হাঁড়ি বুকে করে কিশোর কামদেব যমুনা পার হয়েছিলেন

দিদি চম্পাবতি বিয়ে করেছিলেন পীর মোবারক বড়খাঁ গাজীকে। বড়খাঁ গাজীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন বাবা মুকুট রায়। কিশোর কামদেব, বড়খাঁর অলৌকিক ক্ষমতায় মু্গ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ঠাকুরবর পীর নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তৎকালীন পূ্র্ব পাকিস্তানের যশোহর জেলার ঝিনাইদহের লাউজানির রাজা ছিলেন মুকুট রায়। পীর বড়খাঁ গাজীর সঙ্গে তাঁর ধর্মযু্দ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন রাজা। এই বড়খাঁ হলেন ঘুটিয়ারি শরিফের পীর মোবারক শাহ। মুকুট রায়ের দুই সন্তান ছিলেন চম্পাবতি আর কামদেব। যুদ্ধ জয়ের পর স্ত্রী চম্পাবতি আর শ্যালক কামদেবকে নিয়ে সাতক্ষীরার লাবসা গ্রামে আসেন বড়খাঁ পীর। সেখান থেকে দিদি – জামাইবাবুর সঙ্গ ত্যাগ করে খুলনা সীমান্ত দিয়ে কামদেব চলে আসেন স্বরূপনগরের গাবর্ডা গ্রামে। আর চম্পাবতি নিয়ে বড়খাঁ গাজী যান সুন্দরবন এলাকায়। এই দীর্ঘ পথ আসতে কামদেবকে পার হতে হয়েছিল সোনাই, ইছামতি আর যমুনা নদী। হাঁড়ি বুকে করে কিশোর কামদেব যমুনা পার হয়েছিলেন। যেখান দিয়ে তিনি যমুনা পার হয়ে ছিলেন আজও তার নাম হেঁড়ের ঘাট। যমুনা নদীর পাশেই চারঘাট গ্রাম। চারঘাটের একপাশে ছিল বাওড়। তারই একধারে কামদেব আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনি অলৌকিক ক্ষমতা দেখাতে থাকেন।

কথিত আছে পীর ঠাকুরবর সাহেবের সঙ্গী ছিল এক বাঘ। তখন এই এলাকা ছিল জঙ্গলে ভরা। চারঘাটের পাশে কাচদহ গ্রাম। গ্রামেরই রাখাল বালক ছিল হরি। পীরের অলৌকিক ক্ষমতায় আকৃষ্ট হয়ে হরি সবসময় তাঁর কাছেই থাকতেন। পীর মনে করেছিলেন, হরির ধন -সম্পত্তি হলে একদিন সুফিবাদ ও ইসলামের প্রচার করবে। রাখাল বালক হরি পীরের কৃপায় তাই বণিক হয়ে উঠলেন। তাঁর পণ্যডিঙা হল। কিন্তু দেখা গেল, ধনবান হয়ে ঠাকুরবর সাহেবের সুফিবাদ প্রচারে বিরোধিতা করতে শুরু করলেন তিনি। রুষ্ট হলেন পীর। অভিশাপে যমুনার জলে হরির পণ্যবাহী নৌকা তলিয়ে গেল। বেশ কিছুদিন আগে চারঘাটে কাচদহের কাছে মাটি খুঁড়তে গিয়ে তামার পাতের নৌকার ভগ্নাবশেষ পাওয়া যায়। তা সংরক্ষণ করা হয়নি, স্থানীয় মানুষরা তা সংগ্রহ করে ফেরিওয়ালার কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। মানুষের ধারণা এ আসলে হরির পণ্যবাহী নৌকা। একদিন সব হারিয়ে যমুনার জলে সপরিবারে আত্মহত্যা করেছিলেন ধনপতি হরি। আজও যমুনার এইস্থানকে সবাই বলেন "হরির দহ"।

কাচদহে হরির ভিটে আজও রয়েছে, কিন্তু ফাঁকা জমি। সেখানে ঘর বাঁধেন না কেউ। পীর ঠাকুরবর যখন চারঘাটে এসেছিলেন তখন যশোহরের রাজা ছিলেন প্রতাপাদিত্য। পীর সাহেবের কাছে প্রায়ই আসতেন তিনি। খাটুরার ইতিহাস আর কুশদহর ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে, প্রতাপাদিত্য, ঠাকুরবর সাহেবের কাছে আসার পথ সহজ করতে একমাসে একটা খাল কাটিয়ে ছিলেন। চারঘাটের দরগার পাশ দিয়ে বাদুড়িয়ার কাকড়াসুতি পর্যন্ত এই খাল ইছামতিতে মিশেছে, স্থানীয়রা একে বলেন "মাস কাটার খাল"।

