ভিন্ন ধারার ডাক্তার – ১

শ্রীরামকৃষ্ণেরও চিকিৎসক ছিলেন মহেন্দ্রলাল সরকার

সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে রাজ্য জুড়ে যখন খবরের শিরোনামে প্রায়শই ‘ভুয়ো ডাক্তার’, তখন চিকিৎসক দিবস উদযাপনের মাসে চিকিৎসা ও চিকিৎসক বিষয়ক আলোচনায় উঠে আসে নবীন-প্রাচীন একাধিক ডাক্তারের নাম, চিকিৎসার নৈতিকতা সংক্রান্ত বিস্তর প্রশ্ন, বৃহত্তর ভারতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, পশ্চিমী চিকিৎসার প্রভাব প্রভৃতি প্রসঙ্গও। এই পরিসরে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে রইলেন উনিশ শতকের দুজন চিকিৎসক, যারা আদ্যন্ত বিজ্ঞানমনস্ক, এবং প্রাথমিক পর্যায়ে পশ্চিমি চিকিৎসায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ সত্ত্বেও বেছে নিয়েছিলেন তথাকথিত ‘অল্টারনেটিভ মেডিকেল সিস্টেম’ অর্থাৎ সমান্তরাল চিকিৎসাপদ্ধতিকে। আজ প্রথম কিস্তি।

মহেন্দ্রলাল সরকার (২ নভেম্বর ১৮৩৩-২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯০৪)
উনিশ শতকের স্বনামধন্য চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকার ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘শ্রীরামকৃষ্ণের ডাক্তার’ হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’-র লেখক মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত তাঁর ডায়েরিতে ঠাকুরের ডাক্তার প্রসঙ্গে আলোচনায় মহেন্দ্রলাল সরকারের উল্লেখ করেছিলেন বিশদে। মহেন্দ্রলালের জন্ম তৎকালীন বাংলার হাওড়া জেলার পাইকপাড়া গ্রামে। মা অঘোরমণি ও বাবা তারকনাথ সরকারের দুই পুত্র ও এক কন্যার মধ্যে মহেন্দ্রলাল ছিলেন জ্যেষ্ঠ। মহেন্দ্রলালের প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় পাইকপাড়ার একটি পাঠশালায়। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পরিবার। মহেন্দ্রলাল ও তাঁর ভাইয়ের প্রতিপালনের জন্য তাঁদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় কলকাতার নেবুতলায়, মামার বাড়িতে। মহেন্দ্রলাল ১৮৪১ সালে হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। উচ্চশিক্ষার জন্য ১৮৪৯ সালে জুনিয়র-স্কলারশিপ নিয়ে তিনি হিন্দু কলেজে পঠনপাঠন শুরু করেন। সেখানেই তাঁর প্রাথমিক জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষালাভ ঘটে। হিন্দু কলেজে পড়াকালীন তাঁর বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হলেও, সে সময় ওই প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো ও শিক্ষক এতটা পর্যাপ্ত ছিল না যা মহেন্দ্রলালের উচ্চতর জ্ঞানার্জনের স্পৃহাকে ইন্ধন জোগাতে পারে।

১৮৫৪ সালের গোড়ার দিকে মহেন্দ্রলাল কলিকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন। হিন্দু কলেজের অঙ্কের প্রফেসর স্যাটক্লিফ এবং দর্শনের প্রফেসর জোন্স তাঁকে আরও অন্তত এক বছর ওই কলেজে বৃত্তিসহ পড়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু একরোখা মহেন্দ্রলাল সিনিয়র-স্কলারশিপের মোহ ত্যাগ করে মেডিকেল কলেজে ঢোকাই স্থির করেন। ইত্যবসরে হিন্দু কলেজ রূপান্তরিত হয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজে। ১৯৫৪-তে শুরু হল মহেন্দ্রলালের ডাক্তারির পাঠ। এতটাই মেধাবী ছিলেন তিনি, ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কলিকাতা মেডিকেল কলেজে তখন রসায়ন, জীববিদ্যা, শারীরবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা প্রভৃতি বিষয় পড়ানো হত। প্রসঙ্গত, ১৮৩৬ সালের ১০ জানুয়ারি ডাক্তার মধুসূদন গুপ্ত প্রথম ভারতীয় হিসাবে চারজন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে শবের ব্যবচ্ছেদ (ডিসেকশন) চালু করেন। বিজ্ঞানমনস্ক মহেন্দ্রলালকে এই বিষয়টিও ডাক্তারি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। ১৮৫৫ সালে ছাত্রাবস্থায় তাঁর বিয়ে হয়। মহেন্দ্রলাল ছিলেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় এম.ডি চিকিৎসক যিনি সাফল্যের সঙ্গে স্নাতকোত্তর পাশ করেন ১৮৬৩-তে।

