নামীদামী স্কুলের আড়ালে মানুষ গড়ার কাজ করে চলেছে বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুল

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ২৯

ক্ষিণ কলকাতার প্রাচীন জনপদ বোড়াল ছুঁয়ে যে রাস্তা গড়িয়া হয়ে, ত্রিপুর সুন্দরী মন্দিরকে ডান হাতে রেখে রক্ষিতের মোড় পৌঁছেছে, সেই রক্ষিতের মোড়েই রয়েছে বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুল (Boral Swamiji Vidyapith High School)। বর্তমানে স্কুলের ১১৯২ জন ছাত্রছাত্রী। তবে সেই অনুপাতে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা পর্যাপ্ত নয়, মাত্র ২৩ জন, এর মধ্যে একজন প্যারা টিচার আছেন। ২৩ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার পক্ষে ১১৯২ জন ছাত্র-ছাত্রীর নিয়মিত ক্লাস নেওয়া যথেষ্ট সমস্যার বিষয় সেটা সহজেই অনুমেয়। তবে কলকাতা ও রাজ্যের বিভিন্ন জেলার বহু বাংলা মাধ্যম স্কুলেরই এখন এই অবস্থা। স্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত ছাত্র-ছাত্রী থাকলেও শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব রয়েছে। শিক্ষক সংগঠনগুলির তরফে শিক্ষক-শিক্ষিকার ঘাটতি মেটানোর কথা বলে সবসময় যে সঠিক সহায়তা পাওয়া যায়, তা নয়।

১৯৬৫ সালে বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ননী গোপাল সিংহ রায় নামে এক ব্যক্তি। তিনি নিজের উদ্যোগেই স্কুলটি গড়ে তুলেছিলেন। শুরু থেকেই উচ্চমাধ্যমিকের অনুমোদন ছিল না। তবে শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই স্কুলে উচ্চমাধ্যমিক পঠনপাঠন শুরু হয়।

শহরতলীর এই ধরনের স্কুলগুলোর খুব একটা নাম-ডাক না থাকলেও স্থানীয়, প্রান্তিক শ্রেণির পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার আসল কারিগর কিন্তু এই স্কুলগুলিই। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুল এমন একটি স্কুল।

বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলে শুরু থেকেই ছেলে-মেয়ে একত্রেই পড়ছে। তবে এই স্কুলে ৮০ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা পড়ে। ২০ শতাংশ সংখ্যাগুরু ছাত্র-ছাত্রী। তাই বলা যায় পিছিয়ে পড়া, সমাজের প্রান্তিক অংশের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অনামী স্কুলটি শুরু থেকেই একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

কোভিড অতিমারি আমাদের সমাজকে অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে দিয়েছে। কোভিডের সময় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসারে “শারীরিক দূরত্ব” বজায় রেখে চলার নামে “সামাজিক দূরত্ব”, চালু করেছিল আমদের দেশের সরকার। বুঝেই হোক কিংবা না বুঝে, এতে মহামারির ভয়াবহতা আমাদের এখনও মুক্তি দেয়নি। এর প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে পড়েছে, পড়তে বাধ্য, যার বাইরে যায়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানলোও। আর এর প্রভাব পড়েছে বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলের মতো বহু শহরতলীর স্কুলে।

প্রথমেই বলেছি বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলে বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী প্রন্তিক ও সংখ্যালঘু পরিবার থেকে পড়তে আসে। তাই কোভিডকালীন লকডাউনে এই পড়ুয়াদের অনলাইন মাধ্যমে শিক্ষা দিতে গিয়ে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের যথেষ্ট সমস্যায় পড়তে হয়েছে। স্কুলের শিক্ষিকা সোমা ঘোষ দাস বলছিলেন, “কোভিড আমাদের অনেক স্থায়ী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। স্কুলের ক্লাসগুলো একদিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের স্কুলে যে সমস্ত ছেলে-মেয়ে পড়ে, অনলাইন ক্লাসে তারা সবাই সঠিকভাবে মোবাইলে ক্লাস করতে পারেনি। কারণটা খুব সহজ, যাদের বাড়িতে ২ থেকে ৩ জন স্কুলে পড়ে তারা ওই একটা মোবাইলের ওপর নির্ভর করে নিজেরা সময় ভাগাভাগি করে ক্লাস করেছে। তাতে অনেকেই প্রতিদিন সবকটি ক্লাস করতে পারেনি। তার ওপর অবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট পরিষেবাও সবার উপলব্ধ ছিল না, সেটা তারা পারেনি আর্থিক কারণে, তাছাড়া ওই সময় অনেক মানুষের আয়ের রাস্তাটাও সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছিল। এর একটা বড়ো প্রভাব আমাদের ছাত্রছাত্রীদের ওপর পড়েছে। যার ফলে কোভিডের পর থেকে আমরা একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ বন্ধ করে রেখেছি। কোভিডের ঠিক আগে যারা একাদশে পড়ত, যারা কোভিডের সময় নবম শ্রেণিতে পড়ত, অনলাইন ক্লাস তাদের লেখাপড়ায় খুব খারাপ প্রভাব ফেলেছে।”

তবে এসবের মধ্যেই বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়ে চলেছেন। তবে, প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়াদের অনেকেই স্কুলের বাইরে, বিশেষ করে বাড়িতে লেখাপড়া করার ক্ষেত্রে ততটা সহযোগিতা পায় না। কারণ, তাদের অনেকের বাড়িতেই পড়াশোনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কেউ নেই। এই ঘাটতি শুধু এই স্কুলের নয়, রাজ্যের অগুনতি স্কুলই কোভিড পরবর্তী সময়ে এই সঙ্কটে পড়েছে। 

