
রবীন্দ্রনাথের লেখা ছবিতে যেন কথা বলে উঠল আলাদা ভাবে প্রাণ পেল
বাংলার ছবিতে আবার বর্ষার মেজাজটা বরাবরই অন্য জাতের। ডুব ডুব মাঠ প্রান্তর, ছাতা মাথায় মানুষ অথবা কোন কাল্পনিক মেঘবালিকার হাতে বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল অথবা সরাসরি বন্যা এলো ডুবে গেল চেহারা। একবার অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুরে জমিদারি সামলাতে গেলেন। শাহজাদপুর তখন বর্ষায় ডুবু-ডুবু। গ্রামগঞ্জ, কাছারি বাড়ি, রেলস্টেশন সবই গিয়েছে ভেসে। জমিদারির হিসেব নিকেশ প্যাস্টরাতে ভরে রেখে পারিবারিক বোট নিয়ে রঙ তুলি আর কাগজ নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ চললেন বাংলার জল থৈ থৈ অবস্থার ছবি আঁকতে। তিনি শাহজাদপুর ঘোরেন আর ছবি এঁকে রাখেন বর্ষার। এ হল ছবি আঁকিয়ে জমিদারের বর্ষা বিহার।
অবনীন্দ্রনাথের মতো তাঁর অগ্রজ গগনেন্দ্রনাথও গ্রাম বাংলার বর্ষার ছবি এঁকেছেন। কিন্তু রবি কাকার সঙ্গে যুগলবন্দিতে যা করেছেন সে কথা না বললেই নয়।
বাংলা ১৩১৯। শিলাইদহ’র নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ৫৫ নম্বর আপার চিৎপুর রোডের আদি ব্রাহ্ম সমাজ প্রেস থেকে ছেপে প্রকাশ করলেন রবীন্দ্রনাথের ‘জীবন স্মৃতি’। সেই লেখার জন্য পাতায় পাতায় ছবি আঁকলেন গগনেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের লেখা ছবিতে যেন কথা বলে উঠল আলাদা ভাবে প্রাণ পেল। জীবন স্মৃতির সেই পর্বে রবীন্দ্রনাথ বর্ষার বিবরণে জোড়াসাঁকো ভেসে যাওয়ার কথা লিখেছেন, আর বলেছেন মাষ্টার মশাই অঘোর বাবুর আগমনের কথা। সেই ছবিকেই আদর মাখা ওয়াশে মূর্ত করলেন গগনেন্দ্রনাথ। মূর্ত করেছেন কলকাতার আকাশে মেঘ জমার গল্পকেও। তাই বলতেই হয় বর্ষার আবেদন যেন বারে বারেই যথার্থ শিল্পীদের তুলিকে স্পর্শ করেছে আপন বিশিষ্টতায়।
‘মেঘদূতের’ সাহিত্য সৃষ্টিকে নিবিড় অলঙ্করণ করেছিলেন রাম গোপাল বিজয় বর্গীয়। কী অসাধারণ সেই রেখার চলন। মেঘের চলনের রেখা থেকে চয়ন করে তুলে আনা সেই রেখা আমাদের আশ্চর্য করে। বর্ষা আঁকার কাহিনী অনেক। একবার রামকিঙ্কর বেইজ শান্তিনিকেতনের ক্যানেল পাড়ের সেতুর ওপর নেমে আসা প্রবল বর্ষার ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন ‘লিনো কাটে’। ছাতা মাথায় ছোট্ট মানুষটির তাল বেতল অবস্থা এক লহমায় বর্ষার তাণ্ডবের চেহারাকে স্পষ্ট করে তোলে। এভাবেই বাংলার শিল্পীদের হাতে বর্ষা মূর্ত হয়ে উঠেছে। সমকালের বিকাশ ভট্টাচার্য্য আরও অনেকেই এঁকেছেন বর্ষার ছবি। সে সব মন ভেজানো ছবিতেই এবার একটু চোখ বোলানো।
