বিজ্ঞাপন মারিবেন না- ৩

"বৃদ্ধকে যুবার ন্যায় করিতে, অক্ষমকে সক্ষম করিতে একমাত্র শক্তিশালী মহৌষধ 'নবশক্তি' "

ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা একটি জ্যান্ত রঙ্গমঞ্চ হয়ে উঠেছিল, বিলাসব্যসনের বাহুল্য যেখানে চোখ ধাঁধিয়ে দিত লহমায়। সেখানে কলাকুশলী আর দর্শকদের মধ্যে শ্রেণিগত ভেদরেখাটাও ধূসর হয়ে উঠেছিল, সবাই পারফর্মার, সবাই দর্শক। পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে শহরের যাপনের যে মানচিত্রের নির্মাণ ঘটছিল সেখানে বৈভব ছিল অন্যতম চালিকাশক্তি। এই অর্থ এবং জৌলুসের, 'ভোগীর লালসামাখা' শহরের অন্দরমহলে যে সাজঘর ছিল তাকে এড়িয়ে গেলেও চলবে না।

এই সাজঘরের নীল নকশা বুঝতে হলে একটু নেড়েঘেঁটে দেখতে হবে বিজ্ঞাপনের ভাঁড়ার। বিনয় ঘোষ তার 'বাংলার নবজাগৃতি' বইতে সমাচার দর্পণের কিছু প্রতিবেদন ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন কীভাবে একের পর এক যন্ত্রের আবির্ভাব নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটাচ্ছে বঙ্গদেশে। ছাপাখানাও হয়ে উঠেছিল এই 'নবজাগৃতি'-র সূচীকাগার। শ্রীরামপুর মিশন, ফোর্ট উইলিয়ামের  পাশাপাশি বটতলার মতন সমান্তরাল সাংস্কৃতিক ধারাও এই ছাপাখানারই দান। বটতলার সূত্রেই আমরা পেয়েছি পঞ্জিকা, পঞ্জিকা এবং বিজ্ঞাপন সম্বলিত পুস্তিকার মধ্যে ঠাঁই করে নিয়েছে বিবিধ আজব পণ্যপসরার বিজ্ঞাপন। বটতলার আদিরস নিয়ে, তার যৌনতার রকমফের নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। এইসময়ের যৌনতা সরলরৈখিক কোনো কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। সেই যৌনতার সুলুকসন্ধান করতে গেলে ঘরে এবং বাইরে- দুই মোকামেই ছানভিনের প্রয়োজন। আমরা যে বিজ্ঞাপনগুলি নিয়ে আলোচনা করব, তাতে আভাস পাওয়া যাবে সেইসময়ের সামাজিক গঠনে, পারিবারিক গঠনে, বৈবাহিক প্রতিষ্ঠানের গঠনে যৌনতার সর্পিল জটিল গতির।

এ বিষয়ে আমরা শরণ নেব কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত কৃত গবেষণার। কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত তার 'বোতলের নানাপ্রকার কৌতুক বা পুরানো কলকাতার দোকানদারি আর পণ্য পসরার বিজ্ঞাপন: ঔষধ-আতর-তৈলাদি' বইতে দেখিয়েছেন কীভাবে উনিশ শতকীয় পৌরুষ নারীত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে, কীভাবে সেই বানিয়ে তোলা নারীত্বকে চাপিয়ে দিয়েছে অন্দরের নারীদের ওপর, এবং নিজেদের যৌনযাপনকে রেখেছে অনিয়ন্ত্রিত-এইসব সন্দর্ভ কীভাবে উঠে আসছে বিজ্ঞাপনে। 'টিনের তলোয়ার' নাটকে বীরকৃষ্ণ দাঁ জানায় তার মোটে তিনজন "রাঁঢ়" বলে সমাজে মানসম্মান বজায় রাখা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। উনিশ শতকীয় পৌরুষের এই ছবিটা যে আদতে কতটা বাস্তব তার বহুল প্রমাণ রয়েছে। হুতোমের 'হঠাৎ অবতার' নকশায় বলা হচ্ছে , "কলকেতা সহর এই মহাপুরুষদের জন্য বেশ্যাসহর হয়ে পড়েচে, এমন পাড়া নাই যেথায় অন্তত দশ ঘর বেশ্যা নাই; হেথায় প্রতি দশ বৎসর বেশ্যার সংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে বই কমছে না"। এই নকশাতেই বলা আছে বাবুরা কীভাবে ঘরের মধ্যে গৃহিণীদের 'চাবী' বন্ধ করে রেখে বেশ্যাবিলাসের উদ্দেশ্যে বেরোতেন।  একদিকে স্ত্রী শিক্ষা নিয়ে উতরোল হচ্ছিল, আরেকদিকে ছিল কেরি কলতানির মামলার মতন ঘটনা। সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান' বইতে জানিয়েছেন এই মামলার প্রসঙ্গে বিধবার স্বামীর সম্পত্তির ওপর অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছিল বৈধব্যের নৈতিক অবস্থানগত প্রশ্ন। বাঙালি পন্ডিতসমাজ সেসময় দাবি তোলে ব্যাভিচারী পুত্র পিতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনা, কিন্তু যে স্ত্রী স্বামীর ধনসম্পদ ভোগ করে ব্যভিচার করে, সে নিশ্চিত বিশ্বাসঘাতিকা।

