আলো রয়ে গেছে

ব্যথায় প্রচন্ড চিৎকারে কিশোরের ‘হেঁড়ে’ গলাটা পরিষ্কার হয়ে যায়

পৃথিবীতে কিছু লোক আজীবন হাসি মজা দিয়ে শেষ অবধি নিজের ইমেজটা বজায় রেখে যান। পৃথিবীর সমস্ত ভারী ভারী কাজ – কথা একদিকে সেই মানুষটা আরেকদিকে, চ্যাপলিনতো বলেইছেন- ‘IN THE END, EVRYTHING IS GAG।’ সেটা কোথাও গিয়ে ছদ্মবেশ। আমি কত বুঝি এটা লোককে সচেতনভাবে না বোঝানোর প্রয়াস। না ‘জানান’ দেওয়ার প্রয়াস, যদি বলি, সেটাই ঠিক হবে। একমাত্র নিজের কাজের ক্ষেত্র ছাড়া।

আজকে তেমনই একজনের জন্মদিন, তিনি কিশোরকুমার বা আভাস কুমার গাঙ্গুলি। বাংলা ভাষায় যাকে “হেঁড়ে” গলা বলে, ছোটবেলায় তেমনই গলা ছিল। খুব ছোটবেলায় পায়ের একটা আঙ্গুল বাদ চলে যায়। সে আঙুল স্পিরিট দিয়ে রাখা হয়েছিল বোতলে। আঙুল জুড়তে পারা যায়নি। কিন্তু ব্যথায় প্রচন্ড চিৎকারে কিশোরের গলাটা পরিষ্কার হয়ে যায়। রফি আর কিশোরের ক্ষেত্রে একটা অসম্ভব কমন জিনিস ছিল, এঁরা দুজনেই সায়গলের অন্ধ ফ্যান। কিশোর নকল করতেন রীতিমত।

একটা বয়েসের পর আমার কিশোর কুমারকে জিনিয়াস বলে মনে হয়েছে। যারা সারাজীবন কমিক অভিনয় করে এসেছেন প্রায়, তাঁদের সিরিয়াস অভিনয় দেখলে চমকে যেতে হয়। এরকম নক্ষত্র বাংলা হিন্দিতে অজস্র। অভিনয় ছেড়ে গানের প্রসঙ্গে আসি। সঙ্গীত কিন্তু একেবারেই শিখে আসেননি কিশোর। নিজেই একটা সাক্ষাৎকারে লতা মংগেশকরকে বলেছেন, আমি সা – রে –গা- মা কিছুই জানি না। জানতেন সবই কিন্তু সেটা প্রথাগত শিক্ষার মাধ্যমে বিশেষ নয়, গাইতে গাইতে। ১৯৪৮ সালে ওঁর প্রথম গান বেরোয়। কিন্তু হিন্দিতে কিশোর বলতে সাধারণ মানুষের যে পাগলামি চোখে পড়ে সেটা আসতে ২১ টা বছর লেগে গেল। আরাধনা ছবিতে, মেরে স্বপ্নো কি রানি কব আয়েগি তু।’ এই একুশ বছরে কিশোর গাইছেন, দুখী মন মেরে শুন মের ক্যাহনা, কোই হমদম না রাহা’, হাল ক্যায়সা হ্যায় জনাব কা, আকে সিধি লগি দিল পে জয়সে,— আরো অজস্র অনবদ্য গান। এই গানগুলো ওঁকে নাম দিল, কিন্তু সেভাবে প্রতিষ্ঠা দিল কি!