মহেন্দ্রলালের সময়কালে কলকাতায় আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসার প্রাধান্য ছিল। গঙ্গাপ্রসাদ সেন প্রভৃতি লব্ধপ্রতিষ্ঠিত কবিরাজরা কেবল কলকাতাতেই নয়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও ডাক পেতেন চিকিৎসার জন্য। সেইসঙ্গে চলছিল ইউনানি চিকিৎসা, যদিও বাংলার হিন্দু সমাজে তার জনপ্রিয়তা ছিল অনেকাংশে কম। উনিশ শতকের শুরু থেকেই ভারতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার রেওয়াজ ঢুকে পড়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়, যদিও চারের দশকের আগে এই মেডিকেল সিস্টেম তেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি সাধারণ বঙ্গসমাজে। ১৮৩৯ সালে হোমিওপ্যাথ ডাক্তার হানিবার্জার, মহারাজ রণজিৎ সিং-এর দুরারোগ্য ব্যাধি সারিয়ে তোলেন। সে খবর এসে পৌঁছয় কলকাতার বিদগ্ধ মহলে। ওয়েলিংটন স্কোয়ারের উচ্চবিত্ত পরিবারের বাবু রাজেন্দ্রলাল দত্ত হোমিওপ্যাথির পৃষ্ঠপোষক হন এবং প্রখ্যাত হোমিও চিকিৎসক ডাক্তার টোনিয়ারকে কলকাতায় একটি হোমিওপ্যাথি হাসপাতাল তৈরি করতে চার লক্ষ টাকা দেন। এরপর রাজেন্দ্রলাল স্বয়ং কলিকাতা মেডিকেল কলেজে দু’বছর অ্যালোপ্যাথি পড়েন এবং সমান্তরালভাবে শিখতে থাকেন হোমিওপ্যাথ চিকিৎসাও। তাঁর বিশিষ্ট রোগীদের মধ্যে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেব প্রমুখ। রাজেন্দ্রলাল পরবর্তীকালে শ্রীরামকৃষ্ণের চিকিৎসা করতে এগিয়ে এলে মহেন্দ্রলাল সানন্দে সম্মতি জানিয়েছিলেন। বঙ্গদেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্রচলনের ব্যাপারে রাজেন্দ্রবাবুর ভূমিকা অপরিসীম। অন্যদিকে, উনবিংশ শতকে যেসব ব্রিটিশ সেনা ও নাগরিকরা কলকাতায় ছিলেন, তাঁরা নিজেদের চিকিৎসার দায়িত্ব এ দেশের কবিরাজ ও হাকিমদের ওপর ছেড়ে দিতে চাননি। ফলত, পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিদ্যার প্রচলন এবং ব্রিটিশ ডাক্তারদের প্রশিক্ষণে এখানকার কিছু শিক্ষিত মানুষকে অ্যালোপ্যাথ চিকিৎসার প্রাথমিক পাঠ পড়িয়ে তাঁদের ‘নেটিভ ডক্টর’ উপাধি দান শুরু হয়। এই ব্যবস্থার সুফল পেতে আরম্ভ করলে প্রথাগতভাবে ডাক্তারি শেখানোর জন্য ব্রিটিশরা প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করলেন মেডিকেল স্কুল।

