঞ্চ প্রবেশ হয়ে গিয়েছে। শুধু ওডিসি নৃত্যে নয়, ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যের যে-কোনও শাখার তুলনাতেই নৃত্যগ্রাম (Nrityagram) তখন একটা ব্র্যান্ড। প্রতিমা গৌরী সে-সময় কৈলাস মানসসরোবর-যাত্রায় বেরিয়ে পড়েন। ফিরে আসেন কি? পুরোটা ফেরেন না। ফেরে তাঁর অবশিষ্টাংশ। তাঁর স্মৃতিশরীর। ভারতবর্ষ এক প্রকৃত নৃত্যনক্ষত্রকে হারায়।

প্রতিমা বেদীর ফটোশ্যুট

ভারতবর্ষের আত্মজীবনী-সাহিত্যে প্রতিমা বেদীর আত্মজীবনী টাইমপাস একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এত কপটহীন ভাষায় শুধু জীবনের সত্য তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তা আজও বিস্ময়কর। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে এমনকি মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাঁর প্রেম-যৌনতার কথা বলতে তিনি পিছপা হননি।

কলকাতা বইমেলা এসে পড়েছে। বাঙালি বই পড়ে না বলে একটা অভিযোগের সুর এই সময় চারিদিকে ভাসে ঠিকই, কিন্তু বইমেলা অন্তে কোটি-কোটি বই বিক্রির যে হিসেব পাওয়া যায় তাতে কখনওই মনে হয় না বই-পড়া বাঙালির জীবন থেকে উঠে গেছে। মেলায় নানা কিসিমের বই বিক্রি হয়। পল্লবগ্রাহী বাঙালি বিভিন্ন ভাষার এবং বিচিত্র বিষয়ের ওপর বই পড়ে এবং চর্চা করে। আমার কৌতুহল বাঙালি সংগীতশিল্পী কিংবা নৃত্যশিল্পীদের বই পড়ে কি না। সংগীতশিল্পী প্রণীত বাংলা ভাষায় অনেক বই আছে শুধু নয় সে-সব বই সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে এমনও হয়েছে। মূলধারার কাগজে, পত্রিকায় সংগীতশিল্পীদের বই নিয়ে যথেষ্ট আলোচনাও হয়েছে। সংগীতশিল্পীদের জীবন বহু পত্র-পত্রিকার প্রচ্ছদকাহিনি হয়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় নৃত্যশিল্পীরা একেবারেই অনালোচিত। বাংলা ভাষায় কেন ভারতের যে-কোনও ভাষা এমনকি ইংরেজিতেও নৃত্যশিল্প কিংবা শিল্পীদের নিয়ে খুব উচ্চমানের কোনও বই আছে তা হলফ করে বলা যায় না। যা আছে তা কেজো, নৃত্য-ব্যাকরণের বই কিংবা নিরস আত্মজীবনী। একমাত্র ব্যতিক্রম প্রতিমা বেদীর ‘টাইমপাস’ (প্রকাশ:২০০০, পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া)।

নৃত্যরত প্রতিমা (বাঁদিকে), গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের সঙ্গে প্রতিমা (ডানদিকে)

১৯৭৪ সালে প্রতিমা তখনকার বম্বের সমুদ্রতীরে একটা ফোটোশ্যুট করেছিলেন। সেই শুটিঙে তাঁর গায়ে একটি সুতো পর্যন্ত ছিল না। এখনও ভারতবর্ষ দ্বিধার সঙ্গে ন্যুড-মডেল (Nude Model Protima Bedi) বলতে যা বোঝে এতগুলো বছর আগে প্রতিমা সেসবের সমস্ত সংজ্ঞা ভেঙে নতুন এক যুগের সূচনা করেন। তিনি তখনও কোনও অভিনেত্রী নন, পরিচিত মুখও নন। কিন্তু ভারতবর্ষের বড়ো বড়ো কাগজে অচিরেই তিনি বিপ্লবের মুখ হয়ে ওঠেন। এরপর চলতে থাকে প্রতিমার চড়াই-উৎরাই জীবন। কতরকম বিতর্ক, প্রতিবাদ তাঁকে ঘিরে! কোনওকিছুকেই তোয়াক্কা না করে প্রতিমা জীবনপথে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে চলেন। কিন্তু সাধারণ ধারণার তথাকথিত সুন্দরী তিনি ছিলেন না। গায়ের রঙে শ্যামবর্ণা, মোটা-ঠোঁট, ভোঁতা নাক। আকর্ষণীয় বলতে বড়ো, বড়ো দুটো গভীর চোখ। তাও সংবাদ শিরোনামে পৌঁছাতে তাঁর সময় লাগেনি। তাঁর সেই জীবন ছিল উত্তাল। আত্মজীবনীতে সেই সময়কে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘ইন সিন’ অর্থাৎ পাপবিদ্ধ বলে। কবীর বেদী-র (Kabir Bedi) সঙ্গে থাকবেন বলে তিনি ঘর ছেড়ে ছিলেন। তাঁদের বিয়ে সুখের হয়নি। কবীরকে তিনি ভেবেছিলেন উন্নতমনের মানুষ কিন্তু মেয়েরা ভারতবর্ষে যখন বউ হয়ে যায় তখন তাদের ডানা মেলবার কোনও সুযোগ থাকে না। প্রতিমার জীবনেও তাই-ই হয়েছিল। কিন্তু প্রতিমা সেসব মেনে নিয়েছিলেন। কোলে এসেছিল কন্যা পূজা আর পুত্র সিদ্ধার্থ। সব ঠিক চলছিল হয়তো কিন্তু কবীরের নারীপ্রিয়তা এবং প্রাত্যহিক অত্যাচার প্রতিমাকে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছিল। প্রতিমা ঢুকে পড়ছিলেন মদের অন্ধকারময় জীবনে। কবীরের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল।

