উপনির্বাচনে নোট হয়রানি ইস্যু হবে

রাজ্যের শূন্য আসনগুলি সহ সারা দেশে চারটি লোকসভা আসন ও ৮টি বিধানসভা আসনে উপনির্বাচন

১৯ নভেম্বর রাজ্যে দুটি লোকসভা ও একটি বিধানসভা ভোটে উপনির্বাচন হতে চলেছে। কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূল সাংসদ রেনুকা সিংহের প্রয়াণে আসনটি খালি হয়। তিনি ১৭ আগস্ট ২০১৬ প্রয়াত হয়েছিলেন। অন্যদিকে তমলুক কেন্দ্রের তৃণমূল সাংসদ শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী হন। ২৮মে ২০১৬ তারিখে তিনি লোকসভার অধ্যক্ষ সুমিত্রা মহাজনের সঙ্গে দেখা করে সাংসদ পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের দুটি লোকসভা আসন শূন্য হয়। আবার বর্ধমানে মন্তেশ্বর বিধানসভা আসনটি খালি হয় এলাকার বিধায়ক সজল পাঁজার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে মৃত্যুতে। এ রাজ্যের শূন্য আসনগুলি সহ সারা দেশে চারটি লোকসভা আসন ও ৮টি বিধানসভা আসনে উপনির্বাচনের দিন-ক্ষণ ঘোষণা হয় ১৭ অক্টোরব ২০১৬। ভোটগ্রহণ হবে ১৯ নভেম্বর। ভোট গণনা হবে ২২ নভেম্বর।

উপরের সারণী থেকে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের ভোট বেড়েছে ৫.৪৮ শতাংশ, প্রাপ্ত ভোট বেড়েছে ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ১১৫টি। বামফ্রন্টের সমর্থন কমেছে ১.১৮ শতাংশ, যদিও তাদের প্রাপ্ত ভোট বেড়েছে ২৯ হাজার ৫৫৯টি। বিজেপির ভোট হ্রাস ৪.০২ শতাংশ, তাদের প্রাপ্ত ভোট কমেছে ৩৫ হাজার ৯১৬টি। কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট যদিও বেড়েছে ৩ হাজার ৬১৯টি, কিন্তু তাদের ভোট-অনুপাত কমে গেছে ০.২৯ শতাংশ। একইভাবে নির্দল ও অন্যান্যদের প্রাপ্ত ভোট যদিও বেড়েছে ৩ হাজার ৫৯৭টি, কিন্তু তাদের ভোট-অনুপাত কমে গেছে ০.২১ শতাংশ। নোটা ভোট বেড়েছে ৪ হাজার ৪৮৩টি বা প্রদত্ত ভোটের ০.২২ শতাংশ। এই লোকসভা এলাকায় বৈধ ভোট বেড়েছে ১ লক্ষ ৪২ হাজার ৪৫৭টি।

এখানে উল্লেখ করা ভালো, কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে কোচবিহার জেলার ৯টি বিধানসভা কেন্দ্রের ৭টি অন্তর্ভুক্ত। এই ৭ বিধানসভা ক্ষেত্র হল ২) মাথাভাঙ্গা(তপঃ), ৩) কোচবিহার উত্তর (তপঃ), ৪) কোচবিহার দক্ষিণ, ৫) শীতলকুচি(তপঃ), ৬)সিতাই(তপঃ), ৭) দিনহাটা ও ৮) নাটাবাড়ি। এবারের ভোটে রাজনৈতিক শক্তিবিন্যাস অনেকটা ২০১৪ সালের মতোই, অর্থাৎ প্রধান চারপক্ষই রণভূমিতে যুযুধান। ২০১৪ সালে সাতটি বিধানসভা ক্ষেত্রেই এগিয়েছিল তৃণমূল, ২০১৬ সালে বাম-কংগ্রেস জোট হওয়ার কারণে কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে জিতেছে বামফ্রন্ট। ২০১৪ সালে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের ভোট যোগ করলে কোচবিহার উত্তর ছাড়াও সিতাই ও দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্রে বাম-কংগ্রেস এগিয়ে ছিল। ২০১৬ সালে সেই ছবিটা বদলে গিয়েছিল।

এবারে কী হবে? প্রথমত, মনে রাখা দরকার, কোচবিহারে বাম শক্তি মূলত দুটি দলের, ফরওয়ার্ড ব্লক ও সিপিএম। ফরওয়ার্ড ব্লকের হেভিওয়েট নেতা উদয়ন গুহ সমেত বহু বাম নেতা কর্মী এই সময়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। এমনকী সব বুথে পোলিং এজেন্ট দেওয়াও বামফ্রন্টের পক্ষে সম্ভব নয়। ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলকাণ্ডে ও অন্যান্য কারণে বিজেপির ভোট কি আরও কমে ১০ শতাংশের নীচে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা? উড়িয়ে দেওয়া যায় না।। কমবে বাম ভোটও। সেক্ষেত্রে তৃণমূল একাই ৫০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে এই লোকসভা আসন জিতবে বলেই মনে হয়।

