
আজ জহর রায়ের জন্মশতবর্ষ
রবি বসু একেবারে ভেবলে গেলেন জহর রায়ের প্রস্তাবটা শুনে। তৎকালীন বাংলার জনপ্রিয়তম চলচ্চিত্র-পত্রিকা ‘উল্টোরথের’ সাংবাদিক রবি বসু। জহর রায়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বও বেশ গভীর। ‘রঙমহল’ থিয়েটারে একদিন আড্ডার সময় রবি বসুকেই অবাক করে দিয়ে জহর বলে বসলেন, “সত্যজিৎ রায়ের আলজিভ যদি দেখার ইচ্ছে থাকে তাহলে কাল সকালবেলা আমার মেসে চলে আয়”। সাংবাদিক জীবনে এমন স্কুপ কোনোদিন পাননি রবি।
পরেরদিন জহরের মেসে যেতেই অবশ্য ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল রবির কাছে। উল্টোরথেরই একটা অনুষ্ঠানে জহরের ‘ন্যাপাসুর বধ’ দেখে হো হো করে এমন হেসেছিলেন সত্যজিৎ যে তাঁর আলজিভটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল একটা ক্লোজ-আপ ফটোয়। রবিকে মেসে ডেকে সেই ফটোটাই তাঁর হাতে তুলে দিয়ে স্বভাবসিদ্ধ মিটকে হেসেছিলেন জহর। রবি বসু রাগে দাঁত কিড়মিড় করেছিলেন কিনা, তা অবশ্য জানা নেই।
জহর রায় এমনই মানুষ। অন্যদের জ্বালিয়ে তাঁর স্বর্গসুখ। আবার, মঞ্চে তাঁরই একক অভিনয় দেখে হাসিতে ফেটে পড়েন সত্যজিৎ। বলেন, “জহর রায় অভিনয়ে না এলে ‘গুগাবাবা’ই হত না!” তাঁকেও অবশ্য কম জ্বালাননি জহর। যদিও, সেটা ইচ্ছাকৃত দুষ্টুমি করে জ্বালানো নয়। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর শুটিং তখন চলছে জয়সলমিরে। ‘ষড়যন্ত্রী মন্ত্রীমশাই’ জহর রায় তখনো আসেননি। কলকাতায় অন্য শুটিং-পর্ব সেরে যোধপুর নেমে সেখান থেকে ট্যাক্সিতে করে তাঁর জয়সলমিরে পৌঁছনোর কথা রাত দশটায়। কিন্তু, এলেন রাত আড়াইটের পর। জানা গেল, মাঝরাস্তায় গাড়ি নাকি উলটে গেছিল। জহর রায় সত্যজিৎকে বললেন- “আরে মশাই—চাঁদনি রাত, ষাট মাইল স্পিডে চলেছি, দিব্যি পিচ ঢালা সোজা রাস্তা, অন্য গাড়ির চলাচল নেই—সর্দারজি ড্রাইভার বাঁ হাত কাঁধের পিছনে রেখে ডান হাতে আপেল নিয়ে তাতে কামড় দিচ্ছেন, স্টিয়ারিং-এ রেখেছেন নিজের ভুঁড়িটা। সেটাকে একটু এদিক ওদিক করলেই গাড়ি এদিক ওদিক ঘুরছে। এমন সময় হুশ করে রাস্তার মাঝখানে পড়ে গেল খরগোশ। তাকে বাঁচাতে গিয়ে গাড়ি গেল উলটে। আমার হুঁশ ছিল, দেখলাম আমি গড়াচ্ছি, আর আমার পাশ দিয়ে গড়াচ্ছে দুটো হোলডঅল। খটকা লাগল—হোলডঅল তো সঙ্গে একটি, অন্যটি এল কোত্থেকে? বুঝলাম ওটি হল আমাদের সর্দারজি।”
দুর্ঘটনার এমন বর্ণনা ফাঁদা একমাত্র জহর রায়ের পক্ষেই হয়তো সম্ভব। যাহোক, দুর্ঘটনায় নাকে সামান্য চোট পাওয়া ছাড়া গুরুতর কিছু ঘটেনি। পরদিন থেকেই জহর রায় নেমে পড়লেন শুটিং-এ।
