কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের পূর্বপুরুষেরা

ডালহৌসি পাড়ায় জেরুজালেম

অষ্টাদশ শতকের কলকাতায় ইংরেজ সাহেব-সুবো, ছেলে ছোকরাদের উড়ুউড়ু পরাণে মন্দার বাতাস লেগেছে। আড্ডা আড্ডা করছে প্রাণ, কিন্তু আড্ডা দিতে কোথাও যাওয়ার জো নেই। এসব দেখে শুনে উইলিয়াম পার্কেস নামের এক সাহেব কোম্পানির কর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দিলেন একটা লম্বা আর্জি। তাঁর সোজাসাপ্টা আবেদন যে- তিনি নিজে পয়সা খরচ করে একটি বাগানবাড়ি কিনেছেন এবং সেটিকেই একটু অদল বদল করে খানা-পিনা, আমোদ আহ্লাদ আর আড্ডার কেন্দ্র তৈরি করতে চান। কারণ এই দূর প্রবাসে আড্ডার জায়গার বড়ই অভাব। এমন আর্জি শুনে কোম্পানির কর্তারাও খুশিতে গদ গদ হয়ে বললেন ‘কোই বাত নেহি।’ প্রস্তাবে শিলমোহর পড়ল। সাহেবগুলোও জানেন কলকাতায় হোটেল, ট্যাভার্ন এমন কিছুই নেই যে বিলেত থেকে আসা লোকগুলো সেখানে গিয়ে একটু আড্ডা দেবে বা আমোদ-প্রমোদ করবে। তাই কর্তারাও বললেন সাধু সাধু। কিন্তু কয়েকজন হোমরাচোমরা সামরিক কর্তার একটু আপত্তি হল এতে। তাঁরা বললেন ‘চিন্তা আছে ভাই চিন্তা আছে। সব কিছু এত সহজে ছাড় দিয়ে দেওয়া যাবে না।’ এমনিতেই ছোকরাগুলোর মতি-গতি ভালো ঠেকে না। ব্যাটারা লড়াই করতে গিয়ে কামান ধরার বদলে থেকে থেকেই কলম ধরে। তারপর বিরহের কবিতা লিখে জাহাজঘাটার দালাল ধরে জাহাজের খালাসির হাতে ঘুষ গুঁজে দেয়। যাতে কিনা লন্ডনে প্রেয়সীর হাতে ছোকরার কবিতা পৌঁছে যায়। অতএব এমন উড়ুক্কু প্রাণ রাইটারগুলোকে বিশ্বাস নেই। কারণ আড্ডায় মজে হয়তো বেহুঁশ হয়ে সেখানেই পড়ে রইল। তখন কিন্তু কোম্পানির কাজকর্ম সব লাটে উঠবে। তা ছাড়া বেশ কয়েকজন কর্তাও আছেন। তাঁরাই বা কম যান কীসে? তাঁদের চলনে-বলনে কেমন যেন একটা নবাব-নবাব ভাব। হুঁকো খাওয়া দিশি বিবি নিয়ে ঘর করেন আর সামরিক তাঁবুতে বসে বসে মৌতাত করে বাইজিদের গান শোনেন। এমতাবস্থায় তাই একটা আইন করতে হবে সবার কথা ভেবে। সকাল বেলার আপিস টাইমে ওসব আড্ডা খানা বন্ধ রাখতে হবে। আইনে লেখা হল ‘It was not to be open in the morning as the Board were afraid that it would be the means of keeping people from doing their duty.’ যাই হোক অবশেষে কোম্পানির জারি করা আইন কানুন মেনে পার্কেস একটা হোটেল বানালেন। আর সেই হোটেলের নাম দিলেন ‘লন্ডন হোটেল’।