পৌরুষের এই আস্ফালনের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় হাউস অফ লর্ডসেও। সেখানেও স্বামীর সম্পত্তি স্ত্রীর হাতে অর্পিত হওয়ার বিরূদ্ধে সওয়াল করা হয়, বলা হয় এত বেশি পরিমাণে স্ত্রী স্বাধীনতা স্বামীদের অবস্থানকে খর্ব করবে। বাবুতন্ত্র পরবর্তী মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবীদের যুগে এই সংকট আরও প্রবল হয়ে দাঁড়াল। বেশ্যাসংসর্গের বাহুল্য কমল। অর্ণব সাহা তার 'উনিশ শতকের বাঙালি মেয়ের যৌনতা'-তে ফুকো কথিত ক্ষমতা-র উল্লেখ করেছেন যা আধুনিক সমাজের যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে, অর্ণব জানাচ্ছেন উনিশ শতকে উপনিবেশের ক্ষমতা বাঙালি পুরুষের অবাধ যৌনজীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি করছে। ঔপনিবেশিক শাসনের দাসত্ব সহ্য করা কেরানি বাঙালির অবদমিত পৌরুষের আধার হয়ে উঠল তাদের গৃহিণীরা। এই একইসময়ে স্ত্রী  স্বাধীনতাও মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে। এহেন সামাজিক সংঘর্ষের মুখে দাঁড়িয়ে বাঙালি পৌরুষ পড়ল মহা ফাঁপরে। এই উনিশ শতকেই কিন্তু নবজাগরণের আলোয় আলোকিত বাঙালি সহবাস সম্মতি আইনকে অস্বীকার করেছে জোরগলায়, তাদের শোবার ঘরের স্বাতন্ত্র্যে হস্তক্ষেপ হচ্ছে এমন দাবি করে। সহবাস সম্মতি আইন তাদের ক্ষমতাচক্রকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছিল। সুমিত সরকারের 'কলিযুগ চাকরি ভক্তি' বইতে পাই, রামকৃষ্ণ তার গৃহী ভক্তদের প্রতি বার্তা দিয়েছিলেন বেতনভুক কেরানি হিসেবে ওপরওয়ালার, এবং স্বামী হিসেবে স্ত্রী-এর দাসত্ব করা চলবেনা। মধ্যবিত্ত্ব বাঙালি পৌরুষ তখন যেনতেনপ্রকারেণ এই দাসত্ব থেকে মুক্তির উপায় খুঁজছে। ১৮৭৪ সালের নাটক 'কেরাণী-দর্পণ' বা অনুরূপ আরও নাটিকায় এর প্রতিচ্ছবি দেখা যাবে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিশ শতকের গোড়া থেকেই এর সঙ্গে জুড়ে গেল জাতীয়তাবাদী প্রকল্প। বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালির বলবীর্যের ইতিহাসের পক্ষে সওয়াল করে গেছেন অনবরত। এক আদর্শ পৌরুষের সন্ধানেই তিনি ছিলেন। "নব্য উন্মেষিত জাতীয়তাবাদের বেদীতে স্ত্রী স্বাধীনতা প্রথম বলি হয়েছিল মনে হয়"-বলেছেন সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়।

