
বাংলাদেশের মুনসিগঞ্জের অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্ম তাঁর
ধরা যাক, আজকের বাংলাদেশের মুনসিগঞ্জের অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামের এক নগণ্য কৃষক চাষের জমিতে মাটি চষতে চষতে পেয়ে গেলেন একটা কাঠের বাক্স—যার ঢাকনার ওপর আঁকা মুখ হাঁ করে লোলজিহ্বা বের করে থাকা ভয়ংকর একটা মৃত্যুমুখী ড্রাগনের মাথা। ধরা যাক, নানা হাত ঘুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরকিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার অফিসে এসে জমা পড়ল সেই কাঠের বাক্স, ভেতরে আধেক সংস্কৃত আধেক তিব্বতি ভাষায় লেখা জীর্ণ এক তালীপত্রের পুঁথি। কোথা থেকে এল এই পুঁথি? কার লেখা? কী বিষয়? পুঁথিটির পাতার উপর ঝুঁকে পড়ে এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে এক তরুণ বাঙালি গবেষকের হঠাৎ-ই হয়ত মনে হল, আরেঃ! এই বজ্রযোগিনী গ্রামটাই তো অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞানের জন্মভূমি! তবে কি এই পুঁথি বিশ্ববিশ্রুত দার্শনিক পণ্ডিত দীপংকরের রচনা?
হতেই পারে। বাঙালির ঐশ্বর্য অনন্ত, বিস্মৃতিশক্তিও অসীম। বাঙালি একটি জাতীয় অসুখে ভোগে। অসুখটার নাম—অ্যামনেশিয়া—স্মৃতিবিভ্রম। তা না হলে কত সহজেই সে ভুলে যেতে পারে তার সংস্কৃতির আদিতম পুরুষের কথা, ভুলে যেতে পারে আজ থেকে হাজার বছর আগে একাদশ শতকে মগধে যখন পালরাজারা রাজত্ব করছেন, ঠিক তখনই এই বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনীতে চন্দ্রবংশের নৃপতি কল্যাণশ্রীর মধ্যমপুত্র রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ একদিন তাঁর রহস্যময় শৈশবকৈশোর পেরিয়ে চলে গিয়েছিলেন তন্ত্রসাধনার বৃত্তে। বজ্রযানী তন্ত্রের সেই চর্যাগীতিগুঞ্জিত গণচক্রে সুরা ও সাধনসঙ্গিনীসঙ্গে উপবেশন করে তাঁর নাম হয়েছিল ‘গুহ্যজ্ঞানবজ্র’। তারও পর কী জানি কোন অজ্ঞাত কারণে তন্ত্রের সেই পিচ্ছিল পন্থা পরিত্যাগ করে গ্রহণ করেছিলেন বৌদ্ধ শ্রমণের জীবন—শ্রামণ্যদীক্ষার পর তিনি পরিচিত হয়েছিলেন দীপংকর শ্রীজ্ঞান নামে। ওদন্তপুরী বিহারের আচার্য শীলরক্ষিতের কাছে বহু বৎসর পাঠগ্রহণের পর আরও গভীরতর জ্ঞানের সন্ধানে সমুদ্র পার হয়ে জাহাজডুবি থেকে কোনোমতে বেঁচে গিয়ে ভেসে গিয়েছিলেন সুবর্ণদ্বীপে, আজকের সুমাত্রায়। সেখানে আচার্য ধর্মকীর্তির পদপ্রান্তে মহাযানমত শিক্ষা করে দেশে ফিরে এসে বিক্রমশিলা মহাবিহারে প্রথমে অধ্যাপনা ও পরে কালক্রমে বিক্রমশিলার শিক্ষাধ্যক্ষ বা উপাধিবারিক পদে ব্যাপৃত ছিলেন প্রশাসনিক কর্মে।