গোবরডাঙার জমিদার জ্ঞানদাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় প্রায়ই আসতেন ঠাকুরবর পীরের কাছে। তাঁর প্রতি ভক্তি দেখাতে সম্পত্তিও দান করেছিলেন। শোনা যায়, জমিদার আসতেন হাতির পিঠে চড়ে। কিন্তু হাতি কখনও পীরের আস্তানায় আনতেন না। যমুনা নদীর ধারে হাতি রেখে কয়েক মাইল পথ আসতেন হেঁটে। ঠাকুরবরের সঙ্গে কথা বলে তাঁর দোওয়া নিয়ে তারপর বের হতেন নিজের কাজে।

তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা আজও এই এলাকায় মানুষের মুখে মুখে। ফুরফুরা শরিফের পীর আবু বক্কর সিদ্দিকী যখনই এই এলাকায় আসতেন, পীর ঠাকুরবরের রওজায় এসে জিয়ারত করে যেতেন। তাঁর রওজায় হিন্দু-মুসলমান এসে শিরনি দিয়ে যান। মানত করেন। দোওয়া চান। গ্রামে কোনো আচার-অনু্ষ্ঠান হলে, বিয়ে হলে, বাড়িতে নতুন বৌমা এলে, জন্ম-মৃত্যু হলে, নতুন ফসল বুনতে হলে পীরের রওজায় এসে দোওয়া করে যান স্থানীয় মানুষ। এটাই রীতি। কয়েক বছর আগেও এখানে উরুস হত। মেলা বসত। এখন মাঝে মাঝে কয়েকজন আসেন। কিন্তু জমকালো উরুস উৎসব আর হয় না। মেদিনীপুরের আবুল হোসেন স্বপ্ন পেয়ে চারঘাটে এসেছিলেন পীরের খেদমত করতে। হিন্দু অধ্যুষিত এই গ্রামের মাজারে তাঁরাই এখনও ধূপ-ধুনো দেন। এখানে একসময় ছিল অতিথি থাকার ঘর। দূর থেকে যাঁরা আসতেন, রাত কাটাতেন। এখন আর সেসব নেই। জবরদখল হয়ে গেছে। অবিবাহিত ছিলেন ঠাকুরসাহেব। ফলে আবুল হোসেনের পরিবারই দরগা দেখভাল করেন।

১৬শ সালের প্রথম দিকে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে মনে করেন ইতিহাসবিদরা। পীর ঠাকুরবর ছিলেন এক জবরদস্ত আলেম। স্বরূপনগরে কৈজুড়ি -গাবর্ডা বলে এক গ্রাম রয়েছে।খুলনা থেকে চারঘাটে আসার আগে কিশোর পীর ঠাকুরবর দু'দণ্ড বিশ্রাম নিয়েছিলেন এখানে। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসায় জল পিপাসা পেয়েছিল তাঁর। গাবর্ডার কোনো হিন্দু পরিবার মুসলমান পীরকে জল দিতে চান নি বলে কথিত আছে। গ্রামে কোনো মুসলমান পরিবার আছে কিনা জানতে চেয়েছিলেন তিনি। গ্রামের মানুষ তাঁকে না বলায় রুষ্ট হয়ে পীর সাহেব নাকি বলেছিলেন, ভবিষ্যতেও কোনোদিন এ গ্রামে মুসলমানের বাস হবে না। আজও তাই গাবর্ডা গ্রামে মুসলমান বাস করেন না। গ্রামের বাসিন্দা সুনীল বিশ্বাস বলছিলেন, কোনো মুসলমান পরিবারের জমিও নেই গ্রামে। পীরের প্রতি ভক্তি ও ভয়ে আজও কোনো মুসলমান পরিবার এই গ্রামে বাড়ি তৈরি করেন না, জমিও কেনেন না।

চারঘাট এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম। পূবদিকে ইছামতি, উত্তরে বাওড়, পশ্চিমে যমুনা। মরা যমুনায় এখন আর জোয়ার ভাটা খেলে না। তবে ইছামতি আর যমুনা যেখানে মিলেছে, সেখানে তৈরি হয়েছে চর। ২০০৯ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত চরে তৈরি করেছিলেন পার্ক। ঢিপির চর বলা হয় একে। নদীর বুকে এটা রাজ্যের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। থাকার জায়গাও রয়েছে। দু'দিন ঘুরে আসার পক্ষে আদর্শ স্থান। পীরের রওজা থেকে ৬ কিলোমিটার। ট্রেনে এসে নামতে হবে মছলন্দপুরে। সেখান থেকে চারঘাটে যাওয়ার বাস, ট্রেকার, অটো, টোটো মিলবে। ভাড়া ১০ থেকে ১২ টাকা।

Developed by DXDasia