তখন রফি গাইছেন প্রায় সব্বার জন্য। একছত্র রফিরাজও কিন্তু ওঁর সাথে রফির সম্পর্ক ভাঙতে পারেনি। অথচ বাজারে গুজব রফি কিশোরের মধ্যে বিরাট শত্রুতা। এমনি কিশোর দিনে ৬ টা ৭ টা গান রেকর্ড করতেন, কিন্তু রফির সাথে ডুয়েট থাকলে গোটা দিনে ওটাই করতেন, জানতেন রফির মত পারফেকসনিস্ট শিল্পী অনেক সময় নিয়ে গানটা রিহার্স করবেন। একটা গল্প শুনেছিলাম, রফি তখন কাজ বিশেষ পাচ্ছেন না, কিশোরের দাপট শুরু হয়ে গেছে। একটা রেকর্ডিং স্টুডিয়ো থেকে আওয়াজ আসছে রফি গাইছেন, কিশোর গেলেন সেখানে। দেখলেন রফিকে এক উঠতি সঙ্গীত পরিচালক বলছেন, ‘এভাবে হচ্ছে না, আমি এইভাবে গান।’ কিশোর দরজা খুলে সেই পরিচালককে যা তা বললেন আর বললেন, তুমি রফি সাহেব কে গান শেখাচ্ছ! কিশোর রফিকে নিয়ে গেলেন এক বিখ্যাত পরিচালকের কাছে, সেখানে রফি একটা গান গাইলেন যা বিখ্যাত এখনো। এ গল্প যদি সত্যি নাও হয়, এর থেকে পবিত্র মিথ্যে আর হয় না। মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বলে মদ-সিগারেট ছুঁয়ে দেখেননি।

আসলে এ কথাগুলো বলা দরকার এ কারণে, শুধু তথ্য দিয়ে মানুষের জীবন চলে না, একটা মানুষের প্রামান্য চরিত্র দেখতে গেলে এই ঘটনাগুলো জরুরী। নাহলে উত্তর প্রজন্মের কাছে সাল তারিখ ছাড়া কিছু থাকবে না।

লতা মংগেশকরের সুরে গেয়েছিলেন, আমি নেই ভাবতেই ব্যথায় ব্যথায় মন ভরে যায়। আমার শোনা অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাংলা গান। ১৯৬১ সালে নিজের সুরে গাইলেন, ঠন্ডি হাওয়া ইয়ে চান্দনি সুহানি, কোই হমদম না রাহা। পাঠক, সুর গুলো একটু ভেবে দেখুন। লতা গাইলেন ক্ল্যাসিক্যাল বেসড গান, ‘ভালোবাসার আগুন জ্বেলে কেন চলে যাও’ কিশোরের সুরে। যে মজার কথা বলছিলাম শুরুতে, অভিনেতা প্রাণ একটা সিনেমায় কিশোরকে পেটে একটা ঘুষি মারবেন, স্বভাবত কিশোর ব্যথায় পড়ে যাবেন। চোদ্দটা টেক হল, কিশোর পড়েন না, খালি হাসেন। কিশোর কে বাগে আনতে পনের নম্বর বার প্রাণের শক্ত একটা সত্যিকারের ঘুষি। এবার সত্যি ওঁর প্রাণ যায় যায়। ভেতরে একটা সরল অথচ শক্ত প্রাণ না থাকলে একটা ‘দূর গগন কি ছাও মে’ হয়? এই সিনেমাটার গান লিখছিলেন কবি শৈলেন্দ্র, ওঁর থেকে অনুমতি নিয়ে কিশোর সিনেমার এই গানটা লেখেন আ চলকে তুঝে ম্যায় লেকে চলু’, অসামান্য সুর ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের।

শোনা যায় ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি দেবেন বলে ‘লুকোচুরি’ সিনেমা করেছিলেন কিশোর। ভেবেছিলেন ফ্লপ হবে, ট্যাক্সে ছাড় পাবেন। ফল কী হল পাঠক জানেন। একটা চঞ্চল মনের ভেতরে সিরিয়াসনেস কিভাবে লুকিয়ে রাখা যায়, সেটা কিশোর দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। একটা সাক্ষাৎকারে কিশোর বলছেন, আমাকে তো দুনিয়া পাগল বলে, এখন ইচ্ছে করে আমি এগুলো করি, এবার দুনিয়া দেখুক পাগলামি কাকে বলে। সত্যি তো দিনের শেষে সবই তো GAG।

Developed by DXDasia