১৮৫১ থেকে বীরভূম জিলা স্কুলের হাত ধরে মজবুত হয়েছে বাংলার শিক্ষার ভিত

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৯

রাজ্যের সরকারি জেলা স্কুলগুলির মধ্যে বীরভূম জিলা স্কুল এখন এক কথায় অন্যতম সেরা স্কুলের তালিকায় নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছে। এই স্কুলের শুরুর সময়কার ছাত্র থেকে আরম্ভ করে বর্তমান প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক ও ছাত্ররা এক কথায় সকলেই সেরার তালিকায় রয়েছেন। “সাফল্য” শব্দটি বীরভূম জিলা স্কুলের নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছে সেই ১৮৫১ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে।

১৮৫১ সালের ৯ ডিসেম্বর বীরভূম জিলা স্কুলের জন্মদিন। এই জন্মলগ্ন থেকেই বোধহয় স্কুলের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছিল, যে আগামী দিনে কোন উচ্চতায় পৌঁছতে চলেছে এই স্কুল।

এমনিতেই কবিগুরুর শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্য বিশ্বখ্যাত বীরভূম জেলা। সেই বীরভূমেরই আরেক  উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক বীরভূম জিলা স্কুল। জন্মলগ্ন থেকেই এই স্কুল নিজের অস্তিত্ব প্রমাণে সফল, বলছিলেন বীরভূম জেলা স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক অশোক সাহা। সেই একই কথা ধ্বনিত হল স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক চন্দন সাহার গলায়।

বীরভূম জেলা স্কুলের শিক্ষকমণ্ডলী

বীরভূম জেলা স্কুলে ১৮৫৪ সালে মিস্টার এম গ্রেগরি নামে একজন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আসেন। ১৫০ টাকা মাসিক বেতনে তিনি নিজের যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতায় স্কুলটিকে স্বকীয় মর্যাদায় উন্নীত পেরেছিলেন। ব্রিটিশ আমলে বীরভূম জেলার লোকাল কমিটির সেক্রেটারি মিস্টার ম্যাগেট তখন সাফল্যের নিরিখে বীরভূম জেলা স্কুলকে পুরস্কৃত করেন। সাফল্যের সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মিস্টার এম গ্রেগরির পথে হেঁটে চলেছেন অশোক কুমার সাহা থেকে বর্তমান বীরভূম জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক চন্দন সাহা।

২০০৫ সালের জুন মাস থেকে ২০১৬-র নভেম্বর মাস পর্যন্ত অশোক সাহা বীরভূম জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। অশোক সাহা বলছিলেন, “২০০৫ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত, আমার সময় স্কুল উল্লেখযোগ্য ফল হয় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে, যা এখনও বজায় আছে। বীরভূম জিলা স্কুলের কৃতী ছাত্রকে ইংরেজ আমল থেকেই ‘গভর্নরস গোল্ড মেডেল’ নামের পুরস্কার দেওয়া হত। ভারত-চিন যুদ্ধের পর ১০৬৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এই পুরস্কার দেওয়া বন্ধ ছিল। এর পর ২০০১ সাল থেকে আবার গভর্নরস গোল্ড মেডেল দেওয়া শুরু হয়। তবে, আমি থাকাকালীন ২০১০-২০১১ সালে গভর্নরস গোল্ড মেডেলের  পরিবর্তে ১০ হাজার টাকা করে নগদ মূল্য দেওয়া শুরু হয়। এ ছাড়াও পরে ১৫/১৬টা নতুন পুরস্কার চালু হয়। স্কুলের অসম্পূর্ণ তিনতলা ভবনটির ছাদ, স্কুলের অভ্যন্তরে একটা ডোবা বুজিয়ে খেলার মাঠ আমিই করেছি। আমার প্রস্তাব অনুসারে স্কুলে একটা অডিটোরিয়াম হচ্ছে, এমপি ল্যাডের টাকায় একটি মিড ডে মিলের ঘর তৈরি করিয়েছি, সর্বশিক্ষা মিশনের টাকায় আরও একটি ভবন টালির চাল থেকে দোতলা করিয়েছি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও নির্বাচনের সময় বীরভূম জিলা স্কুলে ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার হয়, তাই তার জন্য আলাদা একটা ঘর তৈরি করিয়েছি যাতে ওইসব কাজের জন্য ক্লাস ঘর ব্যবহারের প্রয়োজন না হয়, যাতে ক্লাস বন্ধ রাখার দরকার না পড়ে।”

অনেকের ধারণা, লটারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি স্কুলে ছাত্র ভর্তি হয় বলে শিক্ষার মান নেমে যাচ্ছে। তবে এই বিষয়টি মানতে নারাজ অশোক সাহা। তিনি বললেন, “আমাদের স্কুলে সচেতন অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের ভর্তি করাতে আসেন। তাই লটারি হয় একটা নির্দিষ্ট মানের ছাত্রদের মধ্যে। যারা সুযোগ পায় তারা ভর্তি হয়। তবে যেহেতু প্রাইমারি থেকে উচমাধ্যমিক, এই বিরাট সময়টা আমাদের তত্ত্বাবধানে থাকার সুযোগ পায় ছাত্ররা, সেকারণে কেউ যদি ততটা ভালো ছাত্র নাও হয়, তাকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে একটা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছে দিই। আমাদের ছাত্ররা বরাবরই মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যের মধ্যে ১ থেকে ১০-এর মধ্যে থাকত, এখনও থাকে।”

