শ্রাবণের পবনে আকুল বিষণ্ণ সন্ধ্যায়
কী তাজ্জব ব্যপার! আমরা নাকউঁচু বাঙালিরা চট করে বলে দিতে পারি আজ জুলাইয়ের কত তারিখ, অথচ বাংলা সনের চতুর্থ মাস—শ্রাবণ মাসের আজ কত তারিখ হইল তাহার খবর আমরা রাখি না। শ্রাবণ মাসের নিজস্ব বিরহের প্রধান কারণ হিসেবে এটাই যথেষ্ট বলে ধরা যেতে পারে। তবে, বাঙালির দুই আইডল—রবীন্দ্রনাথ এবং জীবনানন্দকেই যদি ধরা হয়, শ্রাবণ মাসের বিরহ যে কী বস্তু, তাঁরা তুলে ধরে গিয়েছেন। ‘অন্ধকারকে ঠিকমত তার উপযুক্ত ভাষায় যদি কেউ কথা বলাতে পারে তবে সে এই শ্রাবণের ধারাপতনধ্বনি। অন্ধকার নিঃশব্দতার উপরে এই ঝর ঝর কলশব্দ যেন পর্দার উপরে পর্দা টেনে দেয়, তাকে আরো গভীর করে ঘনিয়ে তোলে, বিশ্বজগতের নিদ্রাকে নিবিড় করে আনে। বৃষ্টিপতনের এই অবিরাম শব্দ, এ যেন শব্দের অন্ধকার।’ রবীন্দ্রনাথই একথা বলেছেন এবং এ প্রসঙ্গে তাঁর এই গানটির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে-
শ্রাবণের পবনে আকুল বিষণ্ণ সন্ধ্যায়
সাথিহারা ঘরে মন আমার
প্রবাসী পাখি ফিরে যেতে চায়
দূরকালের অরণ্যছায়াতলে॥
কী জানি সেথা আছে কিনা আজও বিজনে বিরহী হিয়া
নীপবনগন্ধঘন অন্ধকারে–
সাড়া দিবে কি গীতহীন নীরব সাধনায়॥
হায়, জানি সে নাই জীর্ণ নীড়ে, জানি সে নাই নাই।
তীর্থহারা যাত্রী ফিরে ব্যর্থ বেদনায়–
ডাকে তবু হৃদয় মম মনে-মনে রিক্ত ভুবনে
রোদন-জাগা সঙ্গীহারা অসীম শূন্যে শূন্যে॥
শ্রাবণের সন্ধ্যাবেলাগুলোয় কী যেন একটা অলসতা পেয়ে বসে, শিশু তার নূতন শেখা কথা নিয়ে যেমন অকারণে অপ্রয়োজনে ফিরে ফিরে উচ্চারণ করতে থাকে সেইরকম—তার শ্রান্তি নেই, শেষ নেই, তার আর বৈচিত্র্য নেই, শুধু অবিরাম ধ্বনির সুর আছে। 'শ্রাবণসন্ধ্যা' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, আজ বোবা সন্ধ্যাপ্রকৃতির এই-যে হঠাৎ কণ্ঠ খুলে গিয়েছে এবং আশ্চর্য হয়ে স্তব্ধ হয়ে সে যেন ক্রমাগত নিজের কথা নিজের কানেই শুনছে, আমাদের মনেও এর একটা সাড়া জেগে উঠেছে—সেও কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। ঐরকম বলতে চায়—কিন্তু সে তো কথা দিয়ে হওয়ার জো নেই তাই সে একটা সুরকে খুঁজছে। জলের কল্লোলে, বনের মর্মরে, বসন্তের উচ্ছ্বাসে, শরতের আলোকে, বিশাল প্রকৃতির যা-কিছু কথা সে তো স্পষ্ট কথায় নয়—সে কেবল আভাসে ইঙ্গিতে, কেবল ছবিতে গানে। এইজন্যে প্রকৃতি যখন আলাপ করতে থাকে যখন সে আমাদের মুখের কথাকে নিরস্ত করে দেয়, আমাদের প্রাণের ভিতরে অনির্বচনীয়ের আভাসে ভরা গানকেই জাগিয়ে তোলে।
গগনেন্দ্রনাথের আঁকা ছবি
নিজের ভাষার সঙ্গে প্রকৃতির চিরদিনের ভাষাকে মিলিয়ে নেবার জন্যে মানুষের মন প্রথম থেকেই চেষ্টা করছে। প্রকৃতি থেকে রঙ এবং রেখা নিয়ে নিজের ভাবকে মানুষ কাব্য করে তুলছে, প্রকৃতি থেকে সুর এবং ছন্দ নিয়ে নিজের ভাবকে মানুষ কাব্য করে তুলছে। এই উপায়ে চিন্তা অচিন্তনীয়ের দিকে ধাবিত হয়, ভাব অভাবনীয়ের মধ্যে এসে প্রবেশ করে। এই উপায়ে মানুষের মনের জিনিসগুলি বিশেষ প্রয়োজনের সংকোচ এবং নিত্যব্যবহারের মলিনতা ঘুচিয়ে দিয়ে চিরন্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এমন সরস নবীন এবং মহৎ মূর্তিতে দেখা দেয়।
শ্রাবণ, তুমি বাতাসে কার আভাস পেলে–
পথে তারি সকল বারি দিলে ঢেলে।
কেয়া কাঁদে, “যা য় যা য় যায়।’
কদম ঝরে, “হা য় হা য় হায়।’
পুব-হাওয়া কয়, “ওর তো সময় নাই বাকি আর।’
প্রকৃতির শ্রাবণ-অন্ধকারের ভাষা আমাদের ভাষার সঙ্গে মিলতে চায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, গান ছাড়া শ্রাবণের আর কোনও কথা নেই। আমার কথা আজ থাক। সংসারের কাজকর্মের সীমাকে, মনুষ্যলোকের বেড়াকে একটুখানি সরিয়ে দাও; আজ এই আকাশ-ভরা শ্রাবণের ধারাবর্ষণকে অবারিত অন্তরের মধ্যে আহ্বান করে নাও।