উপরের সারণী থেকে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের ভোট ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে কমে গেছে। তাদের ভোট কমেছে ৪.৮০ শতাংশ, প্রাপ্ত ভোট কমেছে ৩২ হাজার ৬৩৩টি। তৃণমূলের ভোট কমাটা বেশ ব্যতিক্রমী ব্যাপার। সমগ্র পূর্ব মেদিনীপুরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ২০১৪ সালে তৃণমূলের ভোট ছিল ৫১.৯৮ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা হয়েছে ৫০.২৮ শতাংশ। অর্থাৎ তমলুক লোকসভা এলাকায় ভোট কমার কারণেই জেলায় ভোট একটু কমেছে, জেলার অন্য অংশে তৃণমূলের ভোট বেড়েছে। কেন এটা হল? একটা উত্তর হল, লোকসভা ভোটে শুভেন্দু অধিকারী প্রার্থী ছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার কারণে ২০১৪ সালে ভোট বেশি পেয়েছিল তৃণমূল। আরেকটা ব্যাখ্যা হল, নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর ইত্যাদি আন্দোলনের কারণে যে বিপুল সমর্থন তৃনমূল পেয়েছিল, সেটা যতই অতীতে চলে যাচ্ছে, কিছু ভোট হারাচ্ছে তারা। বামফ্রন্টের সমর্থন বেড়েছে ০.৫৭ শতাংশ, তাদের প্রাপ্ত ভোট বেড়েছে ৩০ হাজার ৮৪৩টি। বিজেপির ভোট হ্রাস ০.৭৭ শতাংশ, তাদের প্রাপ্ত ভোট কমেছে ৬ হাজার ৫৭২টি। কংগ্রেসের ভোট কিন্তু অনেকটাই বেড়েছে, প্রাপ্ত ভোট বৃদ্ধি ৫৯ হাজার ২১১টি, তাদের ভোট-অনুপাত বেড়েছে ৪.১২ শতাংশ। একইভাবে নির্দল ও অন্যান্যদের প্রাপ্ত ভোট বেড়েছে ১২ হাজার ৩৪৪টি, তাদের ভোট-অনুপাত বেড়েছে ০.৮০ শতাংশ। নোটা ভোট বেড়েছে ১ হাজার ৫৮২টি বা প্রদত্ত ভোটের ০.০৭ শতাংশ। এই লোকসভা এলাকায় বৈধ ভোট বেড়েছে ৬৪ হাজার ৭৭৫টি।

তমলুক লোকসভা কেন্দ্রে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ১৬টি বিধানসভা কেন্দ্রের ৭টি অন্তর্ভুক্ত। এই ৭ বিধানসভা ক্ষেত্র হল ২০৩)তমলুক, ২০৪)পাঁশকুড়া পূর্ব, ২০৬)ময়না, ২০৭)নন্দকুমার, ২০৮) মহিষাদল, ২০৯) হলদিয়া(তপঃ) ও ২১০) নন্দীগ্রাম। প্রধান চারপক্ষই লড়াইতে আছে। ২০১৪ সালে সাতটি বিধানসভা ক্ষেত্রেই এগিয়েছিল তৃনমূল, ২০১৬ সালে বাম-কংগ্রেস জোটের বাম প্রার্থীরা তমলুক, পাঁশকুড়া পূর্ব ও হলদিয়া বিধানসভা কেন্দ্র তিনটিতে জিতেছে। ২০১৪ সালে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের ভোট যোগ করলেও সব বিধানসভাতেই তৃনমূল এগিয়ে ছিল। ২০১৬ সালে সেই ছবিটা বদলেছে।

এবারে কী হবে? এই জেলাতে কংগ্রেসের শক্তি খুবই নগন্য। তাই বাম-কংগ্রেস জোট হল কী হল না, তাতে খুব একটা যায় আসে না। তবে বামেদের প্রধান দল সিপিএমের সাংগঠনিক শক্তি আরও হ্রাস পেয়েছে। এই এলাকায় বিজেপির ভোট আর বেশি কমবে বলে মনে হয় না। তবে ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের তুলনায় কংগ্রেসের ভোট কমবে। সেক্ষেত্রে তৃণমূল একাই ৫০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে এই লোকসভা আসনও জিতবে বলেই মনে হয়।

দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের ভোট কিছুটা কমেছে। বাম ভোটের খানিকটা বৃদ্ধিও চোখে পড়ার মতো। বিজেপির ভোট সামান্য কমেছে। এবার কংগ্রেস আলাদা প্রার্থী দেওয়ায় ওই দল হাজার পাঁচেক ভোট পাবে বলে মনে হয়। তাই এই উপনির্বাচনে তৃণমূলের হাজার দশেক ভোটের ব্যবধানে জয় আশা করা যেতে পারে।

তবে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলে সাধারণ মানুষের হয়রানির কিছু বাড়তি সুফল তৃণমূলের ঝোলার যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

Developed by DXDasia