বঙ্গদর্শন এবং বঙ্কিমচন্দ্র

রবীন্দ্রনাথের হাতে বঙ্গদর্শনের পুনর্জীবন লাভ করলেও পুরনো রূপের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়নি

পৃথ্বী সেনগুপ্ত
জাতীয়তাবাদের উন্মেষের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে বাংলা সাংবাদিকতা তথা সংবাদপত্রের ভূমিকা ভীষণভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ বহু মান্য মানুষের চিন্তাভাবনা এই ধারাকে পরিপুষ্ট করে তুলেছিল৷ যেমন বলা যায় বঙ্গদর্শন পত্রিকার কথা। ১৮৭২ সালের বৈশাখ মাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পত্রিকাটি প্রকাশ করেন৷ শ্রী সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পত্রিকাটি বেশ কিছুদিন সম্পাদনা করেছিলেন। তার পরে সম্পাদক হন শ্রীশচন্দ্র মজুমদার। মৃতপ্রায় বঙ্গদর্শন ১৯০১ সালের গোড়ার দিকে, শ্রীশচন্দ্রের উদ্যোগে ও রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় এক নবপর্যায়ে উন্নীত হয়ে পুনর্জীবন লাভ করে।

বঙ্গদর্শন পত্রিকা জাতীয়তাবাদের উন্মেষে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৮৭৬ সালে বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম গানটি বঙ্গদর্শন পত্রিকায় যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখন ভারতবাসী এক নতুন জাতীয়তাবাদী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ১৮৮২ সালের পরে বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম গানটি আনন্দমঠ উপন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই এই গান সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করে বঙ্গদর্শন-এ লিখেছিলেন “একদিন দেখিবে এই গান লইয়া বাঙালী উন্মত্ত হইয়াছে – বাঙালী মাতিয়াছে।”

আমরা বাংলা গদ্যের জনক বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস সম্পর্কে অনেকটাই পরিচিত৷ কিন্তু বঙ্গদর্শন-এ প্রকাশিত তার বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী, ধর্মমূলক, শিক্ষামূলক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রবন্ধ যে তৎকালীন ও পরবর্তী বহু রাজনৈতিক নেতার আদর্শস্বরূপ ছিল, তার যথার্থ মূল্যায়ণ কিন্তু খুব কমই হয়েছে৷ একইভাবে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বঙ্গদর্শনের ভূমিকা কতটুকু ছিল বিস্তারিতভাবে আজও তা নির্ণিত হয়নি। অবশ্য ইতিহাসে তার গুরুত্ব আজও অম্লান। বঙ্গদর্শন পত্রিকার মধ্য দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র দেশ ও জাতির দুঃখ দুর্দশায় যে বিচলিত হয়েছিলেন, রাগে, ক্ষোভে আন্দোলিত হয়েছিলেন সরাসরি কিন্তু তার প্রকাশ ঘটেছিল এখানে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধেই। সরকারী উচ্চপদে আসীন থাকায় বঙ্কিমচন্দ্রের পক্ষে সরাসরি সরকারের বিরোধীতা করা সম্ভব ছিল না ৷ তাই পরোক্ষে বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে বঙ্গদর্শন-কে হাতিয়ার করেই তিনি তাঁর মনের সমস্ত ক্ষোভ ও বিক্ষোভ, মতাদর্শ প্রকাশ করেছিলেন। যেমন খ্রীষ্টান পাদ্রী হেষ্টি যখন হিন্দু ধর্মের সমালোচনা করে দি স্টেটসম্যান পত্রিকায় লিখেছিলেন, তখন বঙ্কিমচন্দ্র রামচন্দ্র ছদ্মনামে বঙ্গদর্শন-এ বিখ্যাত প্রবন্ধ কৃষ্ণচরিত লিখেই তার যোগ্য জবাব দেন।

ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের স্বরূপ যেমন ছিল তাঁর উপন্যাস, তেমনি দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী বঙ্কিমচন্দ্রের স্বরূপ ছিল বঙ্গদর্শন। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ-ভারত কলঙ্ক, ভারতের স্বাধীনতা এবং পরাধীনতা, বাঙালীর বাহুবল, বাংলার ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, লোক রহস্য প্রভৃতিই ছিল এর অন্যতম উদাহরণ।

সময়ের স্রোতেই এমন একজন পাণ্ডিত্য ও প্রখর ব্যক্তিত্বের অভাবে বঙ্গদর্শন-র আকর্ষণ, ক্ষুরধার রসজ্ঞান, তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক রসবোধও ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে৷ রবীন্দ্রনাথের হাতে বঙ্গদর্শনের পুনর্জীবন লাভ করলেও পুরনো রূপের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়নি। ফলে পত্রিকাও এগিয়ে গিয়েছে স্বাভাবিক মৃত্যুর দিকে।

(‘দিগন্ত’ ব্লগ থেকে সংগৃহীত) 

Developed by DXDasia