বিশ্বযুদ্ধ প্রাক্কালে নির্মিত ‘কল্পনা’ চলচ্চিত্র। অমলার বয়স তখন সতেরো।

অমলাশঙ্কর এক ঐতিহ্যের নাম। যে দিনগুলো হারিয়ে গেছে তাদের ফিরিয়ে আনার নাম। শঙ্কর পরিবার আমাদের কাছে সেই গর্ব। বাঙালি সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে হাজির করেছিলেন তাঁরা। তৈরি করেছিলেন নাচের সম্পূর্ণ অন্যরকম এক শৈল্পিক ভাষা। নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের স্ত্রী অমলাশঙ্কর। নানা রঙের দিনগুলোয় একে অপরের হাত ধরে সারা বিশ্ব তোলপাড় করে বেরিয়েছেন একসময়। কিন্তু এই অমলা যখন একজন অভিনেত্রী? কেমন ছিল সেইসময়?

সালটা ১৯৪৩-এর শুরু। উদয়শঙ্কর এবং অমলাশঙ্কর আলমোড়ায় গেছেন শো করতে। সেখান থেকেই এক বার পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া হয়েছে। তখন উদয়-অমলার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সেই ট্যুরে সঙ্গী হয়েছেন গুরু দত্তও! ওখানেই একদিন ঘরে ফিরে উদয় শঙ্কর হঠাৎ অমলাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘ইমাজিনেশন-এর বাংলা কী?’’ অমলা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, কল্পনা। গুরু দত্তর হাতে একটা খাতা ছিল। উদয় বললেন, ‘‘লেখো তো কল্পনা!’’ গুরু লিখে তলায় একটা লাইন টেনে দিলেন! সে-খাতাতেই লেখা হল চিত্রনাট্য। আর এভাবেই শুরু হল ‘কল্পনা’র পথ চলা। তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছে। পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর। কিছু দিনের মধ্যেই নানা কারণে আলমোড়ার সেন্টারটা বন্ধ হয়ে গেল। উদয়শঙ্করের মনপ্রাণ জুড়ে তখন ‘কল্পনা’।

বিশ্বযুদ্ধ তখন থেমেছে কয়েক বছর আগেই। এমনাবস্থায় ১৯৪৮ সালে মুক্তি পেল উদয়শঙ্করের পরিচালনায় প্রথম ছবি 'কল্পনা'। অমলাকে ছাড়া এই ছবির কথা ভাবতেই পারতেন না উদয়। নামকরণ থেকে শুরু করে অন্যতম প্রধান চরিত্রে অভিনয়, সবটা জুড়েই অমলা। সাল ১৯৩১, অমলার বয়স তখন এগারো। বাবার সঙ্গে প্যারিসে 'ইন্টারন্যাশনাল কলোনিয়ান এক্সজিবিশন'-এ হাজির হয়েছিলেন। সেই প্রথম দেখা উদয়শঙ্কর এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে অমলার। ‘কল্পনা’ ১৯৪৮ সালে নির্মিত একটি হিন্দি ছবি। মূলত ডান্স-ড্রামা। একজন তরুণ নৃত্যশিল্পীর জার্নি দিয়ে সাজানো এই ছবির গল্প। অমলার বয়স যখন ১৭, সেইসময় প্রথমবার তিনি অভিনয় করছেন এই ছবিতে। ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র উমা। প্রথমবার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে রীতিমতো চর্চিত হয়ে উঠেছিলেন অমলা।

উদয়-অমলার মতো এমন নৃত্যরত যুগল বিশ্বে খুব কমই আছে। শঙ্কর ঘরানা এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন অমলা। অমলার হাত ধরেই আসেন মমতাশঙ্কর এবং তনুশ্রীশঙ্করেরা। ২০১৮ সালে সেই প্রাণচঞ্চল মেয়েটি নিরানব্বই পার করে একশো বছরে পা দিলেন। বাংলার অহংকার তিনি। কল্পনা ছবিতে সেই অভিনয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র তাঁকে আবিষ্কার করেছিল। আজও সেই ঘরানা তাঁর পরিবারের মধ্যে চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান। ধারা অব্যাহত আছে, আর আমাদের মধ্যে পরম যত্নে আছেন অমলাশঙ্কর।

(ঋণ- মমতাশঙ্কর)

Developed by DXDasia