‘আমার কাছে এইটেই বড়ো আশ্চর্যের ঠেকে—একই কালে প্রকৃতির এই দুই চেহারা, বন্ধনের এবং মুক্তির; একই রূপ-রস-শব্দ-গন্ধের মধ্যে এই দুই সুর, প্রয়োজনের এবং আনন্দের; বাহিরের দিকে তার চঞ্চলতা, অন্তরের দিকে তার শান্তি; একই সময়ে এক দিকে তার কর্ম, আর-এক দিকে তার ছুটি; বাইরের দিকে তার তট, অন্তরের দিকে তার সমুদ্র।’ রবীন্দ্রনাথের এই কথাগুলোরই উত্তরকালের ভাষা, ভাবনায় জীবনানন্দ দাশ ‘শ্রাবণ সন্ধ্যা’ পেরিয়ে লিখে গিয়েছেন ‘শ্রাবণরাত’-
শ্রাবণের গভীর অন্ধকার রাতে
ধীরে-ধীরে ঘুম ভেঙ্গে যায়
কোথায় দূরে বঙ্গোপসাগরে শব্দ শুনে?
বর্ষণ অনেকক্ষণ হয় থেমে গেছে;
যত দূর চোখ যায় কালো আকাশ
মাটির শেষ তরঙ্গকে কোলে করে চুপ করে রয়েছে যেন;
নিস্তব্ধ হয়ে দূর উপসাগরের ধ্বনি শুনছে।…
বিরহ মিলনেরই অঙ্গ। ধোঁয়া যেমন আগুন জ্বলার আরম্ভ, বিরহও তেমনি মিলনের আরম্ভ-উচ্ছ্বাস। খবর আমাদের দেয় কে। ঐ-যে তোমার বিজ্ঞান যারা মনে করছে তারা প্রকৃতির কারাগারের কয়েদী, যারা পায়ে শিকল দিয়ে একজনের সঙ্গে আর-একজন বাঁধা থেকে দিনরাত্রি কেবল বোবার মতো কাজ করে যাচ্ছে—তারাই।যেই তাদের শিকলের শব্দ আমাদের হৃদয়ের ভিতরে গিয়ে প্রবেশ করে অমনি দেখতে পাই, এ-যে বিরহের বেদনাগান, এ-যে মিলনের আহ্বানসংগীত। যে-সব খবরকে কোনও ভাষা দিয়ে বলা যায় না, সেসব খবরকে এরাই তো চুপিচুপি বলে যায়, এবং মানুষ কবি সেই সব খবরকেই গানের মধ্যে কতকটা কথায় কতকটা সুরে বেঁধে গাইতে থাকে-
ভরা বাদর, মাহ ভাদর
শূণ্য মন্দির মোর।
রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি
আজ কেবলই মনে হচ্ছে, এই যে বর্ষা, এ তো এক সন্ধ্যার বর্ষা নয়, এ যেন আমার সমস্ত জীবনের অবিরল শ্রাবণধারা। যতদূর চেয়ে দেখি, আমার সমস্ত জীবনের উপরে সঙ্গীহীন বিরহসন্ধ্যার নিবিড় অন্ধকার—তারই দিগ-দিগন্তরকে ঘিরে অশ্রান্ত শ্রাবণের বর্ষণে প্রহরের পর প্রহর কেটে যাচ্ছে; এই শ্রাবণের বুকের মধ্যে একটি নিবিড় রস অত্যন্ত গোপনে ভরা রয়েছে; একটি কোন বিকশিত বনের সজল গন্ধ আসছে, এমন একটি অনির্বচনীয় মাধুর্য যা যখনি প্রাণকে ব্যথায় কাঁদিয়ে তুলছে তখনি বিদীর্ণ ব্যথার ভিতর থেকে অশ্রুসিক্ত আনন্দকে টেনে বের করে নিয়ে আসছে। বলেছেন রবীন্দ্রনাথ।
আরও পড়ুন: “পাশ ফিরে শো তো দুগ্গা, বড্ড জল পড়চে”
কী আশ্চর্য! প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর এমন সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল যে আপামর বাঙালির মন বিরহী করে, বাংলা ২২ তারিখটি চিরদিনের জন্য স্মরণীয় করে রবীন্দ্রনাথ বিদায় জানিয়েছিলেন এই শ্রাবণ মাসেই। সেই সুর ধরা দেয় এই গানে-
বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,
আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান॥
মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে
এই-যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান॥
আজ এনে দিলে, হয়তো দিবে না কাল–
রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল।
এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবণে তব বিস্মৃতিস্রোতের প্লাবনে
ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরণী বহি তব সম্মান॥
তথ্য:-
সংকলন: শ্রাবণসন্ধ্যা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গীতবিতান
মহাপৃথিবী: জীবনানন্দ দাশ
ছবি:-
গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর