একালের অনেক প্রশাসকই আর সংবিধান তথা মানুষের কাছে দায়বদ্ধ নয়
১।
ICS/IAS ইত্যাদি একদা ছিল প্রশাসনের স্টিল ফ্রেম। তখনও বদলি ছিল, প্রমোশন ছিল। আনুগত্য আর দায়বদ্ধতাও ছিল। রাজনৈতিক কর্তারা চাইলেও তারা সংবিধান বিরোধী কাজ করতে চাইত না। যদিও স্বদেশি পেটালে প্রশংসা মিলত, ব্যাখ্যা আর কৈফিয়তও দিতে হত বিস্তর। রাজ্যস্তরে মিলেছে আর এক কিসিমের প্রশাসক(যেমন পশ্চিমবঙ্গে WBCS)। দুই শ্রেণির মধ্যে আবার ছোঁয়াছুয়ি, জাতপাতের সমস্যা প্রবল।
২।
একালের অনেক প্রশাসকই আর সংবিধান তথা মানুষের কাছে দায়বদ্ধ নয়, তারা ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থে দাদা/দিদিদের পায়ে লুটোয়। আদর্শ উদাহরণ: ইন্দিরা গান্ধির নির্বাচনে তাদেরই একজনের সংবিধান-বিরোধী কাজ যা বিচারব্যবস্থার সুবিবেচনায় রোধ করা গেছে। বিচারবিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়েও এখন নানা প্রশ্ন উঠছে যা বছর কুড়ি আগেও ছিল অভাবনীয়। প্রতিদিন আমাদের প্রশাসনিক আর বিচারবিভাগীয় কর্তারা অযোগ্যতা, অপদার্থতা, অকুশলতা, অসততা, অদক্ষতার রেকর্ড গড়ছেন ভাঙছেন।
আর এক বৈশিষ্ট্য দুর্নীতির ঝোঁক। সাম্প্রতিক কালে 3G কেলেঙ্কারি বা কোলগেট কেলেঙ্কারি সবেতেই আমলাকুলের অবদান রয়েছে। আর, এই রাজ্যে সাম্প্রতিককালে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড যদি হয় তোষামোদপ্রিয়তার উদাহরণ তবে তো আদালতের আচরণও দ্বিধাচিত্ততার পরিচয় বহন করে নিশ্চয়।
৩।
সরকারিভাবে এদেশের বাজার মুক্ত হবার অনেক আগেই তার দরজা-জানালা হাট করে খুলে দেওয়া হয়। এর প্রভাবে স্থায়ী চাকরির ধারণা বদলে যায়। নিচুস্তরে শূন্যপদ খালি রেখে চুক্তিতে কিছু নিয়োগ করাটা সরকারি রীতি হয়ে ওঠে। একজন স্থায়ী কর্মীর কাজ করবেন তিনজন – এভাবেই প্রস্তাবপত্র তৈরি হলেও বাস্তবে ঘটতে থাকে উল্টোটা – তিনজনের কাজ চাপানো হয় একজন অস্থায়ী চুক্তিবদ্ধ কর্মীর ঘাড়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সব ক্ষেত্রেই এক ছবি। ব্যতিক্রম – প্রশাসন। সে ক্ষেত্রেও প্রচুর শূন্যপদ, কিন্তু সেখানে ভাড়াটে সৈন্য নিয়োগ হয় না। কেন? ভাড়াটে সৈন্যরা কর্তাদের অনুগত হবে, কম মজুরিতে মুখ বুজে বেশি কাজ করবে, গোপনীয়তা ভাঙার সুযোগ পাবে না এমনটা আশা করেই তো সরকার এগিয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাপক বেকারত্ব মানুষকে বাধ্য করছে যে-কোনও শর্তে কাজ নিতে। ভিক্ষার চাল কাড়া আর আকাড়া!
আরও পড়ুন
প্রথম বাঙালি আইসিএস
আর আমলারা? তাদের ওপরও কাজের চাপ বেড়েছে বহুগুণ, কিন্ত কমেনি ঠাঁটবাট। অন্তত জেলাস্তরের কর্তাদের দেখলে তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। তাদের সরকারি আবাস, গাড়ি, সহকারি ইত্যাদি সবই রয়েছে পূর্ববৎ। মেজাজটাও; যদি না দলের কর্তারা উকি মারেন, নির্দেশ দেন। হেড আপিসে বদলি পেতে তদ্বির বা সাধ্যমতো সেই কর্তাদের তৈলমর্দন করেন তাঁরা, অনেক সুখ ত্যাগ করেই আসেন এবং এসেই স্বমহিমায় প্রকাশিত হন।
ব্যতিক্রম তো আছেই, তবে ব্যতিক্রমী হলেই কি তাঁরা সব হর্ষ মান্দার হতে পারেন?
৪।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার যুগ্ম সচিব পর্যায়ে চুক্তির ভিত্তিতে সরাসরি লোক নিয়োগ করতে চেয়েছে। তাতেই গেল গেল রব উঠেছে। কেন?
বাইরের লোক এলে গোপনীয়তা বা দায়বদ্ধতা থাকবে না। বা নিরপেক্ষতা যাবে বা দক্ষতা/যোগ্যতা নিভবে? একালের আমলাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে এমন সব কথা বলার আর সুযোগ থাকে না। তবু বলব- 'চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া' ভাল না। এও বলব যে, প্রশাসনে যারা আছেন তারা যদি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ না থাকেন তাহলে, ‘নিও-লিবারাইজেশন’-এর তত্ত্ব মেনে তাদেরও চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হতে হবে। আজ বা কাল। সরকারকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, আমলাকুল নিজেরাই অন্ধকার তথা নিজেদের মৃত্যু পরোয়ানা রচনা করেছেন, মানুষের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বিপদ সামগ্রিকভাবে দেশের গণতন্ত্রের – যা ঘটতে চলেছে তাও যেমন খারাপ, যা ঘটেছে এতকাল তাও সমানই খারাপ। প্রার্থনা করি অন্ধকার সর্বগ্রাসী হবার আগে আমাদের আমলাকুল ফের স্টিল ফ্রেম হয়ে উঠবেন, খুঁজে পাবেন তাদের হারানো শিরদাঁড়া।