 

সব কিছু একদিন পালটে গেল যখন ওড়িশার একজন বেঁটে, পান-খাওয়া মুখের নৃত্যগুরুর নাচ তিনি বম্বের একটি অডিটোরিয়ামে দেখলেন। সেই নৃত্যগুরু আর কেউ নন স্বয়ং গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র। এরপরের গল্প সকলের জানা। প্রতিমা তারপর প্রত্যহ প্রায় বারো-চোদ্দ ঘণ্টা ওডিসির মতো কঠিন নাচ শিখে, চর্চা করে খুব কম সময়ে হয়ে উঠলেন ওডিসি নৃত্যের কিংবদন্তী। ‘টাইমপাস’-এর একটা জায়গা আমায় খুব নাড়া দিয়েছিল যখন প্রতিমা গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে যিনি নাস্তিক তিনি নৃত্যের ধর্মীয় অভিনয়গুলো কীভাবে করবেন? গুরুর উত্তর ছিল সেটা কীভাবে করবে বড়ো কথা নয়, করে উঠতে পারলেই তো সে বড়ো অভিনেতা!

কন্যা পূজা বেদীর সঙ্গে প্রতিমা বেদী

ভারতবর্ষের আত্মজীবনী-সাহিত্যে প্রতিমা বেদীর আত্মজীবনী টাইমপাস (Timepass by Protima Bedi) একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এত কপটহীন ভাষায় শুধু জীবনের সত্য তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তা আজও বিস্ময়কর। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে এমনকি মন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাঁর প্রেম-যৌনতার কথা বলতে তিনি পিছপা হননি। ডায়েরি, চিঠি এবং তাঁর টানা লেখা নিয়েই তৈরি হয়েছিল ‘টাইমপাস’ যা কন্যা পূজা বেদী (Puja Bedi) প্রকাশ করেছিলেন প্রতিমার মৃত্যুর পর। মেয়েরা ভারতবর্ষের বুকে যখনই নিজের শক্তিতে কিছু করতে চেয়েছে তখনই চরিত্রহীনতার অভিযোগ তাদের মস্তকে নেমে এসেছে। বাইরে কাজ করা মেয়ে মানে, পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা কিংবা পুরুষকেই কাজে ছাড়িয়ে যাওয়া মেয়ে মানে সেই মেয়ে নষ্ট! প্রতিমাকেও সারাজীবন তা শুনতে হয়েছে। তাও তিনি থেমে থাকেননি। নৃত্যগ্রাম-এর মতো শুধু নাচ নিয়ে আর তো কোনও ইনস্টিটিউট ভারতে গড়ে উঠলো না। প্রতিমা নিজের সময়ের থেকে এগিয়ে ছিলেন অনেকটা। প্রকৃত নারীবাদের এক উজ্জ্বল উদাহরণ নিঃসন্দেহে প্রতিমা গৌরী।

টাইমপাস গ্রন্থ

গ্রন্থের ‘টাইমপাস’ নামটিও উল্লেখযোগ্য। এদেশে মেয়েদের কিছু করাকে আমরা আজও ফাউ হিসেবে দেখি। ‘ওই ওর টাইমপাস হয় না বলে একটা কাজে দিয়েছি’ বলে অনেক সময় অনুযোগ করে মেয়েদের স্বামীরা। মেয়েদের সব কাজকর্ম যেন কেবল ‘টাইমপাস’। ভারতীয় শাস্ত্রীয়নৃত্যের একজন উঁচুদরের শিল্পী হয়েও প্রতিমা আত্মজীবনীর নাম রাখেন ‘টাইমপাস’। সে যে কেবল ভারতবর্ষে নারীদের স্থান আজও ঠিক কোন জায়গায় তা বোঝানোর তাগিদ এবং তাচ্ছিল্যে, তা আজ আর বুঝতে ভুল হয় না। প্রতিমা বেদী বিরচিত ‘টাইমপাস’ ভারতীয় নৃত্যশিক্ষার সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের অবশ্য পাঠ্য বিশেষত মেয়েদের।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by