কাজের ক্ষেত্রে যাকে বলে সমর্পিত মানুষটি জীবন থেকে মজার রসদ শুষে নিয়েই বাঁচতে ভালোবাসতেন। ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে শুটিং চলছে। পরিচালক নরেশ মিত্র। হঠাৎ শটের মাঝখানেই পরিচালক বলে উঠলেন ‘কাট’। ক্যামেরা থেমে গেল সঙ্গেসঙ্গে, সেটের আলো জ্বলে উঠল। এদিকে নরেশ মিত্র তো ‘কাট’ বলেননি। তাহলে নরেশ মিত্রর কিঞ্চিৎ অনুনাসিক গলা হুবহু নকল করে কাট বলল কে? যিনি বলেছেন, তিনি ততক্ষণে চম্পট দিয়েছেন সেট থেকে। সবটা বুঝতে পেরে জহরের ওপর খুবই রেগে গেলেন নরেশ মিত্র। পরেরদিন কাকভোরে জহর তাঁর বাড়ি গিয়ে হাজির। নরেশ ঘুম থেকে উঠেই দেখেন, তাঁর সামনে কান ধরে দাঁড়িয়ে জহর। রাগ গলে জল হতে সময় লাগল না। যাওয়ার আগে জহর তাঁকে বললেন, “শুনেছি আপনি দানীবাবুকে স্টেজে এরকম করে জ্বালাতন করতেন! তা সেই পদ্ধতিটাই আপনার ওপর প্রয়োগ করে একটু দেখছিলাম।”
বাবা সত্য (সতু) রায় নিজেও ছিলেন সাইলেন্ট যুগের চলচ্চিত্র-অভিনেতা। ছোটো থেকেই সাইলেন্ট-মুভির প্রবাদপুরুষ চার্লি চ্যাপলিনকে দেখেছেন খুঁটিয়ে। অভিনয় তাঁর রক্তমজ্জায়। পাটনায় প্রুফ রিডার, মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরির পরে দর্জির দোকানও দিয়েছিলেন। তারপর অভিনয়ের পোকা নড়ে উঠল মাথায়। এক বরযাত্রীর দলের সঙ্গে ভিড়ে ট্রেনের টিকিট-ভাড়া বাঁচিয়ে চলে এলেন কলকাতা। ১৯৪৭-এ দেশ স্বাধীন হল, জহর অভিনীত প্রথম সিনেমাটিও রিলিজ করল। অর্ধেন্দুর পরিচালনায় ‘পূর্বরাগ’। এর পরে তিরিশ বছরে তিনশোর কাছাকাছি ছবি। অসংখ্য মঞ্চাভিনয়, ফাংশান, কমিক রেকর্ড। কাজ করেছেন সত্যজিত-ঋত্বিক-তপন সিংহ সবার সঙ্গেই। উত্তম-সুচিত্রার উল্টোদিকে ভানু-জহর তখন আরেকটা জনপ্রিয় জুটি। দু’জনে অভিন্ন হৃদয় বন্ধুও। ভানুর মতো জহরও নিবিড় পাঠক। ‘অমিয় নিবাস’-এর বাড়িতে বারোটি আলমারি ভর্তি হাজার হাজার বই।
আরও পড়ুন
একজন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে ওঠার কাহিনী
আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে এই দিনেই জন্মেছিলেন জহর রায়। বাংলা সিনেমা বর্তে গেছিল তাঁকে পেয়ে। দু-তিন সিনের সামান্য সামান্য সুযোগেই আলো কেড়ে নিতে পারতেন জহর। তাঁর ‘ইম্প্রোভাইজ’ করার ক্ষমতা তো প্রবাদপ্রতিম। সামান্য সংলাপকে বাড়িয়ে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিতে পারতেন। ভাগ্যিস, শুরুতেই সেদিন ‘জহর’ চিনতে ভুল করেনি টলিউড। কিন্তু, আমরা তাঁকে হয়তো ‘কমেডিয়ান’ হিসেবেই চিনলাম। কমেডিয়ানরা এ’দেশে ঠিক ‘অভিনেতা’ হন না কিছুতেই। জহরও তাই হাসিয়েই গেলেন আজীবন। আজো হাসাচ্ছেন নিজের অজান্তেই। কিন্তু তাঁর জন্মশতবর্ষের কথা যে বেমালুম ভুলে গেছে কলকাতা।
তথ্যঋণ : ‘সাতরঙ: স্মৃতির সরণিতে বাংলা চলচ্চিত্রের অর্ধ শতাব্দী’, রবি বসু; ‘একেই বলে শুটিং’, সত্যজিৎ রায়; ‘এ জহর সে জহর…’, সোহম দাস।
