বাঙালির মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার

জাতিভেদ আর বৈষম্য একটা জাতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে হাজার বছর। ১০১০-এ লিখছেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়

বস্তুত ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য কুসংস্কারের এক অতি বৃহৎ অধ্যায়। অনুসন্ধান প্রবৃত্তি একপ্রকার লুপ্তপ্রায় হইল। যাহা কিছু বৈজ্ঞানিক আভাস জাতীয় শিক্ষা ও জ্ঞানের সহিত ধীরে ধীরে ফুটিয়ে উঠিতেছিল, যে কিছু প্রাকৃতিক দর্শন ইত্যাদির আলোচনার আভাস সূচিত হইতেছিল, তাহা অত্যল্পকালেই বিনষ্ট হইবার পথে আসিল। এই বিলোপের কারণ শাস্ত্রকারগণের কঠোর আদেশ। মৃতদেহ স্পর্শ করিলে অশৌচ হয়, মনু এই ব্যবস্থা করিয়া বসিলেন, সুতরাং শবব্যবচ্ছেদ বিজ্ঞান হইতে তিরোহিত হইল। কেবল যদি শরীর ব্যবচ্ছেদ নিষেধ করিয়া ক্ষান্ত হইতেন, তাহা হইলেও আমরা আজ তাঁহাদের নিকট কৃতজ্ঞ হইতাম। সমুদ্রযাত্রা পর্যন্ত ধর্ম-বিগর্হিত কার্য বলিয়া নির্দিষ্ট হইল। হিয়ানসেং-এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত জানা যায়, তিনি যখন তাম্রলিপ্ত (তমলুক) হইতে সিংহল যাত্রা করেন এবং সিংহল হইতে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন, তখন অনেক ব্রাহ্মণ বণিক   তাঁহার সহযাত্রী ছিলেন। শুধু ইহাই নহে, এক সময় হিন্দুদের অর্ণবপোত অগাধ বারিধি অতিক্রম করিয়া বলি ও যাবাদ্বীপে উপনিবেশ স্থাপন করে। এই সকল স্থানে ভগ্নাবশেষ দেবদেবীর প্রতিমূর্তি অদ্যাপিও ঐতিহাসিক অতীতের সাক্ষ্য প্রদান করিয়া হিন্দুর পুরাতন কীর্তিকলাপের গাথা যেন নীরব সংগীতে গাহিতেছে। আজ যে ভারতের শিল্প পণ্য বিলোপ প্রাপ্ত হইয়াছে, আজ বিংশ শতাব্দীর স্তরে দাঁড়াইয়াও যে ভারত প্রতীচ্য শিল্প বাণিজ্যের নিকট অবনতমস্তক, অথবা যে ভারতে বাণিজ্য কখনও সূচিত হইয়াছিল কি না তৎসম্বন্ধে সন্দেহ হয়, সেই ভারতই (বৌদ্ধ সাহিত্যপাঠে জানা যায়) Broach (বরোচ) হইতে Alexandra  (আলেকসন্দ্রা) পর্যন্ত পণ্যাদি লইয়া যাইতেন। এই বাণিজ্য সংক্রান্ত আদান-প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে উপনিষদের বিবৃত মতসকল Neo-Platonist দের নিকট পৌঁছে। বস্তুত বাণিজ্য দ্বারা সূচিত সম্বন্ধ ক্রমেই জ্ঞান শিক্ষা বিস্তারের হেতু হইয়া থাকে; পরস্পর সংযোগ হওয়াতে কেমন অজ্ঞাতভাবে জাতিগত বৈষম্য ইত্যাদি ক্ষুদ্র প্রবৃত্তি শারদীয় আকাশে মেঘমালার ন্যায় অপসারিত হয়।

