একটি ‘তিন’নম্বরি ব্যবসা ও তার লোকসান

শ্রীরামপুর থেকে এই বাসরুট বিস্তৃত ছিল কলকাতার প্রাণকেন্দ্র বাগবাজার পর্যন্ত

“জি.টি রোডে গঙ্গার হাওয়া ফুরফুর
তিন নং বাস চলে খুশি যতদূর”

শেষপর্যন্ত হয়তো মৃদুল দাশগুপ্ত-র এই বিখ্যাত লেখাটিতেই এসে ঠেকবে আমাদের ৯১ বছরের ঐতিহ্য। ৩ নং বাসরুট। কলকাতা মফস্সল জুড়ে রাখার এক অবিচ্ছেদ্য ধমনী। শ্রীরামপুর স্টেশনের গা থেকে শুরু হওয়া এই বাসরুট বিস্তৃত ছিল কলকাতার প্রাণকেন্দ্র বাগবাজার পর্যন্ত। একসময়ের অন্যতম মনোপলি ৩ নং রুট, ওই পথে আর টিকতে দেয়নি অন্য কোনও বাসকে। দিনে ৬৯টি বাস চলাফেরা করত বিটি ও জিটি রোড ধরে। একটি বাস ভিড় এলে নিশ্চিন্তে ছেড়ে দিয়ে পরের বাসের জন্য অপেক্ষা করা যেত। ৫ মিনিট অন্তর রাস্তার বাঁকে ফুটে উঠত তার প্রতিচ্ছবি। এসব অতীত হয়েছে বেশ কিছুদিন হল। প্রাচীন এই বাসরুট নিভে না গেলেও ভীষণভাবে কমে এসেছে বাস। সারাদিনে মাত্র তিনটি বাস চলছে রুটে। তাতেও ভিড় নেই আগের মতন। অথচ পাঁচ মিনিট অন্তর বাস চলাকালীনও সিট ফাঁকা পাওয়া যেত না এই বাসে। কর্তৃপক্ষের দাবি সময় মতো ভাড়া না বাড়াতে পারায় ঘটেছে বিপত্তি। এক-একটি বাস চালিয়ে, তার খরচা, ও কর্মচারীদের বকেয়া টাকা মিটিয়ে মাসে বিশ হাজার টাকা মতো লাভ থাকত মালিকদের। এই লাভ এখন এসে ঠেকেছে তিন হাজারে। কেউ কেউ পকেট থেকে টাকা দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর বাস। যদিও এভাবে কোনও ভবিষ্যৎ নেই রুট চালিয়ে যাওয়ার। কয়েকবছর আগে একটি নতুন রুট সংযোজন হয় ৩ নম্বরে। শ্রীরামপুর থেকে সল্টলেক পর্যন্ত এই নতুন রুট ছিল সুবিধাজনক এবং কম খরচার। অসংখ্যা স্কুলপড়ুয়া এবং বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের একমাত্র ভরসা ছিল এই রুট। তার অন্যতম কারণ বহুদূরের রাস্তা যাওয়া যেত ৬ টাকা – ৮ টাকায়।

জানা যায়, ১৯২৮ সালে রেল কর্তৃপক্ষ শ্রীরামপুরের বিশিষ্ট কিছু মানুষকে ডেকে বলেন মফস্সল থেকে কলকাতা যাওয়ার কোনও সুব্যবস্থা করতে। এতে তাঁরা রেলের সাহায্যও পাবেন। এই প্রস্তাবের পর দীনবন্ধু ধর, ননীভূষণ সেনগুপ্ত, মিহিরকিরণ ভট্টাচার্যরা কলকাতা পৌঁছানো সহজ করতে ৩ নং বাস চালু করেন।

এরপর এই রাস্তায় রাজত্ব করে ৩ নং। নাম কুড়ায়, আশীর্বাদ কুড়ায় এবং কুড়ায় বহু বদনামও। খারাপ দিকগুলির মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় এই বাসের দুর্ঘটনাপ্রবণতা। সমস্ত বাসের এক মালিকানা না হওয়ার দরুণ পরপর দুটি বাসের মধ্যে চলত ভীষণ রেষারেষি। শ্রীরামপুর থেকে উত্তরপাড়া পর্যন্ত রাস্তা যথেষ্ট ঘিঞ্জি। সেখানে দুটি বাসের রেষারেষিতে বহু মানুষ হারিয়েছেন তাঁদের আত্মীয় স্বজন। আট থেকে আশি পর্যন্ত বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এই বাসের দাপটে। তবু অনন্ত জাগে… এখনও সেই অদ্ভুত বসার ব্যবস্থার বাসগুলি দেখলে মনে পড়ে হারানো বন্ধুবান্ধবদের কথা। মনে পড়ে মফস্সল থেকে শহরে প্র্যাক্টিস করতে যাওয়া ছাত্রছাত্রী খেলোয়াড়দের কথা। কিংবা যে বৃদ্ধ মা তার ‘স্পেশাল চাইল্ডকে’ নিয়ে শ্রীরামপুর থেকে বনহুগলি ছুটে যেতেন রোজ। তাঁদের সবারই জীবন অব্যাহত আছে নিশ্চয়। যে যার যাতায়াত জারি রেখেছেন অন্যপথে। তবে তা অনেক খরচাসাপেক্ষ। সময়ও লাগে অনেক বেশি। গঙ্গার এই পার ধরে জনবসতি বেড়েই চলেছে দিনকে দিন। অথচ তৈরি হচ্ছে না বিকল্প বাসরুট। ৩ নম্বরের দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে না। বাসটি বাড়িয়ে ধর্মতলা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার আবেদন জানানো হচ্ছে ২০১৪ সাল থেকে। ওপারে ব্যারাকপুর থেকে কলকাতা পর্যন্ত প্রচুর বাস চালু হলেও হুগলির একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা তিন নম্বর প্রায় উঠে যাওয়ার পথে।

হয়তো বন্ধই হয়ে যাবে ৩ নম্বর। হয়তো ৯১ বছরের স্মৃতি বুকে নিয়ে রাজত্ব ছেড়ে চলে যাবে সে। তারপর জমিদারি প্রথা ভেঙে ছোটো ছোটো টুকরোয় ভাগ হয়ে যাবে যাতায়াত। টোটো আর অটোর দৌরাত্ম বাড়বে দিনকে দিন।

Developed by DXDasia