বাঙালি আরো ভুলে গেছে, পাল বংশের নৃপতি নয়পালের সঙ্গে হৈহয় বংশের কলচুরি কর্ণের ঐতিহাসিক মৈত্রীস্থাপনে কোন বিরাট ভূমিকা নিয়েছিলেন দীপংকর। ভুলে গেছে, অথবা সে জানেই না, একাদশ শতকের তিব্বতের অরুন্তুদ সামাজিক তথা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা। সুদূর হিমালয়ের হিমবর্ষী উপত্যকায় লুক্কায়িত রহস্যময় সেই তিব্বত—যেখানে শত শত বৎসর ধরে রাজা ও অমাত্যবর্গের ভিতর রুদ্ধিরাক্ত ক্ষমতাযুদ্ধ চলেছে। এই অমাত্যবর্গ প্রাচীন বন্ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক, হতদরিদ্র সাধারণ মানুষকে শোষণে শোষণে নিঃশেষিত করে, পৌরোহিত্যের জগদ্দল পাথরের নীচে নিষ্পেষিত করে অমাত্যরা সেখানে বিত্তে ও ক্ষমতার দম্ভে প্রতিদিন তাজা হয়ে উঠছেন। আর তাদের ক্ষমতা হ্রাস করবার জন্যেই কখনও চীন থেকে, কখনও ভারত থেকে সে দেশের রাজা আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসছেন বৌদ্ধ প্রচারকদের। বৌদ্ধধর্ম সেখানে শুধু নীতিবিজ্ঞানের জীবনচর্যাই নয়, বৌদ্ধধর্ম সেখানে রাজার প্রধান রাজবল, তাঁর রাজনৈতিক যুদ্ধের বর্ম, তাঁর সুতীক্ষ্ণ শর ও সুদৃঢ় গাণ্ডীব। সেই প্রেক্ষিতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারত থেকে শান্তরক্ষিত, পদ্মসম্ভব ও কমলশীল তথায় গমন করে নিজেদের জীবন নিবেদন করেছেন সাধারণ মানুষের জীবনধারার মানোন্নয়নে। তবু সেসব প্রচেষ্টা অপশাসনের অন্ধকারে বারবার ডুবে গেছে; অত্যাচারী লঙ্ দরমার মত অমাত্যসেবিত পিশাচতুল্য রাজাধীশদের ক্ষমতায়নে। ভ্রূণহত্যা, ধর্ষণ, সুরাপান ও নরহত্যায় পূজার বেদি ভেসে গেছে রক্তে, আরও গাঢ়তর অন্ধকারে ঢেকে গেছে জনসাধারণের বিপন্ন জীবন। ফলত, শেষবারের মত ডাক এসেছে সেই বদ্ধভূমিতে যাবার, ধ্বংসস্তূপের উপর জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালবার। সেই আহ্বানে বিক্রমশিলার থেকে তিব্বতের পথে একদিন বেরিয়ে পড়েছেন দীপংকর ভারতের প্রায় আঠারোটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষক্ষমতা পরিত্যাগ করে। তখন তাঁর বয়স ঊনষাট বছর। সেই বয়স, যে-বয়সে আজকের বাঙালিরা শর্করা ও উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত হয়ে নিজেদের ভবলীলা সমাপ্তপ্রায় মনে করেন। বিপদসংকুল সুদুর্গম পার্বত্য পন্থায় নেপাল, স্বয়ম্ভুনাথ, মন্ ইয়ুল গুনথান অতিক্রম করে পশ্চিম তিব্বতে থোলিং মনাস্ট্রি, তারও পর মধ্য তিব্বত, পেকারলিং, লাসা ও সামিয়ে বিহারে দীর্ঘ কুড়িটি বছর ধর্মপ্রচার, অধ্যাপনা, অনুবাদ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নিবিষ্ট থেকে বাহাত্তর বছর বয়সে লাসার দক্ষিণে নেথাং বিহারে অনেকের মতে আজকের দিনটিতেই পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন অতীশ, তিব্বতে যিনি ‘জোবোজে’ বা ‘প্রভু’ অভিধায় আজও সসম্মানে পূজিত।
নাহ্, বাঙালি এসব মনে রাখেনি; যদি মনে রাখত, তবে কি আর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের “আমরা” কবিতার দুই ছত্র, দীনেশচন্দ্র সেনের “বৃহৎ বঙ্গ”-এর একটি অধ্যায় আর শিশুতোষ দুয়েকটি বই কিংবা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের “তুমি সন্ধ্যার মেঘ”-এর দুয়েকটি অধ্যায়ে কল্পিত পার্শ্বচরিত্র হিসাবে অতীশ দীপংকরের সামান্য উপস্থিতি ছাড়া বাংলা ভাষায় এমন একটা কালারফুল জীবন নিয়ে আজও অবধি কোনো বাংলা উপন্যাস রচিত হল না?
