
মুকুলকে নিয়ে পঞ্চায়েত ভোটে বিজেপি কি চমক দিতে পারবে?
কিছু দিন আগেও বিজেপির স্লোগান ছিল ভাগ মুকুল ভাগ। এখন, আয় মুকুল আয়। পলিটিক্সে ডিগবাজি নতুন কিছু নয়। কিন্তু কেন বিজেপির এই পরিবর্তন?
একটা সময় ছিল যখন বিজেপি নিজেদের বলত, পার্টি উইথ ডিফারেন্স। মানে ব্যাতিক্রমী রাজনৈতিক দল। একটি ঘটনা মনে করিয়ে দিই। এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে এল কে আডবাণীর আত্মজীবনী, ‘মাই কান্ট্রি মাই লাইফ’ বইয়ে। ১৯৯৬ সাল। দিল্লির দফতরে বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণী বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। এমন সময় সুষমা স্বরাজ এসে খবর দিলেন, জৈন হাওয়ালা মামলায় ঘুষ নিয়েছেন এই অভিযোগে সিবিআই আডবাণীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। আডবাণী কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তার পর কয়েকটি ফোন করে খোঁজ নিলেন, খবরটা ঠিক কি না! তার পরই ঘোষণা করলেন, তিনি সাংসদ পদ ছেড়ে দিচ্ছেন। আর, যত দিন না তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছেন, ততদিন তিনি আর ভোটে দাঁড়াবেন না। কথা রেখেছিলেন আডবাণী। তাহলে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত মুকুলকে বিজেপি নিচ্ছে কেন? পলিটিক্সে আসলে আডবাণীদের যুগ শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন, পথ একটাই, যে করেই হোক ভোটে জিততে হবে। একদা চিনের সংস্কারপন্থী নেতা দেং শিয়াও পিং বলেছিলেন, বেড়াল সাদা না কালো দেখার দরকার নেই, ইঁদুর মারলেই হল। এই সব ভালো যার শেষ ভালোর নীতিহীন তত্ত্বেই আস্থা এখন দুনিয়ার রাজনীতির। ভারত, পশ্চিমবঙ্গও তার বাইরে নয়। এটা শুধু যে আজকের বিজেপির নীতি, এমনও নয়। সব দলেরই এই নীতি। তবে এটাও মনে রাখতে হবে কংগ্রেস মুকুলকে নেয়নি। চেষ্টা একটা হয়েছিল। সফল হননি মুকুলপ্রিয় কংগ্রেসীরা।
আজকের বিজেপি নেতারা অবশ্য এসব মানতে নারাজ। তাঁরা উদাহরণ দিচ্ছেন, বাজপেয়ী-আডবাণী যুগেও দুর্নীতিতে অভিযুক্ত, জেল খাটা কংগ্রেস নেতাদের বিজেপিতে জায়গা দেওয়া হয়েছিল। যেমন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুখ রাম বা প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুটা সিং। সুখ রাম জেল খেটেছিলেন, বাড়ি থেকে তিন কোটি হিসেব বহির্ভূত টাকা উদ্ধারের পর। তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ছিল। আর বুটার বিরুদ্ধে ছিল জিএমএম মামলায় ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ। তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে বিহারে রাজ্যপাল হিসেবেও তিনি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তাকে দেশের শীর্ষ আদালতের ভর্ৎসনা শুনে পদত্যাগ করতে হয়েছিল রাজ্যপালের পদ থেকে।
তথ্য হিসেবে এটা ঠিক। কিন্তু এই দু’জনকে যখন বিজেপিতে নেওয়া হয়েছিল, তখন তাঁদের দাঁত, নখের জোর অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তখন ভাগ বুটা ভাগ বলে বিজেপি স্লোগানও দেয়নি।এবং, খুব একটা রাজনৈতিক সুবিধে বিজেপি এথেকে পায়নি। মুকুল রায়কে দলে নেওয়ার যে উদ্যোগ বিজেপিতে চলছে, তার উদ্দেশ্য ১০০ ভাগ ক্ষমতা-রাজনীতির খেলা।
মুকুলকে নিয়ে বিজেপি কী করতে চায়? বিজেপি মোটেই মনে করছে না মুকুল এসে পঞ্চায়েত ভোটে বড় কোনও সাফল্য এনে দেবেন। এবং সম্ভবত রাজ্য সংগঠনের কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদেও বাসানো হচ্ছে না তাঁকে। দলের হয়ে পশ্চিমবঙ্গের পরিদর্শক হিসেবেই মুকুলকে ব্যবহার করতে চাইছে বিজেপি।
২০১৩ সালে পঞ্চায়েত ভোটে প্রায় ৪২ হাজার গ্রাম পঞ্চায়েত আসনের মধ্যে বিজেপি মাত্র ৮৭৫৯টি আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছিল। পঞ্চায়েত সমিতি ২৩% এবং জেলা পরিষদের মাত্র ৬৬% আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছিল। মুকুল রায়কে দলে নিলে এই সংখ্যাগুলো সামান্য বাড়তে পারে। কিন্তু ফলে বড় কোনও বদল হবে বলে মনে হয় না। রাজ্যে এই যে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেল, রাজ্য বিজেপিতে এই নিয়ে কোনও তৎপরতা মোটেই চোখে পড়েনি। পঞ্চায়েতে কোনও দাগ কাটতে না পারলে, আগামী লোকসভায় কি বিরাট কোনও ফল করা সম্ভব? এই বিষয়ে কথা বলার সময় এখনও আসেনি। তার আগে অনেকগুলো রাজ্যের ভোট রয়েছে। বিজেপির অশ্বমেধের রথের ঘোড়া তখনও কতটা টগবগে থাকে, তার উপরেও নির্ভর করছে অনেক কিছু।
