খেলার জগতে বাঙালি মুসলমান

জনপ্রিয় খেলার চাপে হারিয়ে যাচ্ছে মাইনর গেমগুলো

খেলার জগতে বাঙালি মুসলমানের সংখ্যা কমে যাচ্ছে দিনের পর দিন। অ্যাথলেটিক, সাঁতার, ফুটবল, কবাডিতে একসময় বাঙালি মুসলমান অংশ নিতে শুরু করেছিল। ক্রিকেটে সেভাবে অংশ নিতে দেখা যায়নি। এর মূল কারণ ছিল অর্থ। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে হকিতে বেশ কয়েকজন এসেছিল। এই সময়ে বারুইপুর থেকে বেশ কয়েকজন মেয়েও এসেছিল হকি খেলতে। রেশমা খাতুন নামের এক নবম শ্রেণির পড়ুয়া বাংলার হকি দলে বেশ নাম করেছিল। রেশমা ছিল রাজ্য হকি দলের গোল কিপার। এই প্রথম কোনো বাঙালি মুসলমান মেয়ে রাজ্য দলে আসায় সাড়া পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু রেশমার বেশিদূর আর যাওয়া  হয়নি।রক্ষণশীল পরিবার থেকে এসেছিল। মৌলানা সাহেবের পরিবার। মেয়ে কলকাতার মাঠে খেলতে যাচ্ছে এটা পরিবারের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। রেশমার আর বেশিদিন ময়দানে থাকা হয়নি। দুবছরের মধ্যে বিয়ে হয়ে গেল তার।

সাঁতারে একঝাঁক ছেলে-মেয়ে এসেছিল। বেশিরভাগ এসেছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে। ক্যানিং, হোটর, জয়নগর, মগরাহাট থেকে এসেছিল এরা। চাকরিও পেয়েছিল নূরহোসেন ঢালিরা। রেলে। ফুটবলে এসেছিল বহু ছেলেমেয়ে। কলকাতার ফুটবলে তখন পঞ্চম ডিভিশনে খেলছে বহু ক্ষুদে। উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হুগলি, হাওড়া থেকেই এরা এসেছিল। কবাডিতে আসত নদিয়ার ছেলেমেয়েরা। আনজের আলির নাম আমরা সবাই জানি এশিয়াডে ভারতের অধিনায়ক ছিলেন। সেবার ভারত এশিয়াডে চাম্পিয়ন হয়েছিল।

একদল এসেছিল অ্যাথলেটিক্সে। সাকিলা খাতুন, আনসার আলিরা এসেছিল বসিরহাটের এক গ্রাম থেকে। ভোরে উঠে কলকাতার মাঠে আসত। রাজ্য স্তরে তিন/চার দিন খেলা থাকলে কোথায় থাকবে সেটাই ঠিক ছিল না। তবুও এরা লড়াই ছাড়েনি। সকালে এসেছে। খেলেছে। বাড়ি ফিরে গেছে। পরদিন ভোরে আবার এসেছে কলকাতায়। একসময় এদের অনেকেই চাকরিও পেয়েছে। যে জিমন্যাসটিকসে আসতে ভয় পেত বাঙালি, মুসলমান মেয়েরা সেখানেও এসেছিল। নার্গিস বেগম। পরবর্তীকালে তিনি স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার কোচ হয়েছিলেন।