আসলে তখনও সাহেবদের হোম সিকনেস কাটেনি। কথায় কথায় তাঁরা কলকাতাকে লন্ডন বানাতে চায়। পারলে ঘর-বাড়ি পথ-ঘাট সবের সঙ্গেই লন্ডনের চরিত্রকে মিশিয়ে মাখিয়ে দেয়। যাই হোক এহেন পার্কেস তাঁর ‘লন্ডন’ নামধারী হোটেলে একটা ‘কফি রুম’ বানালেন বেশ যত্ন করে। আর সেই ‘কফি রুমে’ এক পেয়ালা কফি পানের খরচ মাত্র সিক্কা টাকা। এই টাকায় কফি পান আর কাগজ পড়া দুই-ই হয়ে যায়। আর তাতেই কফির আমেজের সঙ্গে মেলে ইংল্যান্ড ইংল্যান্ড একটা গন্ধ। কড়া মেজাজের কফির সাথে কড়া মেজাজের আড্ডার কোথায় যেন একটা অন্তরঙ্গতা খুঁজে পায় সমুদ্র পেড়িয়ে দেশ ছেড়ে আসা সাহেবগুলো। কিন্তু ইংল্যান্ড থেকে আসা ছোকরাগুলোর এত সহজে মন ভিজল না। তাঁদের একটাই কথা কফি রুম-টুম নয়, চাই একটা আস্ত কফি হাউস।

এসব যখন চলছে ঠিক তখনই কলকাতায় সত্যিকারের একটা ‘কাফি হাউস’ তৈরি হল। অনেক ঘটা করে সেটার নাম দেওয়া হল ‘ক্যালকাটা এক্সচেঞ্জ কাফি হাউস’। সেখানে কফি পানের সাথে সাথে কলকাতার ইংরেজি কাগজগুলি যেমন পড়া যায় তেমনই আবার মাদ্রাজের যাবতীয় ইংরেজি খবরের কাগজেও চোখ বুলানো যায়। এই কফি হাউসে নিয়মিত ভদ্রলোক, ব্যবসায়ী বণিকের আড্ডা বসতে লাগল সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই। তখন অবশ্য আজকের মতো কলেজ পড়ুয়াদের আড্ডাস্থল হয়ে ওঠেনি সেই কফি হাউস কারণ কলকাতা তখনও ছাত্রসমাজ চোখেই দেখেনি। কিন্তু এখানে যারাই কফির কাপে তুফান তুলে আড্ডা দিতে আসেন তাঁরা চাঁদা দেন, মানে তাঁরা হলেন গিয়ে মেম্বার। প্রতি সন্ধ্যায় মেম্বারদের মধ্যে লেগে থাকত নানা বিষয়ের তর্ক-বিতর্ক। মাঝে মধ্যে সেই তর্ক এমন পর্যায়ে যেত যে লোকে ভাবত এবার বুঝি একটা ডুয়েল লড়াই লাগল। ‘সেপই সেপই’ বলে হাঁক পাড়তেন শান্তিকামী সদস্যরা। এরকমই সেখানে লেগে থাকত হই-হট্টগোল।

কিন্তু একদিন টাকার অভাবে এই কফি হাউসটিও নিলামে উঠল। নিলামের হাতুড়ির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেল এহেন কফি হাউসের হই হই করা আড্ডার শোরগোল, তর্ক অথবা চিনামাটির রোকোকো নকশার পেয়ালাগুলিও। কেবল পড়ে রইল নিঝুম নামা বাড়িটি। আজকের যে ‘রয়্যাল এক্সচেঞ্জ’-এর বাড়িটি কলকাতায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সেটিই ছিল ওই ‘ক্যালকাটা এক্সচেঞ্জ কাফি হাউস’। এমনই হল কলকাতার ইতিহাস। এখানেই থেমে রইল না ‘কফি হাউস’ বানানোর হিড়িক। আবার ফিরিয়ে আনা হল লন্ডনের স্বপ্ন। এবার আমরা গল্পটা শুনব অতীত নামা কলকাতার বিরল লিপিকার শ্রীপান্থের রম্যকলমের জবানিতে।

