ব্রতচারী বাঙালির লাগে সম্পূর্ণ নিজের মতো একটা দিনলিপি। পোপ গ্রেগোরির দিনলিপি তার চলে না
বাংলার নববর্ষ। বাঙালির নববর্ষ। দোকানে দোকানে হালখাতা। গণেশ পুজো। গণেশ বাবুটি সেজে পায়ের উপর পা তুলে বেশ আরাম করে লিখতে বসেছেন। দোকানকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা হয়। দোকান বলতে শুধু মহাজনের দোকানেই নয়, বৈশাখের পয়লা দিনেই বাঙালির জীবনের হাল-খাতা খোলা হয়।
ব্রতচারী বাঙালির লাগে সম্পূর্ণ নিজের মতো একটা দিনলিপি। পোপ গ্রেগোরির দিনলিপি তার চলে না। তাই হুসেন শাহী জমানার আল্লাউদ্দিন হুসেন শাহীর আমলে মানে পনেরো শতকে বাঙালির নিজের ক্যালেন্ডার চর্চা শুরু হল। ওই প্রথম ইসলামিক দিনলিপির চন্দ্র গণনার নিয়ম কানুনের সঙ্গে সংস্কৃত পণ্ডিতদের সূর্য গণনার নিয়ম-কানুন মিশিয়ে তৈরি হল বাঙালির নিজের মতো একটি ক্যালেন্ডার। তাতে একদিকে রইল চাঁদ দেখার হিসেব-নিকেশ আর একই সঙ্গে রইল সূর্যের গতি-গ্রহণের নানা হিসেব। মাটির বাড়ির দেওয়ালের গায়ে আঁচড় কেটে বাড়ির কর্তা অমন দিন-লিপি আঁকিয়ে রাখতেন বছরের প্রথম দিনে। তাতে লাল সিঁদুরের সূর্য হল পূর্ণ সূর্য, আর কাজল কালির সূর্য হল রাহু ঢাকা সূর্য। তখনই বাংলার লোককাব্যে যুক্ত হল একে চন্দ্র, দুয়ে পক্ষ, ছয়ে ঋতু, নয়ে নবগ্রহ শব্দগুলি। বলতে গেলে ছায়া দণ্ডে সূর্যের আলো আর ছায়ার বাড়া-কমা দেখে দিন হিসেবের জন্য বাঙালির হাতে এলো আঁকা লেখা যুক্ত দিনলিপি বা ক্যালেন্ডার।
আকবর বাদশার আমলে আরেকবার বাঙালি পেয়েছিল বাংলার উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বাদশাহি ক্যালেন্ডার। তার কারণ ছিল অবশ্য ভিন্ন। বাংলার জমি থেকে কর আদায়ের দিনক্ষণ ঠিক করার জন্যে এমন বাংলা ক্যালেন্ডার তৈরির প্রকল্প নিয়েছিলেন আকবর। সেই ক্যালেন্ডারের নাম ছিল তারিখ-ই-ইলাহি। মাস, তারিখ, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদির নামে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার করার পাশাপাশি ইসলামি নামক্ষণও রাখা হয়েছিল সেখানে। আকবর বাদশার রাজকীয় গ্রহবিদ ফতুল্লাহ সিরাজি নির্মাণ করেছিলেন এমন বাংলা ক্যালেন্ডার।
দেখতে দেখতে নতুন যুগ আসে। বাংলা ক্যালেন্ডারে আসে হরেক প্রকার রূপ বদল। আবার কিছু বিষয় অপরিবর্তিত থেকে যায়। যেমন ছটি ঋতু রইল দিনলিপিতে, প্রত্যেক ঋতুর জন্য ধার্য হল দুটো করে মাস। আবার প্রত্যেক মাস নামাঙ্কিত হল একেকটি নক্ষত্রের নামে। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের নামে হল বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নামে হল জ্যৈষ্ঠ, উত্তরআষাঢ় নক্ষত্র থেকে এলো আষাঢ়, শ্রবণা থেকে এলো শ্রাবণ ইত্যাদি। পাশাপাশি নবগ্রহ থেকে সাতজনকে বাছাই করে নেওয়া হল সাতটি দিনের জন্য। সব মিলিয়ে ফসল ফলানোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে ঋতু মাসের হিসেব ধার্য করা হল। ধরা যাক, সেকালের নিয়ম মেনে আজকের ১৪২৫ লিখতে হচ্ছে। তাহলে ব্যাপারটা হত ‘পঞ্চবাণ পক্ষ বেদ চন্দ্র বৎসর’। নিয়ম হল উল্টো দিক থেকে হিসেব করে নেওয়ার। উল্টো দিক থেকে পড়লে দাঁড়ায় একে চন্দ্র মানে ১, চারে বেদ মানে ৪, দুয়ে পক্ষ মানে ২, আবার পাঁচে পঞ্চবাণ মানে ৫। এই নিয়ম চলেছে দীর্ঘদিন।
স্বদেশী যুগে দেশি নেতাদের ও মনিষীদের নাম আর জন্মদিন দেওয়ার প্রথা চালু হয়। কলের ছাপা খানায় রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, নজরুল, রামকৃষ্ণ, স্বামীজির নাম ও ছবি যুক্ত হতে থাকে। রাহু-কেতু- গ্রহণ নির্ভর ক্যালেন্ডারে বাঙালি যুক্ত করল তাদের স্বদেশ নেতাদের প্রতি প্রণাম। পঞ্জিকার অফিস থেকেই প্রকাশ পেত এমন তারিখ যুক্ত ক্যালেন্ডার। এরসঙ্গে বারো মাসে তেরো পার্বণের নানা হিসেব। তার পর যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আসে রঙিন ছবি। হালখাতার দোকানদার নিজের নাম দিয়ে ক্যালেন্ডার প্রকাশ করতে থাকে। সেই চল আজও চলছে।