ফুটবলে মুর্শেদ আলি, নাজমুল হক সর্বোপরি মইদুল ইসলামের কথা এখনও মানুষের মুখে-মুখে। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়েও ময়দানে মহামেডান ক্লাব, মুসলিম ইনস্টিটিউটরা মাঠে ঘুরত প্রতিশ্রুতিমান মুসলমান খেলোয়াড়ের খোঁজে। মইদুল নিজে কোচিং করাতেন। ফুটবল ছাড়ার মাত্র কয়েকটা বছর কোচিং করিয়েছেন মুর্শেদ আলি। চাকরি পর। তারপর ব্যক্তিগত কাজে তিনি এতটাই ব্যস্ত যে ফুটবল নিয়ে ভাববার সময় পান না। নাজমুল একসময় বাংলার ফুটবলে স্ট্রাইকারের খরা কাটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক কারণে হারিয়ে গেলেন। এখন কিছুটা আখড়া, বজবজ বাঙালি মুসলমান ছেলে দেয় কলকাতার ফুটবলে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই দশা কেন?  কেনইবা বাঙালি মুসলমান মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে খেলার জগত থেকে। গত দশ বছর খেলার জগত থেকে কার্যত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বাঙালি মুসলমান।  যে কবাডি একসময় খেলা হত বাংলার পাড়ায় পাড়ায়, যেখান থেকে আনজের আলিদের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পা রাখা, তা এখন আর নেই। যে অ্যাথলেটিক কোচ এক সময় ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতেন, পাড়ার মাঠে তালিম দিতেন, তাঁদের হাতে তৈরি ছেলেমেয়েরা চাকরি পেয়েছেন, কিন্তু তাঁদের কিছু হয়নি। বাংলার ঘরে ঘরে এমন বহু কোচ রয়েছেন যারা পরবর্তীকালে খেতে পাননি। একটা সময় সাকিলা খাতুনরা দৌড়ানোর জন্য স্টার্টিং বোর্ড জোগাড় করতে পারতেন না টাকার অভাবে। কাঠের বোর্ড হয়তো প্রথম দেখেছেন রাজ্য স্তরের প্রতিযোগিতায় এসে। তখন স্পনসর জোগাড় করা যেত না। আর এখন টাকার অভাব নেই। তবুও খেলায় বাঙালি মুসলমান নেই। আগে ১০/১২জন  খেলোয়াড় পাওয়া যেত ছোট খেলাগুলোতে। এখন ১ শতাংশও পাওয়া যায় না। মহম্মদ কাইফরা যখন খেলছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তখন তাদের দেখাদেখি কিছু উঠতি পয়সাওয়ালা পরিবারের ছেলে এসেছিল কলকাতার ময়দানে ক্রিকেট খেলতে। গত পাঁচ বছরে তারাও হারিয়ে গেছে। সাঁতারে নূরহোসেন ঢালিরা এখন আর কোচিং করান না। পাড়ার ক্লাবে এখন আর কোচিং হয় না। তা বলে পাড়ার মাঠে কি খেলা হয় না? হয়। ফুটবল হয়, ক্রিকেট হয়, মাইনর গেম হয় না। একসময় গ্রামের পুকুরে সাঁতার শিখত ছেলেমেয়েরা, কোনটা ফ্রি স্টাইল কোনটা বাটার ফ্লাই এসব না জেনেই। সেখান থেকে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে। অথচ মাইনর গেমগুলোই একসময় প্রচুর চাকরি দিয়েছে।

এখনও পাড়ায় ফুটবল খেলা হয়। যখন মুর্শেদ আলিরা খেলতেন তখন বিচালি দিয়ে বল তৈরি হত। এখন পাড়ার ক্লাবে বল পাওয়া যায়, সরকারের প্রচেষ্টায় ক্লাবের পরিকাঠামোর উন্নতি হয়েছে। কিন্তু ১২/১৩/১৪ বছর বয়স হলে চলে যাচ্ছে খেপ খেলতে। ফুটবলে খেপ খেললে প্রতি ম্যাচ ২০০ টাকা। ফাইনাল পর্যন্ত চারটে ম্যাচ খেললে ৮০০ টাকা। ফাইনাল খেললে ৫০০ অথবা হাজার। ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হলে দামী স্মার্ট ফোন। এখন আর শিল্ড দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয় না। এখন ফাইনালে থাকে ক্যাশ। পঞ্চাশ/ষাট হাজার টাকা। এরই পিছনে ছুটছে ছোট বয়স থেকে। একটা বারো/তের বছরের ছেলে খেপ খেলেই আয় করছে প্রতিদিন কম করে ২০০ টাকা। ময়দানে এসে সকালে সে অনুশীলন করতে যাবেই বা কেন?  ক্রিকেটেও তাই। জনপ্রিয় খেলাগুলোতে খেপ খেলার প্রবণতা এতটাই যে মাইনর গেমগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। নামী ক্লাবগুলোরও ভাল খেলোয়াড় খোঁজার মানসিকতা নেই। বসিরহাটের ঘ্যাসদা আর তৈরি হয়নি, মিহির বসু, অলোক দাসদের যিনি তৈরি করেছিলেন শুধু ফুটবলকে ভালবেসে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, চাকরি। অতীতে খোলায়াড়দের চাকরি দিত রেল, পোর্ট ট্রাস্ট, ব্যাঙ্ক, এফসিআই। দু-একটা রাজ্য সরকারি সংস্থাতেও চাকরি হয়েছে, খেলার মান উন্নয়নের জন্যই সরকার আর্থিক সাহায্য করছে। কিন্তু ক্রীড়াদরদি সেই মানুষগুলোর আজ বড়ই অভাব পাড়ার ক্লাবে। মইদুল ইসলাম, নাজমুল হকরা বলছিলেন, বাঙালি মুসলমান খেলার দুনিয়ায় এলে অনেক সামাজিক সমস্যার সমাধান হত।

Developed by DXDasia