জীবনে কি প্রতিযোগিতা কম পড়িয়াছে?

এখন অনেক রাত। ঘরে ফেরার আর কি কোনও রাস্তা আছে?

সামনে মেলা বই খাতা ছড়ানো। মার্চের প্রথম সপ্তাহ। তাও পাখা বন্ধ। গায়ে চাদর, হাল্কা কাঁপুনি। অনেকদিন পর সেই ছেলেটিকে দেখলাম অতীতের আতস কাঁচে।  আচ্ছা,  মাধ্যমিকে অঙ্ক পরীক্ষার আগের দিন রাতে আপনি কি করছিলেন মনে আছে?  বাঁদরের কাছ থেকে তৈলাক্ত বাঁশ কেড়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। নচেৎ চৌবাচ্চার সব কটা নলে কাপড় গুঁজে বন্ধ ক’রে দেওয়ার ব্যর্থ সংকল্প করছিলেন। ও আপনি তো মশায় অঙ্কে কে সি নাগ। তাই হয়তো পরেরদিন পরীক্ষার খাতাখানি ‘পুরো মাখন’  টাইপ সাজাবেন ব’লে সুমনের গান শুনছিলেন ধ’রে নেওয়া যাক। নেহাতই মধ্যবিত্ত বাতাবরণে আমরা বাংলা মিডিয়ামরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি মাধ্যমিক হল গিয়ে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। মেধা ভেদে কারও লক্ষ্য কেবলই পাশ দেওয়া তো কারও লক্ষ্য স্টার। অঙ্কে হিরো বা জিরো যাই হোন না কেন হলপ ক’রে বলতে পারি পরীক্ষার আগের দিন টেনশন কমাতে আপনি নিশ্চই বাইক বিপ্লবে আস্থা রাখেননি। হেলমেট হীন জেট গতিতে ভেসে যাননি উড়ালপুলের রাস্তায়। আমি নিশ্চিত। কারণ তা হ’লে আপনি এই মুহূর্তে চোখ রাখতে পারতেন না ‘বঙ্গদর্শন’-এর পাতায়। বাইক বিপ্লবের শহিদ হয়ে গতির পূজারীদের স্মরণ সভায় ভজিত হতেন।

বাবা বছর দুয়েক আগে গত হয়েছেন। আপনজন বলতে এক ভাই, মা ও ঠাকুরমা। কিন্তু তাই কি? আর আছে সদ্য যৌবনে পা রাখা তরুণ বাইক বিপ্লবী বন্ধু-বান্ধবীরা। মাধ্যমিকের অঙ্ক পরীক্ষার আগের দিন ঠাকুরমার নিষেধ শোনার মতো সময় হয়তো তার ছিল না। পায়েল গুহ। ‘গতির স্ট্রিপ’  হয়তো তাকে ডাকছিল। আর এ নেশা কিন্তু রি-হ্যাবে যাওয়ার সময় দেয় না বিশেষ। বাইকের হ্যান্ডেল ছিল বছর বিশেকের রাহুলের হাতে। হেলমেট ছিল না দু জনের কারুরই। রাতের অন্ধকারে প্রহরীবিহীন কামালগাজি উড়ালপুলে চলল গতির সার্কাস। পায়েল আর তার বন্ধু রাহুল হারিয়ে গেল অচেনা এক গতি পথে। পায়েলের মা আয়ার কাজ ক’রে দিন গুজরান করেন। কষ্ট ক’রে হলেও মেয়ের লেখা-পড়ার খরচ যোগাচ্ছিলেন। পিতৃহীন রাহুলের মা কাজ করেন একটি সোনার দোকানে।

রাতের শহরে বাইক-বাহিনীর তাণ্ডব এখন কমন শিরোনাম। মুখ্যমন্ত্রীর ‘সেভ ড্রাইভ, সেফ লাইফ’ কর্মসূচীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই কসরত চলছে। নৈমিত্তিক জীবনের ‘একঘেয়েমি’ কাটাতে বা ‘ফ্রেশ এয়ারের’ সন্ধানে রাত বাড়লেই চলে প্রতিযোগিতা। প্রশ্ন জাগে, জীবনে কি রেস বা প্রতিযোগিতা কম পড়িয়াছে? তেমনই এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাইক বিপ্লবীকে নাগালে পেয়ে প্রশ্ন করেছিলাম।

বয়স?
-২২
পেশা?
বাবার মুদি খানার দোকান। সেখানেই বসি।
লেখাপড়া- পাশ গ্র্যাজুয়েট  
এরিয়া?
– মূলত বিটি রোড, অন্য জায়গাতেও যাতায়াত আছে
হেলমেট পড়ো না কেন?
-ম্যানহুড নষ্ট হয়ে যায়, তা ছাড়া ওটা গেম রুলসের বাইরে
বাড়িতে কে আছে?
-বাবা আর দাদা। মা মারা গেছে বছর তিনেক আগে।
ভয় লাগে না? যদি কিছু হয়ে যায়
– মর্দ কভি ডরতা নেহি
আর কি নেশা করো
-শুকনো নেশা
বাইক রেস বা সার্কাস দেখিয়ে কি পাও?
– আমাদের একটা গ্যাং আছে। নিজেদের মধ্যে কম্পিটিশন হয়। স্পিড ভালো লাগে। একটা ট্রান্স আছে। অন্য গ্যাং-এর সঙ্গে ম্যাচও হয়।
এই কথাবার্তার পর আবার ফিরে দেখি সেই ছেলেটিকে। অঙ্ক পরীক্ষার আগেরদিন যে ভয় পেত। হাঁটু কাঁপত। কিন্তু ‘বাইক বাহিনীর তাণ্ডব’-এর শিরোনাম আজ তাকে ভাবায়। সে অস্ফুটে ব’লে ওঠে- গতি-গতি-আরও গতি- মানে ট্রান্স, মানে হিংসা, হিংসা মানে রক্তপাত-রক্তপাত মানে আরও মৃত্যুর খোঁজ। এখন অনেক রাত। ঘরে ফেরার আর কি কোনও রাস্তা আছে?

Developed by DXDasia