স্কুলে স্কুলে মিড ডে মিল, কন্যাশ্রী, যাতায়াতের সুবিধার জন্য সাইকেল, ছেলেদের লেখাপড়ায় সহায়তা দেওয়ার জন্য ট্যাব, সবই সরকার থেকে দেওয়া হচ্ছে। তবে, এতে যে স্কুলছুটের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে তা নয়। কোভিডের সময় এবং তার পর থেকেই স্কুলে উচমাধ্যমিকে সায়েন্স বিভাগ তেমন ভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। কোভিডের যে ব্যাচ ছিল তাদের উচ্চমাধ্যমিকের ফল আশানুরূপ হয়নি। তার পর ২০২০ -২০২১ সালে একাদশ শ্রেণির সায়েন্সে বিভাগে ৪/৫ জন করে ছাত্রছাত্রী আসছিল। তাই, আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে একাদশ-দ্বাদশে সায়েন্সে ভর্তি। এমনিতেই শিক্ষক-শিক্ষিকা সংখ্যায় কম, তার ওপর উচ্চমাধ্যমিকে হাতে গোনা ৭/১০ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা দিতে হলে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস চালান কঠিন হবে। যে ছাত্রছাত্রীরা কোভিডের আগে থেকে স্কুলে পড়ে এখন একাদশ-দ্বাদশে উঠেছে, সায়েন্সে শুধু তাদেরই এখন একাদশ-দ্বাদশে পড়ানো হচ্ছে। এছাড়া ২০২০-২০২১ থেকে শুধুমাত্র আর্টস-এর জন্য ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। সায়েন্সে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাড়লেই আবার একাদশ-দ্বাদশে সায়েন্সে ভর্তি শুরু হবে। এখন একাদশে ১৫৫ জন পড়ছে। দ্বাদশে পড়ছে ১৪০ জন। বললেন স্কুলের শিক্ষিকা সোমা ঘোষ দাস। 

এই সমস্যাগুলো ছাড়া উচ্চমাধ্যমিক, মাধ্যমিকে পরীক্ষার ফল ভালোই হচ্ছে বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুলে। উচ্চমাধ্যমিকে ৭০০-তে এই বছর এক পড়ুয়া ৬৭৫ পেয়েছে। মাধ্যমিকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০০% ছাত্রছাত্রী ভালো ফল করেছে। কোভিডের সময় সঠিক ভাবে ক্লাস করতে না পাড়ার জন্য ২০২০-২০২১ সালে মাধ্যমিকের ফল সামান্য খারাপ হলেও এখন আবার ভালো ফল করছে ছাত্রছাত্রীরা।

স্কুলের তিনতলা ভবনে ২২টা শ্রেণিকক্ষ। স্কুলে একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে বইমেলা হয়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বই কেনা ও পড়ার আগ্রহ যথেষ্টই আছে। অনেকে আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য বই কিনতে পারে না। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা তাদের বই কিনতে  সহায়তা করেন। ক্যুইজ কনটেস্টে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা যথেষ্ট ভালো ফল করে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। “আমরা যদি ওদের আরও একটু সহায়তা করতে পারতাম, তাহলে ওরা আরও ভালো ফল করতে পারত। এখনও যারা বইমেলা করে আমাদের স্কুলে তারা সেমিনার করতে চাইছে। তবে এতো ছুটি স্কুলে এখন থাকে তার ফলে সিলেবাস শেষ করা, ইউনিট টেস্ট নেওয়ার কাজটা করতেই সব সময় চলে যায়। এসবের মধ্যেই আমরা কাজটা চালিয়ে যাচ্ছি।” বলছিলেন স্কুলের শিক্ষিকা সোমা ঘোষ দাস।

সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের হাতেই এই স্কুলের সরস্বতী পুজোর ভার থাকে, যেহেতু তারা সংখ্যায় বেশি। তাই সম্প্রীতির একটা বার্তা স্কুল থেকে দেওয়া হয়। সমাজের মূলস্রোতে পৌঁছে এই স্কুলের পড়ুয়ারা কোনও দিন মানুষে মানুষে জাতপাত নিয়ে ভেদাভেদ করবে না বলেই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিশ্বাস। তাছাড়া স্বামী বিবেকানন্দের নামে যেহেতু স্কুল, তাই ১২ জানুয়ারি, বিবেকানন্দের জন্মদিনটি খুব বড়ো করে স্কুলে উদযাপান হয়, স্থানীয় এলাকায় পড়ুয়ারা প্রভাতফেরি করে। স্কুলটি সরকারি স্পনসর্ড। নিয়মানুসারে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মাইনের খরচই সরকার বহন করে। বাকি সব খরচ স্কুলকেই নিজস্ব তহবিল থেকে মেটাতে হয়। আর এমপি/এমএলএ তহবিলের টাকা মাঝে মাঝে স্কুলের উন্নয়নের জন্য পাওয়া যায়। তাই বলা চলে শহরতলীর এই স্কুলগুলো যথেষ্ট লড়াই করে মানুষ তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র : সোমা ঘোষ দাস, শিক্ষিকা, বোড়াল স্বামীজি বিদ্যাপীঠ হাই স্কুল
ছবি :সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে
এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia