প্রকৃতিতে প্রজাপতির গুরুত্ব বোঝাতে শুরু হলো ‘বাটারফ্লাই ফটোওয়াক’

উইকি লাভস বাটারফ্লাই প্রজেক্টের অন্তর্গত এই ফটোওয়াক

“And when all the wars are over, a butterfly will still be beautiful.”
 —রাস্কিন বন্ড

সত্যিই যুদ্ধক্লান্ত শহরে বেঁচে থাকে প্রজাপতি? বোমার ধোঁয়া আর বুলেট, সাইরেনের শব্দ ছাপিয়ে তার ডানার আলো দেখতে পায় সব হারানো শিশু? জানা কঠিন। শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত নয়, দৈনন্দিন হা-ক্লান্ত শহরেও এখন তার দেখা মেলা ভার। পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, বৃক্ষনিধন অন্যান্য প্রাণীর মতো আঘাত করেছে প্রজাপতিকেও। জরুরি হয়ে উঠেছে প্রজাপতি নিয়ে সচেতনতা, প্রজাপতি সংরক্ষণ, সেই সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ। তেমনই একটি উদ্যোগ হলো উইকি লাভস বাটারফ্লাই (Wiki Loves Butterfly) প্রজেক্টের অন্তর্গত বাটারফ্লাই ফটোওয়াক (Butterfly Photowalk)। এই প্রজেক্টটির উদ্যোক্তা ওয়েস্টবেঙ্গল উইকিমিডিয়ান ইউজার গ্রুপ (West Bengal Wikimidean User Group), যা উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের (Wikimedia Foundation) অধিভুক্ত।

উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের অন্তর্গত একটি প্রজেক্ট হলো উইকিপিডিয়া। এছাড়াও অনেক অধিভুক্ত গ্রুপ রয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো পশ্চিমবঙ্গের এই গ্রুপটি। তাদের পক্ষ থেকে উইকি লাভস বাটারফ্লাই প্রজেক্টটি শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। “গত সাত বছর ধরে আমরা পশ্চিমবঙ্গের প্রজাতির ও উপপ্রজাতির প্রজাপতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করি এবং তাদের ছবিও তুলি। সেইসব তথ্য এবং ছবি উইকিপিডিয়াতে আপলোড করা হয়”, বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন এই গ্রুপের প্রতিনিধি সদস্য এবং বাটারফ্লাই ফটোওয়াক প্রজেক্টের মূল উদ্যোক্তা অনন্যা মণ্ডল। শুধু পশ্চিমবঙ্গই নয়, গত ৩-৪ বছর ধরে তাঁরা উত্তর-পূর্ব ভারতের অসম, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ডেও এই কাজ করছেন। এই বছর থেকে তাঁদের তালিকায় যুক্ত হয়েছে ওড়িশাও। 

এই প্রজেক্ট শুরু করা এবং প্রাণী হিসাবে প্রজাপতি বেছে নেওয়ার কারণ? অনন্যা জানালেন, “ছোটোবেলা থেকেই আমি প্রজাপতি নিয়ে আগ্রহী ছিলাম। তারপর যখন উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের হয়ে কাজ করতে শুরু করি, তখন দেখি যে, প্রজাপতির ছবি ও তথ্য সম্বলিত বাংলা ভাষায় কোনও আর্টিকেল উইকিপিডিয়াতে নেই। বিশদ তথ্য সম্বলিত ছবিও নেই। তখন থেকেই এই প্রজেক্টের কথা মাথায় আসে।” ধীরে ধীরে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন তমোঘ্ন সেনগুপ্ত, সন্দীপ দাস, আরও অনেকে। এখন তাঁদের দলের ফিল্ড ওয়ার্কার ২৫ জন। 

কালার সার্জেন্ট প্রজাপতি, চিত্রগ্রাহক : অতনু বোস

এই প্রজেক্টটির উদ্দেশ্য, প্রজাপতি, তাদের বিভিন্ন উপপ্রজাতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সেইসব তথ্য সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা। প্রজাপতির বিভিন্ন উপপ্রজাতির জীবনচক্রের ছবি তোলার কাজও শুরু করেছেন তাঁরা। ইদানীংকালে তাঁরা শুরু করেছেন স্কুল আউটরিচ প্রোগ্রাম (School Outreach Program)। গত বছর সিকিমের একটি স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে এই প্রোগ্রামটি সংগঠিত করা হয়েছিল। ঐ এলাকায় কী ধরনের প্রজাপতি পাওয়া যায়, তাদের কীভাবে চেনা যায়, পরিবেশে তাদের গুরুত্ব- এইসব সম্পর্কে স্কুলপড়ুয়াদের হাতেকলমে পাঠদান করা হয়েছিল। সামনের বছর আরেকটি স্কুলে এই প্রোগ্রামটি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁরা যখন যেখানে প্রজাপতি সংক্রান্ত কোনও প্রজেক্ট করেন, তাতে জুড়ে নেন স্থানীয় মানুষকে, এলাকার প্রজাপতি বা পতঙ্গ নিয়ে চর্চাকারী মানুষকে। এই বছর সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে তাঁরা সংগঠিত করছেন বাটারফ্লাই ফটোওয়াক। সেখানে যুক্ত হতে পারেন সাধারণ মানুষও। “সেপ্টেম্বর মাসকে বিগ বাটারফ্লাই মান্থ হিসাবে উদযাপন করা হয়। সেই কারণেই এই মাসকে বেছে নেওয়া”, বলেন অনন্যা। 

কমান্ডার প্রজাপতি, চিত্রগ্রাহক : অনিতাভ রায়

গোটা সেপ্টেম্বর মাস জুড়েই চলবে তাঁদের এই ফটোওয়াক। ৩ তারিখে দুটি জায়গায় হয়েছে এই ফটোওয়াক- হাওড়ার শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে এবং বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড়ে। ২৪ তারিখ তাঁরা ফটোওয়াক করবেন অসমের বঙ্গাইগাঁওতে আর অরুণাচল প্রদেশের কামলাং টাইগার রিজার্ভে। ২৯ আর ৩০ তারিখ ফটোওয়াক হবে সিকিমে। কামলাঙে যে ফটোওয়াক হবে, সেখানে অংশ নেবে স্থানীয় তিনটি স্কুলের পড়ুয়ারাও। কোভিডের সময় যখন সবকিছু বন্ধ ছিল, তখনও তাঁদের কাজ থেমে থাকেনি। নিজেদের বাড়ির আশেপাশে কোন ধরনের প্রজাপতি পাওয়া যায়, সেই খোঁজ চালিয়ে গেছেন। এই ধরনের কাজে তাঁদের যেসব বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়, তার একটি উল্লেখ করলেন অনন্যা মণ্ডল- “মানুষের মতন প্রজাপতিও উভলিঙ্গ হতে পারে। তাদের বলা হয় গাইন্যান্ড্রোমর্ফ (Gynandromorph)। সেরকম প্রজাপতির লাইভ ডকুমেন্টেশনের কাজ ভারতবর্ষে প্রথমবার করা সম্ভব হয়েছে। প্রজাপতিটির দুটি ডানার রং ছিল দু’রকম। তা থেকেই আমরা প্রজাপতিটির বিশেষত্ব বুঝতে পেরেছিলাম। প্রজাপতিটি ছিল কালার সার্জেন্ট (Colour Sergeant) প্রজাতির। আমরা এটিকে খুঁজে পেয়েছিলাম বক্সার জঙ্গলে।” তাঁদের গ্রুপের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হওয়া যায়? অনন্যা জানালেন, “প্রতিটি প্রজেক্টের আগে আমরা ফেসবুকে সেই সংক্রান্ত তথ্য দিই। সেখান থেকেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন অনেকে।”

তিনি আরও জানান যে, তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও সংস্থার সঙ্গে কাজ করেন না, তবে ব্যক্তিগত স্তরে অনেক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কাজের সূত্রে যোগাযোগ রাখেন। যেমন- তরুণ কর্মকার, আইজ্যাক কেম্পকার প্রমুখ। বোটানিক্যাল গার্ডেনের ফটোওয়াকে এসেছিলেন প্রখ্যাত প্রজাপতি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলা ভাষায় প্রজাপতি নিয়ে প্রথম বইটির রচয়িতা যুধাজিৎ দাশগুপ্ত। তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “এটা একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা। অনেকের সঙ্গে দেখা হলো, আলাপ হলো। নতুন প্রজন্মের অনেকে খুব ভালো কাজ করছে এই বিষয়ে। বলতে পারেন, আমিও তাঁদের কাছ থেকে শিখেছি। প্রজাপতি দেখার পাশাপাশি এই অভিজ্ঞতাও কম আনন্দের নয়।” তিনি বোঝালেন পরিবেশে প্রজাপতির গুরুত্ব। তাঁর কথায়, “প্রজাপতি শুধু অসাধারণ সুন্দর একটি প্রাণী তা-ই নয়, খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিভিন্ন পাখি ও সরীসৃপের খাদ্য হলো প্রজাপতি। তারা ফুলের পরাগমিলনেও সাহায্য করে। এছাড়া তাদের ব্যবহার দেখে আন্দাজ করা যায় আবহাওয়ার পরিবর্তনও। তাই আমি এই উদ্যোগকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। এমন উদ্যোগ যেন বহরে আরও বাড়ে, সেই কামনা করছি।”

ইয়েলো প্যান্সি প্রজাপতি, চিত্রগ্রাহক : অনিতাভ রায়

মনে পড়ে যায় ‘দোস্তজী’ ছবিটির কথা। একটি শুঁয়োপোকার প্রজাপতি হয়ে ওঠা, আর তার বাড়তে থাকার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া দুই বন্ধু। একজন মহাকালে হারিয়ে যাওয়ার পর, অপর বন্ধু তাকে খুঁজে ফেরে শুঁয়োপোকাটিকে প্রজাপতি করে তুলতে সাহায্য করার মধ্যেই। শুঁয়োপোকাটিকে রোজ খাবার জোগাড় করে দেওয়া, সে কেমনভাবে বাড়ছে চাপা দেওয়া ঝুড়ির আড়ালে, তা লক্ষ্য করা- আসলে সে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে চোখাচোখি করে নেয় তার দোস্তজীর সঙ্গে। শেষে বড়ো হয়ে উড়ে যায় প্রজাপতিটি, কান্নায় ভেঙে পড়েন পুত্রহারা মা, আর জঙ্গলের গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে এক সরল গ্রাম্য শিশু খুঁজে ফেরে তার দোস্তজীকে, যার শেষ স্মৃতিটুকু ডানায় মেখে উড়ে গেছে রঙিন প্রজাপতি।

 ছবিঋণ : অনন্যা মণ্ডল ও উইকি লাভস বাটারফ্লাই ফেসবুক পেজ 

Developed by DXDasia