October 12, 2017 | 12:00 PM

আজ যেমন করে গাইছে আকাশ

“যেদিন প্রথম পড়িলাম, জল পড়ে পাতা নড়ে..আমার সমস্ত চৈতন্য বাহিয়া যেন  জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল। ” 
এ কথা আমার নয়। রবীন্দ্রনাথের আর “জীবনস্মৃতি”র। আমি ভাবছিলাম, আমারও তাই নয়? ছোটবেলায় বড় একা ছিলাম। মনে মনে। হয়ত বারান্দার রেলিংগুলোকে ছাত্র- ছাত্রী ভেবে ছড়ির আঘাত করতাম না; কিন্তু ওই জাফরি পেরিয়ে চোখ চলে যেত ট্রামরাস্তার ওপারে।খুব ইচ্ছে করত অন্যরকম একটা জগৎ খুঁজে নেবার।

ছড়ার বই, ছবির বই।স্লেটে দাগা বুলোই। ইস্কুলে দুলে দুলে নার্সারী রাইমস।কিন্তু ঝোঁক খুব..বড়দের বই হাতে নেবার। যাতে সবাই ভাবে,আমি দিগগজ হয়ে গেছি। এমন সময়ে বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল। বাড়িতে এল এক নতুন আলোর ফুলকি। হালকা হলুদ আর খয়েরী মলাটে “রবীন্দ্র রচনাবলী”। প্রকাশক পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ১৫ খণ্ডে। দাম ৭৫ টাকা। কাগজ এসেছিল বিদেশ থেকে। সে এক আশ্চর্য কাগজ। ট্রেসিং পেপারের মতো ফিনফিনে।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এই এত অক্ষর? ক’জন মিলে লিখেছে?”
বাবা বলেছিলেন, “একজনই।কিন্তু তিনি যে একাই একশ’।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”।
“তাই? কিন্তু সে দাড়িওয়ালা বুড়ো মানুষটা তো অনেক ছড়া লিখেছে। আর অনুরোধের আসরের গান। “

বাবা হেসেছিলেন। বলেছিলেন, “এই নাও। সাবধানে পড়বে।শুয়ে শুয়ে পড়বে না। বই নষ্ট হয়ে যায়। একটু আধটু বুঝবে। বেশিরভাগই বুঝবে না। তাতে কোনো ক্ষতি নেই।”
আমি তখন কতই বা আর! এই বছর পাঁচ।

সেই শুরু। প্রথমে চেনা পদ্য দিয়ে।তখন বয়স কম, পদ্যে কেমন দুলুনি আসে, ঝিমঝিম..ঘুম পেয়ে যায়। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা যায়। মনে হয়, আমি আর একা নই। আমার অনেক বন্ধু। আর আমি খেলার সাথীর জন্য হা হুতাশ করি না। আমার বেশ কেমন একা থাকতে ভালো লাগে।একা। জানলায়। নীচে বস্তির টিপকলে সময়ের জলের জন্য হুটোপাটি, ঝগড়া, খিস্তিখেউড়। আমার এখন আর ওখান থেকে নতুন শব্দ জানার, শেখার কৌতূহল হয় না। আমার সামনে সারি সারি শব্দরা মসৃণভাবে হেঁটে যায়। আমি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকি। আমার হাসি কান্নার জগতে চুপি চুপি আসে অমল আর দইওয়ালা, আসে দুষ্টু ছেলে ফটিক। আসে কুড়ানী, আসে জুলেখা। কত নাম বলব? এভাবে কি বলা যায়?

বড় হই। বড় হই। আমার একাকীত্ব আঁচলে বেঁধে নেয় চারুলতা। আমাকে কানে কানে নীরজা বলেছে,”আমি আছি।” আমাকে প্রথম প্রেম শিখিয়েছে লাবণ্য। নিজেকে প্রথম “নারী” ভাবতে শিখিয়েছে কুমু। আমাকে সোচ্চার হতে শিখিয়েছে বিমলা। আমাকে অন্যরকম হতে শিখিয়েছে অচিরা। আমি এই যে “আমি” হয়ে উঠেছি, আসলে কিন্তু আমি নই। আমার মননে টুকরো টুকরো হয়ে সেই কবে থেকেই রয়ে গেছে এমন অসংখ্য চরিত্র।আমি কখনো নন্দিনী হয়েছি। কিন্তু রঞ্জনকে না খুঁজে হাত রেখেছি বিশু পাগলার হাতে। এ সব ছেড়ে বেরোতে চেয়েছি, পারিনি। আবার ফিরে এসেছি… এলা হয়ে… অতীনের কাছে। টুকরো কাচ, নানা রঙের কাচ দিয়ে সেই কেমন ঝিলমিল জানলা তৈরী হয়..বর্ণময় আলোর আলপনা… সেই নকশায় হাত বুলিয়েছি আমি, পালক আঙুল দিয়ে।

এছাড়াও তো আরও কত কিছু। ছড়ার বদল হয় কবিতায়। আসে অজস্র চিঠি, নাটক, নৃত্যনাট্য, প্রবন্ধও। এবং …. সুরের গুঞ্জন প্রণতি জানাতে শেখে গানের চরণে, আমার অস্তিত্বে যার সতত অনুরণন। ফলে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে তীব্রভাবে যা আমার চেতনায় মিশে যায় এবং প্রতিটি জাগ্রত ও নিদ্রিত মুহূর্তে রয়ে যায় দুর্নিবার উদ্বেল প্রেমে, তা রবীন্দ্রনাথের গান।

রবীন্দ্রনাথ আমার জীবনে প্রথম পুরুষ এবং প্রথম প্রেমিক.. যাঁর চোখ দিয়ে আমি অন্য এক জগৎ চিনেছি, যাঁর হাত ধরে আমার বর্ণহীন চেতনা পান্নাসবুজ আলোয় ঝলমল করে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথই তো শিখিয়েছেন, দু:খ মানুষকে ঋদ্ধ করে। হাতে তুলে দেয় এক আশ্চর্য প্রদীপ। তার মৃদু অথচ নিরন্তর বিভা আমাদের নিয়ে যায় পথ দেখিয়ে…সেই অনামা দিগন্তরেখাটিকে আমরা স্পর্শ করতে পারি এক অনন্য অনুভবে, যার অন্য নাম “শেষ আশ্রয়।”

এই যে বোধ, এই যে অহরহ অনুভব করা ..দিনান্তে রবীন্দ্রনাথের গানই আমার “শেষ আশ্রয়” …সুখে-দু:খে-হরষে-বিষাদে ..সেও কিন্তু কয়েকজন কণ্ঠশিল্পীর কণ্ঠমাধুর্যের সহায়তায়। তাঁদের একজন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। যখন কণিকার গানের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ প্রথম আমার কাছে ধরা দেন, তখন আরও একটি বিশেষ অনুভব কণিকার সেই অনন্য গায়কীর হাত ধরে আমার জীবনে এসেছিল। সেই প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম গানের মাধ্যমে ঠিক কাকে “নিবেদন” বা “সমর্পণ” বলে। কেন কিছু কিছু গান শুনলে আমাদের বুকের ভেতরটা অব্যক্ত ব্যথায় মুচড়ে ওঠে, কেনই বা কারণে অকারণে আমাদের চোখের কোল ভিজে ওঠে, কেন আমরা সেই সব বিশেষ বিশেষ ক্ষণগুলিতে অবলীলায় স্পর্শ করতে পারি স্বর্গের পারিজাতফুল। কণিকা আমাদের এক আশ্চর্য ভুবনের সন্ধান দিয়েছিলেন গানের মধ্যে দিয়ে তাঁর আর্তিটুকু আমাদের অক্লেশে বিলিয়ে দিয়ে।

আজ কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিবস।আমার প্রণতি এই জাদুকরী কণ্ঠশিল্পীকে…গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার মাধ্যমে।