হিন্দু রক্ষণশীলতার অভ্যন্তরে একটি অহিতকর প্রবৃত্তি নিহিত আছে। ললিত কলাদিব রাস্কিনের একটা কথা এস্থলে বড়ই প্রযোজ্য। তিনি এক সারগর্ভ বক্তৃতায় বলিয়াছেন যে, মানুষের চরম অবনতি তখনই সূচিত হয় যখন তাহার চরিত্র হইতে সম্ভ্রমের ও গুণগ্রাহিতার প্রবৃত্তি তিরোহিত হয়। হিন্দুর যাহা কিছু তাহাই শ্রেষ্ঠ, হিন্দু ভিন্ন সকল জাতি ম্লেচ্ছ ও বর্বর তাহাদের নিকট আমাদের কিছুই শিখিবার নাই, এই প্রকার সংস্কারসকল যে দিন আমাদের উন্নতির মার্গ কণ্টকিত হইল। সেই দিন হইতে হিন্দু জাতি কূপমণ্ডুক হইল। অহংকার ও আত্মাদরে স্ফীত হইয়া জগতের শিক্ষা ও জগতের দীক্ষা তৃণজ্ঞান করিয়া অলক্ষিতভাবে অবনতির গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত হইল। আজ আমরা ‘হিন্দু’ বলিল কেবল মুষ্টিমেয় কতকগুলু লোকের প্রাধান্য বুঝি মাত্র। এই গণ্ডির ভিতর ফোঁটা-তিলক কাটিয়া শাস্ত্রের ভেল্কী যিনি যত খাটাইবেন, তিনিই তত হিন্দু। সাধারণের নিকট জ্ঞানদ্বার রুদ্ধ। সে চাবি সেই গণ্ডীস্থিত গুটিকতক হিন্দুর হাতে। স্বামী বিবেকানন্দ যথার্থই বলিয়াছেনঃ

“যে ধর্ম গরীবের দুঃখ দেখে না, মানুষকে দেবতা করে না, তা কি আবার ধর্ম? আমাদের কি আর ধর্ম? আমাদের ‘ছুৎমার্গ’ খালি ‘আমায় ছুঁয়ো না, আমায় ছুঁয়ো না।’ হে হরি! যে দেশের বড় বড় মাথাগুলো আজ দুহাজার বৎসর খালি বিচার কচ্ছে, ডান হাতে খাব কি বাম হাতে খাব, ডান থেকে জল নেব, কি বাম দিক থেকে, কট এট ক্রাং ক্রুং বিহি ইত্যাদি যে দেশের মূলমন্ত্র, তাহাদের অধোগতি হবে না তো আর কাদের হবে!’

সমাজ যখন এইপ্রকার হীনাবস্থায় পতিত হয়, তখন পিপীলিকা-শ্রেণীর ন্যায় অনন্ত অকল্যাণকর রীতিনীতি আসিয়া সমাজের হৃদয় ক্ষতিবিক্ষত করিতে থাকে। ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য জর্জরিত বাংলায় শীঘ্রই তাহার উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষক ‘বল্লালী কৌলীন্য’ আসিয়া জুটিল। শাস্ত্রের কঠোর তাড়নায় জাত্যাভিমান, কুলমর্যাদা ইত্যাদির অসহনীয় কশাঘাতে উন্মত্ত হইয়া বাংলার বহুসংখ্যক লোক ইসলামধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হইল। অবশ্য কৌলীন্যের প্রতিষ্ঠাতাগণের সংকল্প ভাল হইতে পারে, কিন্তু যে দিন হিতে কুলব্যক্তিগণ গুণগ্রামের পুরস্কার স্বরূপ না হইয়া বংশানুগত হইল সেই দিন বাঙালির অধঃপতনের চূড়ান্ত হইল। দেবীবর ঘটক আসরে অবতীর্ণ হইলেন। বংশমর্যাদা রক্ষার জন্য ‘কুলজী’ প্রভৃতি গভীর গবেষণাপূর্ণ শাস্ত্রের সৃষ্টি হইল। এই প্রকার শৃঙ্খল পরিয়া বাঙালি নবদ্বীপের ব্যবস্থাশাসন দ্বারা নিজের আটঘাট বাঁধিয়া এমন করিয়া বসিলেন যে, ভাবী উন্নতির আর কোনো পন্থা হইল, প্রকৃতি দেবী তাঁহার নিয়ম লঙ্ঘন হেতু ভীষণ প্রতিশোধ লইলেন। কুলমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখিবার জন্য বহুবিবাহরূপ কীট সমাজহৃদয়ে প্রবিষ্ট হইয়া তিল তিল করিয়া কাটিতে লাগিয়ে। আজ বর্তমান বাংলা সেই পরিণাম ভোগ করিয়া হীনবীর্য হইয়া পড়িয়াছে। কৌলিন্যের সেই বিষময় ফল আজ বাংলার প্রতি গৃহে প্রবিষ্ট হইয়া যে সুবৃহৎ বিষতরু সংবর্ধন করিয়াছে, হায়, পরিশ্রান্ত ভারাক্রান্ত গৃহস্থ সেই বিষতরুর উৎকট জ্বালাময়ী ছায়ায় দাঁড়াইয়া আজ ত্রাহি ত্রাহি ডাকিতেছে।