এই প্রেক্ষিতেই একটি বিজ্ঞাপনের ওপর দৃষ্টিপাত করা যাক। কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্তর বইতে এই বিজ্ঞাপনটি পাওয়া যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনটির বয়ানে বলা হচ্ছে, "বৃদ্ধকে যুবার ন্যায় করিতে, অক্ষমকে সক্ষম করিতে একমাত্র শক্তিশালী মহৌষধ 'নবশক্তি' "। বলা হচ্ছে 'নবশক্তি' সেবনের পর "আপনার আশায় বুক ভরিয়া যাইবে, প্রাণে নূতন বলের সঞ্চার হইবে। ইহার আশাতীত ফল দেখিয়া আপনি চমৎকৃত ও প্রীত হইবেন"। বোঝাই যাচ্ছে উদ্দিষ্ট উপভোক্তারা পুরুষ। এই বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে বিজ্ঞাপনটি পাওয়া যাচ্ছে সেটি 'চামেলী তৈল'-এর বিজ্ঞাপন। সেই বিজ্ঞাপনের বয়ানে বলা হচ্ছে, "যদি সারাদিন পরিশ্রমের পর মনপ্রাণ পুলকিত করিতে চান, যদি আপনার অর্ধাঙ্গিনীকে পরমাসুন্দরী দেখিতে চান তবে চামেলী তৈল এক শিশি ক্রয় করুন"। পুরুষ এবং নারীর প্রসাধনের এই বৈপরীত্য সেকালের দাম্পত্যের যৌন সমীকরণকে নির্দেশ করছে। এর সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া যাচ্ছে 'রতিবিলাসবটী'-র বিজ্ঞাপন, যেখানে জানানো হচ্ছে বটিকাটি ধ্বজভঙ্গ রোগের জন্য সেব্য। বলা হচ্ছে 'যৌবন থাকিতেও' যারা অক্ষম, তাদের "সমস্ত শক্তি জাগিয়া উঠিবে, প্রাণে অপূর্ব্ব আনন্দ বোধ করিবেন"। শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে জানানো হচ্ছে "যাঁহারা বাজীকরণ ঔষধ সেবন না করিয়া নিয়ত মৈথুনাশক্ত তাহাদের অতিরিক্ত শুক্রক্ষয় হেতু ধ্বজভঙ্গ হয়"‌। আছে 'পুরুষত্ব হানির মহৌষধ'-এর বিজ্ঞাপন যা ''স্নায়বিক উত্তেজক, বলকারক, রক্তের তড়িৎ উৎপাদক, কামোদ্দীপক, শুক্রবর্দ্ধক"। এর পাশাপাশিই মিলছে 'কামেশ্বর বটীকা'-র বিজ্ঞাপন। "প্রথম যৌবন স্বভাব সুলভ দোষ, অতিশয় ইন্দ্রিয়াশক্তি, অথবা পুরাতন প্রমেহাদি রোগহেতু যে শুক্রতারল্য, দৌর্ব্বল্য, স্বপ্নদোষ… সামান্য উত্তেজনায় শুক্রক্ষরণ" ইত্যাদি অপৌরুষেয় দোষ দূর করে এই বটীকা খাপে খাপ পৌরুষ উপহার দেবে। স্ত্রীদের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য ছিল 'নৈশ সুন্দরী' তেল, "গৃহলক্ষ্মীকে দুই চারি ফোঁটা ইহা মাখাইয়া, দিবারাত্র সেই আনন্দ উপভোগ করুন"-বিজ্ঞাপনের বয়ান বলছে। স্ত্রীব্যাধি দূরীকরণের জন্য ছিল 'রমণী রক্ষক' মহৌষধ। আদর্শ পুরুষ এবং আদর্শ নারী গড়ার খেলার অঙ্গ এসবই। এছাড়াও ছিল বিবিধ শক্তিবর্ধক সালসার বিজ্ঞাপন, যার একটিতে রয়েছে এক বলবান পুরুষের ছবি যাকে একটি বাঘ এবং সিংহ যৌথ চেষ্টাতেও কাবু করতে পারছেনা। "সারিবাদি সালসা আর ভোগীর লালসামাখা আভোগীতে গান"- নব্বইয়ের গোড়ায় কবীর সুমনের গানের এই লাইনের সঙ্গে বাঙালি পরিচিত হয়েছিল। ফলে সেই ট্র্যাডিশন যে সমানে চলেছে এবং চলছে তা বোঝা যায়। তবে অবশ্যই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সামাজিক মাত্রা গেছে পাল্টে। 

Developed by DXDasia