রেকর্ড লাভের পরেও বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন
গত আর্থিক বছরেই ২৫ কোটি টাকার রেকর্ড মুনাফা করেছে এই শতাব্দীপ্রাচীন সংস্থাটি। ২০০৭ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় সাহায্য মেলেনি। কর্মচারীদের উদ্যোগে সংস্থা নিজেই ঘুরে দাঁড়িয়ে পর পর তিন বছর লাভের মুখ দেখেছে। তা সত্ত্বেও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের স্মৃতি বিজড়িত বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিটিউক্যালস নামের রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ সংস্থার বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্রীয় সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর জানিয়েছেন, বেঙ্গল কেমিক্যালস ও হিন্দুস্তান অ্যান্টিবায়োটিকসের ‘স্ট্র্যাটেজিক সেল’ হবে। সংস্থাগুলির অতিরিক্ত জমি বেচে টাকা তোলা হবে। কিন্তু, একটি লাভজনক ও ঐতিহ্যবাহী সংস্থাকে বিলগ্নিকরণের এই সিদ্ধান্ত কেন—সেই প্রশ্নই তুলছেন সংস্থার কর্মচারীরা।
দেশের প্রথম ওষুধ সংস্থা বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিটিউক্যালসের জন্ম ১৯০১ সালে। প্রতিষ্ঠাতা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। প্রফুল্লচন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া চাকরির বিকল্প হিসেবে গড়ে উঠুক এই সংস্থা। তাঁর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়নি। প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মধ্যেই লাভের মুখ দেখে বেঙ্গল কেমিক্যালস। ব্যবসার পরিমাণও বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে কর্মচারীর সংখ্যা। ১৯০৮ সালে জন কুমিং জানিয়েছিলেন, বাংলার সমস্ত পুঁজিপতিদের বেঙ্গল কেমিক্যালসের থেকে ব্যবসায়িক দক্ষতার লক্ষণ শেখা উচিত। বাংলার নিজস্ব কর্মোদ্যোগের গৌরব বহন করত এই সংস্থা। বেঙ্গল কেমিক্যালস নিছক একটি প্রতিষ্ঠান নয়, স্বয়ং একটি ইতিহাসও।
১৯৭৭ সালে বেঙ্গল কেমিক্যালসের জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্র। তারপর, ২০১৬ সালে সংস্থার বিলগ্নিকরণ ও উদ্বৃত্ত জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। সংস্থার কর্মচারীরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন। সিঙ্গল বেঞ্চের রায়ে বিলগ্নিকরণের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। এরপর ফের ডিভিশন বেঞ্চে মামলা করে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই মামলার রায় এখনো বেরোয়নি। তারমধ্যেই ফের বিলগ্নিকরণের ঘোষণা।
স্বাভাবিকভাবেই, কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না বেঙ্গল কেমিক্যালসের কর্মচারীরা। যে হারে এখন লাভ করছে এই সংস্থা তাতে সমস্ত ঋণ মিটিয়ে ২০২৩ সালের মধ্যেই এর ‘মিনিরত্ন’-র স্বীকৃতি পাওয়ার কথা। অনেকেই বলছেন, এই বিলগ্নিকরণের সিদ্ধান্তের মূলে আসলে অন্য কারণ রয়েছে। বেঙ্গল কেমিক্যালসের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে এভাবেই বেসরকারি হাতে তুলে দিতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। সংস্থার নিজস্ব পেটেন্ট, বাজার যে পরিমাণে রয়েছে, তাতে বেসরকারি নানা সংস্থারই আগ্রহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তাতে কার লাভ– প্রশ্ন তুলছে ওয়াকিবহাল মহল! বেসরকারি সংস্থা নিজেদের মুনাফার কথাই প্রথমে ভাববে। এই সংস্থার ইতিহাস, জন্মকালীন উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের কিছুই যাবে আসবে না। উল্টে এমন একটি লাভজনক সংস্থার মালিকানা কেন্দ্রীয় সরকারের হাত থেকে বেরিয়ে যাবে। অথচ, বেঙ্গল কেমিক্যালসকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারকে বিশেষ কোনো ব্যয়ভারই বহন করতে হচ্ছিল না। তাহলে এই সিদ্ধান্ত কেন, প্রশ্ন উঠছেই।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির এহেন বিলগ্নিকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠেছে রাজ্যের ভিতরে। বিধানসভায় এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রস্তাবও পাশ হয়েছে। বেঙ্গল কেমিক্যালসের এক কর্মচারী বলছিলেন, বিএসএনএল-এর মতো বিরাট সংস্থাকেও এইভাবে ধীরে ধীরে বিলগ্নিকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি। অথচ, সারা দেশে বিএসএনএলের মতো নেটওয়র্ক অন্য কোনো মোবাইল সংস্থার ছিল না। সেইসব বেসরকারি মোবাইল সংস্থাকে বিশেষ সুবিধে পাইয়ে দিতেই যেন গোটা চিত্রনাট্য সাজানো হয়েছিল। এখনো রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ সংস্থাগুলিকে রুগ্ন করে ক্রমে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়াই কেন্দ্রীয় সরকারের লক্ষ্য। অবশ্য বিলগ্নিকরণ নিয়ে বিশেষ লুকোছাপা নেই কেন্দ্রের। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন তো বাজেটের দিনই বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির বিলগ্নিকরণের পথে ঝড়ের গতিতে এগোতে চায় মোদি সরকার। প্রয়োজনে সরকারি মালিকানার ভাগ ৫১ শতাংশের নিচেও নামিয়ে আনা হবে।
তা বলে, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের স্মৃতিবিজড়িত, বাংলার অন্যতম গৌরবের প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল কেমিক্যালসেরও বিলগ্নিকরণ হবে! মানতে পারছেন না অনেকেই। এত লাভের পরেও বিলগ্নিকরণ কেন? কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সংস্থার কর্মচারীরা।