‘চণ্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠঃ হরিভক্তিপরায়ণঃ- এই মহাবাক্য যদি যথাসময় বিঘোষিত না হইত নিন্মশ্রেণীস্থ হিন্দুসমাজে কয়জন লোক বিদ্যমান থাকিত বলিতে পারি না। কিন্তু স্বার্থান্ধ ব্রাহ্মণাদি উচ্চজাতি এই মহান সাম্যভাব উপলব্ধি করিতে পারিল না, জাতিভেদের কঠিন শৃঙ্খল পূর্বের মতোই সমাজকে ব্যথিত করিতে লাগিল। পক্ষান্তরে যাঁহারা সমাজের নেতা বলিয়া অহংকার করিয়া প্রয়াস পাইতে লাগিলেন। ইহার অবশ্যম্ভাবী ফল ফলিয়াছে। স্বদেশপ্রেম ও স্বজাতিপ্রেম নামক স্বর্গীয় ভাব দুইটি ভারতবর্ষ হইতে চলিয়া গিয়াছে। বস্তুত স্বদেশপ্রেম বলিয়া যে কিছু ভারতবর্ষে কখনও ছিল এমন মনে হয় না, কেননা এই বৈষম্য আজ বহুশত বর্ষ হইতে সমাজ হৃদয়ের উষ্ণ শোণিত চুষিয়া নিঃশেষ করিতেছে।আপনার ও স্ত্রীপুত্রের জীবিকা সংস্থানই যে জাতির মুখ্য উদ্দেশ্য, যে জাতি প্রতিবেশীর দুঃখ বোঝে না, যে জাতি আপনার গণ্ডির বহির্ভাগে স্বীয় ভালবাসার আনন্দময় প্রভাব বিস্তার করিতে পারে না, যে জাতির সম্মুখে সর্বাপেক্ষা উচ্চ আদর্শ- জিজ্ঞাসু না হইয়া শাস্ত্রোক্ত বচনে আত্মসমর্পণ, সে জাতির হৃদয়ে স্বদেশপ্রেম আসিবে কী প্রকারে? যে দেশের সমাজ হাতে ধারিয়া আশৈশব ‘তুমি বড়, এ নিকৃষ্ট’ ইহাই সযত্নে শেখায়, সে দেশে জাতীয়তার ভাব আসিবে কী প্রকারে? সে দেশ ক্ষুদ্রের প্রাণের আবেগের সহিত আপনার মহৎ প্রাণের উচ্ছ্বাস মিশাইবে কেমন করিয়া?

(আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের 'বাঙালির মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহার' গ্রন্থ থেকে নির্বাচিত অংশ) 

Developed by DXDasia