লোকবাদ্য বানামের সুরে জল, জঙ্গল, জমিন দখলের প্রতিবাদ

বীরভূমের ছাতিনার বানাম বাদ্যযন্ত্র কিছুটা বেহালা গোত্রীয় – আলোকচিত্রী সায়নী চক্রবর্তী

বীরভূমের ছাতিনা। পথচলতি সারি সারি বাড়ির দেওয়ালে কত কত কারুকাজ। দেওয়ালগুলির মতোই গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের সংগীত। সাঁওতাল আদিবাসীদের হাতের তৈরি বানাম, গাবগুবির সুর মূর্চ্ছনা ভেসে বেড়ায় তেপান্তর। কিন্তু বাংলার নিজস্ব এই যন্ত্রগুলির সুর ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। রাজনগর ব্লকের গুলালগাছি গ্রামের বাসিন্দা গণেশ সোরেন (৪২) বলছেন, তাঁদের বিভিন্ন পরবে এগুলি বাজানো হয়। বানাম আসলে ডবল স্ট্রিং গাবগুবির বিশেষ সংস্করণ। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি যন্ত্র। সিধু-কানহু উৎসবে বানাম না বাজালে পরব সম্পূর্ণ হয় না।

এই গ্রামের আরেক বাসিন্দা হপন সোরেন (৪৬) জানাচ্ছেন, “আমাদের শৈশবে বিখ্যাত বানাম বাদকদের শুনতাম রেডিওতে। নিয়মিত তা মন দিয়ে শুনে নতুন নতুন সুর তৈরি করতাম।”

গণেশ সোরেনের মতে এই বাদ্যযন্ত্রের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইতিহাস রয়েছে। সাঁওতালদের স্বাধীনতার নিজস্ব স্লোগান ছিল – জল, জঙ্গল, জমিনকে দখল করতে হবে। সেই সংগ্রামের প্রতিফলন বানাম বাদ্যযন্ত্রে নিহিত আছে। গণেশ এবং হপন দুজনেই স্থানীয় এক মহাজনের জমিতে চাষ করেন। যদিও এই অঞ্চলে সরকারি নিয়মে দৈনিক মজুরির হার ২৪০ টাকা। মাঝেমধ্যে, রাজমিস্ত্রির কাজ পেলে তাঁরা ২৬০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান।

প্রতিটি বানাম এবং গাবগুবিই নিজগুণে স্বতন্ত্র। স্রষ্টার শিল্পগুণে খানিক আদুরেও বটে। হপন সোরেন বানাম তৈরি করেন কাঠ দিয়ে, বাসলি (ফলকযুক্ত কুড়ালের মতো যন্ত্র) এবং রুকা (ছেনি) ব্যবহার করে। অন্যদিকে, গণেশের বানামে রয়েছে নারকেলের খোলা, পশুর চামড়ার নানা উপকরণ।

বানাম আসলে তার নিজগুণে স্বতন্ত্র। কিছুটা বেহালা গোত্রীয়। ছড়ের সাহায্যে বাজানো হয়। যার নিজস্ব একটি শব্দতরঙ্গ আছে।

ছাতিনায় গিয়ে গণেশ সোরেন-হপন সোরেনদের সঙ্গে কথা বলে, মিশে, তাঁদের বাজনা শুনে অসামান্য কিছু মুহূর্ত ফ্রেমবদ্ধ করেছেন বিশ্বভারতীর ছাত্রী এবং আলোকচিত্রী সায়নী চক্রবর্তী। আজকের ছবিমহল সুরেলা। বানাম বাজিয়ে যাঁদের পেট চলে, তাঁদের কথা-সুর একবার শুনবেন নাকি?

ছবিঃ সায়নী চক্রবর্তী

Developed by DXDasia