শুধু শিক্ষা নয়, শিক্ষকের কথাও ভাবতে হবে
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষায় পাশ ফেল নিয়ে নানা আলোচনা পর্যালোচনা চলছে। শোনা যাচ্ছে অনেকে প্রস্তাব দিয়েছেন শিক্ষকদের পুরস্কার তিরস্কারের মধ্যে দিয়ে প্রতিদিনের কাজকে নিরীক্ষণ করা হবে। তাঁদের মতে শিক্ষকের মূল্যায়ন হলেই তাঁরা যথাযথভাবে পড়াবেন। তখনই সব ছাত্র ছাত্রীরা নিজেদের ক্লাসের পড়া করবে। পাশ ফেলের প্রয়োজন নেই। বা আরো কিছু। আলোচনায় কী হবে আমরা জানি না তবে একটা কথা বারবার মনে হয়, স্কুলশিক্ষার বিষয়টি এত হালকা ভাবে দেখার নয়, আরো গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষককে ইনাম বা তর্জনের আগে ভেবে দেখতে হবে একটি ক্লাসে কত জন পড়ুয়া থাকবে। ৩০-৩৫ জনের বেশি ছাত্র-ছাত্রী থাকলে কোনও শিক্ষকের পক্ষে তাদের প্রত্যেকের দিকে সমান মনোযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘ দিনের পড়ানোর অভিজ্ঞতায় বলতে পারি – শিক্ষক মেশিন নন, তাঁদের পক্ষে ছাত্রের মনের খবর রেখে অসহিষ্ণু না হয়ে ক্লাস চালনার জন্য চাই একটা স্পেস বা পরিসর। তা কি শিক্ষকদের কপালে জোটে? তাদের গ্র্যাজুয়েশন করে বি.এড ডিগ্রি অর্জন করে, অনেক অর্থ ব্যয় করে, অনেক পরিশ্রম করে নিজেকে পরীক্ষার জন্য তৈরি করে, ছোটাছুটি করে অবশেষে টিচার হবার ছাড়পত্র মেলে। চাকরি পায়। নম্বরের উপর নির্ভর করেই তার চাকরি। এবং সেখানেই পথ শেষ এক জন শিক্ষকের। চাকরি জীবনে নিজেকে আরো পরিশীলিত করে তোলার উপায় শিক্ষকদের কার্যত নেই। নেই কোনও গ্রন্থাগারে যাওয়ার সময়, নেই কোন রিফ্রেসার কোর্সের সুযোগ। কেবলই ৪০/৫০/৬০ কি আরো বেশি ছাত্রদের পড়ানোর দায়িত্ব পালন করতে হবে। শিক্ষকতা আসলে জীবনভর গবেষণা। তাঁদের গবেষণার বিষয় হল ছাত্র ছাত্রীরা। শিশু মনকে বুঝে পড়া করানো আর আগামীদিনের পথ দেখানো শিক্ষকের কাজ। শিশুদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ওদের কথা শুনতে হয়। প্রতিটি শিশুর চাহিদা আলাদা, আবেগ আলাদা। শিশু মনের খবর মন দিয়ে বুঝতে হলে ক্লাসে ছাত্র সংখ্যা ৩০এর বেশি হলে চলবে না। এই লেখা পড়তে পড়তে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলবেন – ৫০টি পড়ুয়া নিয়ে যাঁরা পড়ান তাঁরা কি ফাঁকি দিচ্ছেন? উত্তরে বলতে হবে, শিক্ষকেরা সাধারণত অবহেলা করেন না তাদের কাজে। তবুও তাঁরা ব্যর্থ হন। প্রকৃত পরিসরের অভাবে। কেউ কখনও বুঝতে চেয়েছেন কি, একজন শিক্ষক ৪০ মিনিটে ৫০-৬০ জন ছাত্রের মন কী করে বুঝে নেবেন? বহু স্কুলে দেখেছি ইংরাজি, বাংলা অভিধানও থাকে না। নিজের পাগলামির জন্য শহর ছাড়িয়ে অনেক প্রাইমারি স্কুলে হাজির হয়ে দেখেছি শিক্ষকরা নিজেদের সংগ্রহ থেকে অভিধান আনেন।
আরও পড়ুন
উচ্চারণের ভুলই হাজির হচ্ছে খাতায়
আজকের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বলা হয়েছে শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়া যাবে না, তাদের রূঢ় কথা বলা যাবে না। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে পুরস্কার তিরস্কারের যে কথা বলা হচ্ছে তা কি খুব গভীর ভাবনা এবং শিক্ষা-চিন্তা থেকে উঠে আসা কোনও মন্তব্য? না কি কেউ কেউ ভাবছেন, সমস্যার গভীরে যাওয়ার দরকার নেই, ভয় দেখালেই কাজ হবে! তেমন হলে বিষয়টি চিন্তার। রোগের সঠিক ডায়াগনসিস না করে রোগীকে ওষুধ খাওয়ানোর ফল হিতে বিপরীত হতে পারে। অবসরের পর জেলার বিভিন্ন স্কুলে কর্মশালা করতে গিয়ে দেখেছি, প্রাথমিক শিক্ষকদের বড় অংশই যেভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন তা আমরা কলকাতায় বসে কল্পনাও করতে পারব না। পর পর দু’দিন অনুপস্থিত ছাত্রকে বাড়িতে গিয়ে ডেকে আনা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাওয়ার আগে বাসন এবং হাত কী ভাবে ধুতে হবে তাও শেখাতে দেখেছি শিক্ষকদের। ফলে শিক্ষকদের জন্য শুধু তিরস্কার-পুরস্কার নীতি দিয়ে এই সমস্যার সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব নয়।