ডাক্তার সরকার প্র্যাকটিস শুরু করার কিছুদিন পর ১৮৬৩ সালে ‘ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’-এর বঙ্গীয় শাখার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাপদ্ধতিকে ‘হাতুড়ে চিকিৎসা’ বলে কটাক্ষ করেন। মহেন্দ্রলাল ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। মহেন্দ্রলালের অ্যালোপ্যাথি থেকে হোমিওপ্যাথিতে ঢুকে পড়া এক অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক ঘটনা। এই মত পরিবর্তনের ব্যাখ্যা তিনি নিজেই করে গিয়েছিলেন তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘ক্যালকাটা জার্নাল অব মেডিসিন’-এ। ১৯০২ সালের জুলাই সংখ্যায় তিনি লেখেন: ডাক্তার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর পরিচিত এক ব্যক্তি ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড’ নামক একটি পত্রিকার জন্য ডাক্তার মরগ্যানের লেখা ‘ফিলোজফি অব হোমিওপ্যাথি’ বইটির সমালোচনা লিখতে অনুরোধ করেন। ডাক্তার সরকার ভাবেন, হোমিওপ্যাথির মুণ্ডপাত করার এই এক সুবর্ণসুযোগ। কিন্তু বইটি পড়তে পড়তে ক্রমশ তাঁর দৃষ্টি উন্মোচিত হতে থাকে এবং সমালোচনা লেখার সময় তিনি স্বীকার করেন, হোমিওপ্যাথ মেডিকেল সিস্টেম সম্পর্কে এতদিন কিছু না জেনেই তিনি অন্ধের মতো বিরুদ্ধ-মত পোষণ করে গেছেন। এই ঘটনার পর মহেন্দ্রলাল রাজেন্দ্রবাবুর সান্নিধ্যে থেকে হোমিওপ্যাথ চিকিৎসার ফল প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেন। কয়েকটি হোমিওপ্যাথি ওষুধ তিনি নিজে তৈরি করে রোগীদের ওপর প্রয়োগ করেন ও তার ফলাফল লিপিবদ্ধ করেন। ১৮৬৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের চতুর্থ বার্ষিক সভায় তাঁর বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল: ‘On the supposed uncertainty in medical sciences and the relationship between diseases and their remedial agents’. এতে তিনি হোমিওপ্যাথির মূলনীতির অনুকূলে মতপ্রকাশ করেন। ফলস্বরূপ বহিস্কৃত হন ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন থেকে। তাঁর বন্ধুবান্ধব, প্রাক্তন শিক্ষক ঠাকুরদাস দে সকলেই, অ্যালোপ্যাথ প্র্যাকটিস ছেড়ে হোমিওপ্যাথিতে মনোনিবেশ করার ‘হঠকারী সিদ্ধান্ত’ থেকে তাঁকে বেরিয়ে আসতে পরামর্শ দেন। কিন্তু ডাক্তার সরকার বরাবর নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল। যে শাস্ত্রে তিনি ‘জনকল্যাণের বীজ’ দেখেছেন, তার প্রচার ও প্রসারের জন্য তিনি ১৮৬৮ সালে নিজের পত্রিকা শুরু করেন যার নাম দেন ‘ক্যালকাটা জার্নাল অব মেডিসিন’। কেননা ব্রিটিশচালিত পত্রিকা ‘ইন্ডিয়ান মেডিকেল গেজেট’-এ হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে লেখালিখি করার সুযোগ ছিল না। ডাক্তার সরকার তাঁর পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ‘Our Creed’ রচনায় লেখেন, “যেমন ধর্মের মধ্যে বিভিন্নধরণের বিশ্বাস বর্তমান, চিকিৎসাশাস্ত্রেও সেইরকম। কোনও একধরণের চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এই বিভেদকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যেমনটা ঠিক ধর্মের ক্ষেত্রেও ঘটে।”

জনমানসে বিজ্ঞানমনস্কতা ছড়িয়ে দিতে আদ্যন্ত বিজ্ঞানচর্চায় ডুবে থাকা যে চিকিৎসক ১৮৭৬-এর ২৯ জুলাই ভারতীয় বিজ্ঞান সভার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্স’-এর আজীবন সম্পাদক পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, সেই মহেন্দ্র ডাক্তারকেই ১৮৭৮-এর এপ্রিল মাসের মিটিং-এ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিজ্ঞান সমিতি’ সেনেটের সদস্যপদ থেকে বিতাড়িত করতে উদ্যত হয়। বিরক্ত মহেন্দ্রলাল নিজেই ভাইস-চ্যান্সেলরকে দুটি চিঠি লিখে পদত্যাগ করেন। চিঠি দুটিতে ঔষধের জনক হিপোক্রেটিস এবং বিভিন্ন বিদেশি চিকিৎসক দ্বারা সমর্থিত ভিন্ন ধারার চিকিৎসা-দর্শন বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা করেন। ডাক্তার সরকার এও লেখেন, “হ্যানিম্যান বিশ্বাস করেন যে রোগমুক্তির একটিমাত্র পথ, অন্য পথ নাই – তা কিন্তু ঠিক নয়। বিভিন্ন পথে রোগমুক্তি ঘটে। তদেব যুক্তং ভৈষজ্যং যদারোগ্যায় কল্পতে/ স চৈব ভিষজাং শ্রেষ্ঠী রোগেভ্যঃ যঃ প্রমোচয়েৎ (চরক সংহিত)। অর্থাৎ সেই সমস্ত ওষুধই ঠিক যা রোগ দূর করে, সে-ই শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক যে রোগমুক্তি ঘটাতে পারে। হ্যানিম্যানের যে অভিমত, একমাত্র সদৃশনীতিতেই রোগ সারে, তা বললে সেই নীতিরই কদর্থ করা হয় এবং যুক্তি অবহেলিত হয়…।” জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে মহেন্দ্রলালের ঈশ্বর চেতনা, সঙ্গীত অনুরাগ ইত্যাদি নানান ঘটমানতা সত্বেও, তাঁর বিজ্ঞানপ্রীতি ও চিকিৎসার পরিসরে আদর্শগত ঔদার্য থেকে তাঁকে কখনও বিচলিত হতে দেখা যায়নি।

Developed by DXDasia