পশ্চিমবঙ্গ মধ্য শিক্ষা পর্ষদ এবং পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের অনুমোদিত পাঠক্রম অনুযায়ী এই স্কুলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পঠনপাঠনের ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার পাশাপাশি স্কুলের ছাত্রদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা, হাতের কাজ, বিজ্ঞান নির্ভর কর্মকাণ্ডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কথা হচ্ছিল বীরভূম জিলা স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক চন্দন সাহার সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করি যাতে এই স্কুলের ছাত্ররা রাজ্যের মধ্যে সেরার শিরোপা অর্জন করে সমাজে একজন আদর্শ মানুষ হিসাবে নিজেদের তুলে ধরতে পারে।”

চন্দন সাহা’র কথার প্রতিফলন পাওয়া যাবে বীরভূম জিলা স্কুলের বিগত কয়েক বছরের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলে। ২০১৮ সালের মাধ্যমিকে রাজ্যের মধ্যে নবম স্থানে ছিল বীরভূম জিলা স্কুল। এরপর ২০২০-র মাধ্যমিকে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম স্থান অর্জন। ২০১৯-এর উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম ও পঞ্চম স্থান পায় বীরভূম জিলা স্কুল। ২০২০ সালে সপ্তম, অষ্টম ও দশম স্থান পায় উচ্চমাধ্যমিকে। ২০২১ সালে উচমাধ্যমিকে অষ্টম এবং ২০২২ সালে উচ্চমাধ্যমিকে নবম স্থান পায়, এছাড়া ২০১৯ সালে বীরভূম জিলা স্কুল রাজ্যের মধ্যে সেরা স্কুলের তকমা পায়। ২০২১ সালে বীরভূম জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক চন্দন সাহা “শিক্ষারত্ন” পুরস্কার পান।

১৩৫ জন ছাত্র নিয়ে মাস মাইনের ভিত্তিতে ১৮৫১ সালের ৯ ডিসেম্বর বীরভূম জিলা স্কুলের যাত্রা শুরু। বর্তমানে বীরভূম জিলা স্কুলের ছাত্র সংখ্যা- প্রাতঃবিভাগে ৩৫০ এবং দিবাবিভাগ অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক মিলিয়ে ৮০০। এই যাত্রাপথে ১৮৭০ সালে বীরভূম জিলা স্কুলের পাশেই ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি রেভারেন্ড অ্যালেন ‘ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি স্কুল’ চালু করলে সাময়িক চাপে পড়তে হয় এই স্কুলকে। তবে সেই সংকট কাটিয়ে তৎকালীন বীরভূম জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাবু শিবচন্দ্র সোমের নেতৃত্বে বীরভূম জিলা স্কুল নিজের স্বকীয়তা ও উৎকর্ষ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এই সাফল্যের জন্য তৎকালীন বঙ্গসমাজে বাবু শিবচন্দ্র সোম যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

বীরভূম জিলা স্কুলের কৃতী পড়ুয়াদের মধ্যে ছিলেন সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিংহ, যিনি পরবর্তীকালে ‘লর্ড সিনহা’ নামে খ্যাত হন। এই স্কুলের কৃতী ছাত্র ছিলেন নরেন্দ্র প্রসন্ন সিংহ পরবর্তীকালে যিনি ‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল’ হন। এই স্কুলে পড়তেন রসময় মিত্র, যিনি ‘রায়বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। পরে তিনিই হিন্দু স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন।

১৯২৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বীরভূম জিলা স্কুলের একটি প্রামাণ্য দলিল তৈরি হয়। এই দলিলটি তৎকালীন বীরভূম জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক বনওয়ারীলাল রায় তৈরি করেছিলেন, সেখানে এমন অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তিদের নাম লেখা আছে যাঁরা এক সময় বীরভূম জিলা স্কুলে পড়েছেন এবং পরবর্তীকালে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।  

ইতিহাসের ধর্ম বহমানতা, সে কখনও থেমে থাকে না। তাই সেই ইতিহাসের পথ ধরেই বীরভূম জিলা স্কুলের ইতিহাসও বয়ে চলেছে এই জেলায় অজয়, ময়ূরাক্ষী কোপাই, বক্রেশ্বর, ব্রাহ্মণী, দ্বারকা, হিংলো, চপলা, বাঁশলৈ, পাগলা নদীর সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে। তবে নদীর বহমানতা পাড় ভাঙে আর বীরভূম জিলা স্কুল সুদীর্ঘ পথ বয়ে চলেছে বাংলার এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের ভিত গড়তে।

_______________

তথ্য সূত্রঃ অশোক সাহা, প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক, বীরভূম জেলা স্কুল, চন্দন সাহা, বর্তমান প্রধান শিক্ষক, বীরভূম জেলা স্কুল

ছবিঃ সংগৃহীত

*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia