
প্রশ্ন জাগে, এইসব তাঁদের ব্যক্তিগত প্রতিভা শুধু? নাকি, সময়ই তৈরি করেছিল সেসব? কীভাবে পেতেন এতকিছু করার তাগিদ? ভাবনার রসদ জোগান দিত কে? ঠাকুরবাড়ির কথা বলছিলাম আসলে। আশ্চর্যের শেষ থাকে না সেদিকে চাইলে। হাজার গুণের সুবিশাল সমারোহ। সকলে সকলের মতো করে কিছু না কিছু তৈরি করে চলেছেন। কোনোকিছুই ফেলছেন না। ছাইয়ের ভিতর থেকে বাস্তবিকই খুঁজে পাচ্ছেন পরশপাথর। ব্যাস, জন্ম হচ্ছে কোনো এক নতুনের।
আরো পড়ুন
প্লেগের বিরুদ্ধে লড়ছেন অবনীন্দ্রনাথ, প্লেগ ছিনিয়ে নিয়ে গেল তাঁর ছোট্ট মেয়েকেই
যেমন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্বাবধানে ঠাকুরবাড়িতে শুরু হচ্ছে রন্ধনচর্চার ক্লাস। শুধু ঠাকুরবাড়িতে মোটেই তা আটকে থাকছে না। আর লতায়পাতায় তাতে জড়িয়ে যাচ্ছেন পল্লিকবি জসিমুদ্দিন।
অবশ্য ব্যাপারটা সেসময় সে বাড়িতে খুব স্বাভাবিক। রোজকার একটা বিষয়ই যেন বা। যেমন ধরা যাক, কলকাতার রাস্তায় যখন সাইকেল চলল, লোকে তো অবাক। অবন ঠাকুর বললেন, আশ্চর্য কল, কতকিছুকে সুবিধাজনক করে দিল। অমনি ঠাকুরবাড়ির ছেলেরা ভাবল, সুবিধাজনক আরো কিছু কল হলে বেশ হয়। কী কল বানানো যায়? না ধুতি কোঁচানোর কল। সময় বাঁচবে প্রচুর। তা হাতপাখার মডেলে সে কল বানানোর চেষ্টা চলল দিবারাত্র। সফল হওয়া গেল না। কিন্তু তা বলে নতুনের চর্চা বন্ধ হল না।
আরো পড়ুন
‘টিংটিং বাজে বেল’– সাবেক কলকাতার সাইকেল-কথা
এভাবেই হঠাৎ ঠাকুরবাড়িতে রান্নার ক্লাস শুরু হল। ঘটনাটা হয়েছিল এই, অবনীন্দ্রনাথের পুরোনো বিশ্বাস্য বাবুর্চিরা একে একে কাজ ছাড়তে লাগল। নবীন ছিল সেরার সেরা বাবুর্চি। সে বিদায় নিল। তার জায়গা নিল তার মেট তালাবালি। তার হঠাৎ মৃত্যু হল৷ সেখানে বহাল হল রাধু। এই রাধুকে করিৎকর্মা বাবুর্চিতে পরিণত করতে উদ্যোগ নিলেন অবনীন্দ্রনাথ স্বয়ং। মিসেস বিটনের ‘কুকারি-বুক’ থেকে তাকে শেখালেন ‘কর্ন-ফ্লাওয়ার পুডিং’। এইবার যেন মজা পেয়ে গেলেন অবনীন্দ্রনাথ। রন্ধন-বিদ্যা পড়া শুরু করে দিলেন। মুসলমানি রান্নার কেতাব কিনলেন। বিদেশি রান্নার বই পড়া চলল। পড়ে পড়ে রাধুকে বোঝাতেন। আর রাধুও চটপট শিখে ফেলত সেসব। একেবারে হাতে-কলমে শিক্ষা আরকি।
আরো পড়ুন
কলকাতায় প্রথম টেলিফোন, ক্রিং ক্রিং আর রবীন্দ্রনাথের নম্বর
তারপর, অবনীন্দ্রনাথ সেই হাতে-কলমে শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে চাইলেন মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর ভাইদের মধ্যে। শুরু হল ক্লাস। প্রথম প্র্যা ক্টিকাল ক্লাস হল বাগানে। সন্ধেবেলা স্টোভে হবে রান্না। পদের নাম আলুভাজা। যে যেমন পারে, আলু কেটে ভাজা। জমেও গেল সেসব ভাজাভুজি। কেউ মুচমুচে, কেউ নরম, কেউ বিলিতি চিপ্স, কেউ ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, কারো হলদে, কারো রাঙা- এমন নানান আলুভাজায় সেদিন জমে গিয়েছিল ঠাকুরবাড়ির ডিনার।
আরো পড়ুন
রান্নাঘরে লুকিয়ে পড়তে শেখা, বাংলা সাহিত্যের প্রথম আত্মজীবনীটি লিখেছিলেন রাসসুন্দরী
ঠাকুরবাড়িতে তারপর তৈরি হল একটা ক্লাব। এমন প্রচুর ক্লাব বারবারই তৈরি হয়েছে ঠাকুরবাড়িতে। তা সেবার, ক্লাবের সভাপতি কে হবে, তা নয়ে সমস্যা বাঁধল। পল্লিকবি জসিমুদ্দিন তখন ঠাকুরবাড়িতে প্রায়ই আনাগোনা করেন। হাত তুলে জানালেন, সভাপতি হতে চান। ঠাকুরবাড়ির সদস্যরা বললেন, এমনি এমনি টিকিট মিলবে না। অসাধারণ কোনোকিছু খাইয়ে মন জয় করতে পারলে, তবেই ভোট। লেগে পড়লেন জসিমুদ্দিন। বাজার হল এলাহি রকমের। ঘি তেল চিনি সুজি আলু বেগুন কিসমিস বাদাম দই সন্দেশ– রাজসিক বন্দোবস্ত। রান্নাও হল তেমন। লোকে খেয়েদেয়ে খুশ হল। তবু, মুখ বেঁকিয়ে বললে, নাহ, এটা অসাধারণ নতুন কিছু না। ইহা ভালো রান্না। কিন্তু অভিনব নহে। অতএব, জসিমুদ্দিনের সভাপতির অ্যাপ্লিকেশন বাতিল হয়-হয়।
মুখ কালো করে ঘুরে বেড়ান জসিমুদ্দিন। এইবার হাল ধরেন অবন ঠাকুর। যেভাবে নানা রঙের মিশেলে ছবি তৈরি হয়, সেভাবেই বেচে যাওয়া আনাজপাতি দিয়ে কাবাব রান্না করলেন তিনি। চুপিচুপি, জসিমুদ্দিনের সঙ্গে সাট করে। নাম দিলেন ‘জসি কাবাব’। সেই জসি কাবাব মন জয় করে ফেলল সকলের। ব্যাস, জসিমুদ্দিনের সভাপতি হওয়া আর আটকায় কে?
নতুনের নেশায় এভাবেই কতকীর জন্ম হয়েছে ওই বাড়িটায়। কিছু থেকে গেছে, আর কত কী যে হারিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।