তবু এরই মধ্যে, দেবদূতরা যেখানে ভয় পান, সেখানেই প্রচলিত প্রবাদ মেনে আমার মতন কোনো কোনো নির্বোধ অন্ধকারের ভিতর লাফ দিয়ে পড়ে। হ্যাঁ, অন্ধকারই বটে! কত সমস্যা অতীশের জীবন নিয়ে। কেন তিনি তন্ত্রসাধনা পরিত্যাগ করলেন? কেন শ্রমণ হয়ে পারমার্থিক ভূমির থেকে অস্বীকার করলেন বুদ্ধ, ধর্ম, সঙ্ঘেরও নিরাপত্তা? নিজ অন্তর্জীবনে যিনি তন্ত্রসাধনা করে গেলেন মনে মনে, তিনিই আবার কেন বাহ্যজীবনে তন্ত্রসাধনার প্রকাশ্য বিরোধিতা করতে গেলেন—এতদূর বিরোধিতা যে, তন্ত্রসাধনার অপরাধে বিক্রমশিলা মহাবিহার থেকে বহিষ্কার করলেন তন্ত্রসাধকদের? তিব্বতে যাবার আগে যিনি অপেক্ষা করেন তারাদেবীর দৈব আদেশের, সেই তিনিই কেন তিব্বতে উপস্থিত হয়ে তারাদেবীরই উপাসক রিন্ চেন্ জান্পো-কে অত্যন্ত দম্ভসহকারে অপমান করলেন? ঊনষাট বছরের পরিণত প্রৌঢ়ত্বে উপনীত হয়ে উপাধিবারিকের নিরাপদ অবস্থান পরিত্যাগ করে কেন নিলেন ঝুঁকি সেই ভয়ংকর দেশে যাবার? নাহ্, কিচ্ছু মিলছে না। কোনো সন্তোষজনক উত্তর নেই ইতিহাসের পৃষ্ঠায়, সে অলকা চট্টোপাধ্যায়ের “অতীশ এন্ড টিবেট”-ই হোক, আর নিগ্ ওয়াং নিমা-প্রণীত নতুন তিব্বতি জীবনীই হোক, অথবা ব্রোম্ তোন্ পা-বিরচিত প্রাচীন অতীশ-স্তোত্রই হোক। প্রশ্ন আছে, কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর নেই।
ভাগ্যিস নেই! নেই বলেই তো ইতিহাসাশ্রয়ী অনুসন্ধান চলতে পারে কল্পনাপ্রতিভায়। আর সেই বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ধরা পড়ে দীপংকরের বাল্যকালে কুয়াশামাখা রহস্যময় এক কাহিনির আভাস, যার পরিসমাপ্তি হয় পরিণত বার্ধক্যে তিব্বতের এক কুহেলিকালীন গিরিপন্থায়—তাঁর জীবনসমস্যার অমোঘ অথচ রহস্যময় এক সমাধান! দীপংকর-জীবনের অকথিত সেই গোপন রহস্যকে উন্মোচন করতে গিয়ে দেখা পাই অন্য এক দীপংকরের; তিনি অতীশ নন, তিনি জোবোজে নন, তিনি শুধু পণ্ডিত বা অভিযাত্রীই নন, তিনি আঘাতে সংঘাতে আমাদেরই মতন রক্তাক্ত এক মানুষ, এক কারুণ্যবৎসল হৃদয়। তিনি জীবনের এক অনন্য অর্থ—যে অর্থে প্রত্যেকেই আমরা অতীশ, প্রত্যেকেই দীপংকর।
অতীশ দীপংকরের সময় ও জীবনকে আশ্রয় করে তিন যুগের তিন নারীর সকরুণ আখ্যায়িকা “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” আমাকে গবেষণা, পাঠ ও রচনার সশ্রম প্রয়াসে বিনিদ্র রেখেছে আজ দশটি বছর। আমার সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমি আজ একটি দশক অতীশের সঙ্গে রয়েছি। বইটি শীঘ্রই, সম্ভবত এ মাসের শেষেই প্রকাশ করবেন ধানসিড়ি প্রকাশন। আমাদের জানামতো, এটিই অতীশ দীপংকরের জীবনের উপর আধারিত বাংলাভাষায় প্রথম প্রামাণ্য উপন্যাস।
