বঙ্কিম ঘটনাবলী

‘এইসবই এই মহিলার পায়ে সমর্পণ করেছি। তবু তার মন পাইনি’

(১)
বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ছিলেন অতি সুন্দরী। বঙ্কিমচন্দ্র একবার তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে করে চলেছেন। স্ত্রীর মুখ ঘোমটায় ঢাকা। খানিকক্ষণ পর বঙ্কিমচন্দ্র দেখলেন একটি যুবক বারবার আড়চোখে ঘোমটায় ঢাকা তাঁর স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। বঙ্কিমচন্দ্র তো এই ঘটনায় বেশ মজা পেলেন। তিনি যুবকটিকে কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘কি কাজ করা হয়?' যুবকটি এ প্রশ্নে ঘাবড়ে গিয়ে বলল ‘কেরানীর চাকরি করি।’

বঙ্কিম বললেন ‘কত মাইনে পাও?’ যুবকটি বলল ‘বত্রিশ টাকা।’ বঙ্কিমচন্দ্র তখন বললেন ‘তুমি যে এই মহিলার দিকে বার বার আড়চোখে তাকাচ্ছ, তা আমি এর ঘোমটা খুলে দিচ্ছি। ভালো করে দেখে নাও। আর এও শুনে রাখ। আমি একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। আমার মাইনে আটশো টাকা। এছাড়া বই পত্র লিখেও ভাল রোজগার হয়। সব মিলিয়ে মাসিক আয় হাজার দেড়েক। এইসবই এই মহিলার পায়ে সমর্পণ করেছি। তবু তার মন পাইনি। আর তুমি সেখানে মাত্র বত্রিশ টাকার কেরানী হয়ে এর মন পেতে চাও? যুবকটি খুব লজ্জা পেয়ে পরের স্টেশনেই অন্য কামরাতে চলে যায়।

(২)
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও অধর সেন দুজনেই ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। অধর সেনের বেনিয়াটোলার বাড়িতে একবার রামকৃষ্ণ পরমহংস বেড়াতে এসেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের খুব ইচ্ছা একদিন রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে আলাপ করবেন। বন্ধু অধর সেনের বাড়িতে রামকৃষ্ণ আসাতে বঙ্কিমচন্দ্র গেলেন দেখা করতে। অধর সেন বঙ্কিমচন্দ্রকে রামকৃষ্ণের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন ‘ইনি সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিম চাটুজ্জে। অনেক বই লিখেছেন। উনি আপনাকে দর্শন করতে এসেছেন।’ রামকৃষ্ণ ছিলেন সহজ সরল মানুষ। এক লহমায় মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। তিনি একটু হেসে বঙ্কিমচন্দ্রকে বললেন ‘বঙ্কিম, কার হাতে পড়ে তুমি বেঁকলে গা?’ বঙ্কিমচন্দ্র হেসে বললেন ‘আজ্ঞে হাতে নয়, বেঁকেছি ইংরেজের বুটের ঠোক্করে।’

(৩)
বঙ্কিমচন্দ্রের কাঁঠালপাড়ার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন দীনবন্ধু মিত্র। বয়সের তফাৎ থাকলেও দুজনের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা চলত। ঠাট্টা করে বঙ্কিমচন্দ্র একদিন একটা ছোট্ট কাগজে কী একটা লিখে দীনবন্ধুর অজান্তে তাঁর জামার পেছনে লাগিয়ে দিলেন। সেই লেখা পড়ে সবাই তো মুখ টিপে টিপে হাসছে। দীনবন্ধু ভাবলেন, কী ব্যাপার! সবাই তাঁর পিঠের দিকে তাকিয়ে হাসছে কেন? বুঝলেন নিশ্চয়ই বঙ্কিমচন্দ্র কিছু কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তিনি একটুও না দমে বঙ্কিমচন্দ্রের ভাই পূর্ণচন্দ্রকে ডেকে বললেন ‘আমার পিঠে কী আছে একটু বলে দাও না ভাই। কারণ হাতির পিঠে মশা মাছি বসলে সে তো আর নিজে দেখতে পায় না। তার কপালটাই মন্দ।’ বঙ্কিমচন্দ্রও ছেড়ে দেবার পাত্র নন। বললেন, ‘দেখতে পায় না বলে তেমন জীবকে লোকে হস্তিমূর্খ বলে।’

Developed by DXDasia