‘সমসাময়িক কালের আর একটি কফি হাউসের খবর আমরা জানি। তার নাম জেরুজালেম কফি হাউস। ‘জেরুজালেম কফি হাউস’ নামটির একটি ইতিহাস আছে। সে সময় লন্ডনে একটি কফি হাউস ছিল ওই নামে। কবি ক্যুপারের পিতৃনিবাস কুপ্যারস কোর্টে ১৮৮৮ সাল অবধিও ছিল ওটি। জেরুজালেম কফি হাউসটি কিন্তু লন্ডনের আর-পাঁচটা কফি হাউসের মতো ছিল না। উইলিয়াম হিকি লিখছেন – ওটি ছিল ভারতবর্ষ নিয়ে যাদের কারবার, তাদেরই আড্ডাখানা।

হিকি নিজেও ভারতে আসার আগে ওখানে বসে বসে ভারতের কাহিনী শুনেছেন ভারত-ফেরত নাবিক, সৈনিক এবং সিভিলিয়ানদের মুখে। ভারতবর্ষের শেষ খবর, ভারতের হালচাল জানতে আগ্রহীরা ভিড় জমাতেন ওখানে। কোন জাহাজ কবে ছেড়েছে, কোন জাহাজ কবে পৌঁছোবে – এসব জানারও একমাত্র বেসরকারি স্থান ছিল ওটি। সুতরাং ভারতের সঙ্গে যাদের যোগ ছিল, তাদের পরিচয় ছিল জেরুজালেম কফি হাউসের সঙ্গেও।

কিন্তু কলকাতায় নবাগতদের ঠিক এ ধরনের আড্ডাখানা ছিল না। নাবিকেরা গঙ্গায় জাহাজ ভিড়িয়ে উসখুস করতেন। লন্ডনে সেই ‘জেরুজালেমে’ কফি গিলে উঠেছেন, আর এই এখানে যদি মনের মতো একটা কফি হাউসও থাকত! এ কী রাজ্যি বাবা।
১৭৯০ সালের কথা। জন ম্যাকডোনাল্ড নামে এক নাচের মাস্টার কলকাতায় পা দিয়েই বুঝতে পারলেন, এখানে ‘জেরুজালেমের’ অভাব। তিনি স্থির করলেন ওই নামেই একখানা কফি হাউস খুলবেন কলকাতায়। ম্যাকডোনাল্ড বাড়ি কিনলেন একখানা ডালহৌসি স্কোয়ারে। কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট যেখানটায় মিলেছে ডালহৌসি স্কোয়ারে সেখানটায়। জেরুজালেম কফি হাউস খোলা হল…।’

এমন কাহিনী শুনলে মনটা সত্যিই কেমন যেন কলকাতা কলকাতা করে ওঠে। কিন্তু দেখা গেল ওখানেও কফি হাউস জমল না । ওয়েলেসলি সাহেব ভাড়া নিলেন বাড়িটিকে। আর সেখানেই গড়ে উঠল একটি মহাবিদ্যালয়। সেটির নাম ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’। এভাবেই দিন শেষ হয়ে গেল কলকাতার ‘জেরুজালেম’-এর। তবু কিন্তু আজও দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি। বলতে গেলে জীর্ণতা নয় বরং বিরাট বৈভবের কর্পোরেট চেহারা নিয়ে।

আজ সেখানে জাহাজের নাবিকেরা আড্ডা দেয় না। কোনও বিরহী ইংরেজ সেখানে বসে প্রেয়সীর জন্যে কবিতার কল্পনা করে না। কিংবা কেউ এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবেও না এই বাড়িটার দেওয়ালের গায় আজও কান পেতে শোনা যেতে পারে ইংরেজ নাবিকদের ভারত পাড়ির গল্প। তবু বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে সাইনবোর্ডে লেখা আছে এইচএসবিসি মানে ‘হংকং সাংহাই ব্যাঙ্ক’। বলতেই হয় আজকের কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের পূর্বপুরুষ।

অলংকরণ- পার্থ দাশগুপ্ত

Developed by DXDasia