
১৯৫৫ সালের কথা। না নিলেই নয় এরকম কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে লন্ডন থেকে কলকাতার পথে রওনা দেন তিন তরুণ। দেবেন ভট্টাচার্য, হেনরি অ্যানেভিল এবং কোলিন গ্লেনি। কলকাতা আসার পথে গ্রীস, সিরিয়া, ইরান, ইতালি, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ…ছোটোখাটো বিশ্বপরিক্রমা সেরে ফেলেন তাঁরা। নিছকই ঘুরে বেড়ানোর জন্য নয়। সবথেকে মূল্যবান যে জিনিসটি তাঁদের ঝোলায় ছিল, তা হল- একটি টেপ রেকর্ডার। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়ে ট্র্যাডিশনাল মিউজিক সংগ্রহ করাই ছিল তাঁদের অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।
দেবেন ভট্টাচার্য একাধারে ছিলেন ফিল্ড রেকর্ডিস্ট (সম্ভবত ভারতে প্রথম), লোকসংগীত সংগ্রাহক, কবি, অনুবাদক, রেডিও প্রযোজক, চলচ্চিত্র পরিচালক, স্বাধীন এথনোমিউজিকোলজিস্ট (নৃ-সংগীতজ্ঞ)। যাকে বলে, বহুমুখী প্রতিভা। তাঁর সঙ্গের দুই তরুণ, হেনরি অ্যানেভিল ছিলেন ফরাসি সাংবাদিক আর কোলিন ছিলেন ইংল্যান্ডবাসী, আর্কিটেকচারের ছাত্র।
এক জায়গায় আটকে থেকে কিছু সৃষ্টি করার পক্ষপাতী ছিলেন না দেবেন। সেকারণেই একেবারে মাঠে নেমে ঘুরে বেড়িয়ে নির্ভেজাল শব্দ শুনতে চেয়েছিলেন। ধরে রাখতে চেয়েছিলেন মানুষ আর প্রকৃতির নিজস্ব সুর। এই চাওয়ার জন্যই তিনি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন ‘ফিল্ড রেকর্ডিস্ট’ হতে পেরেছিলেন। লন্ডন থেকে কলকাতা অভিযানের পথে প্রতিটি দেশের প্রত্যেকটি গ্রাম, মফস্সল ও শহরের নিজস্ব সাউন্ডস্কেপ সুকৌশলে রেকর্ডারে ধরে রাখেন। পরবর্তীকালে যা পরিপূর্ণ রূপ পায় ‘প্যারিস টু ক্যালকাটা : মেন অ্যান্ড মিউজিক অন দ্য ডেজার্ট রোড’ নামের একটি অডিও ভিজ্যুয়ালে। সেই অডিও ভিজ্যুয়ালে সংরক্ষিত রয়েছে তাঁদের ৬ মাসের সম্পূর্ণ ভ্রমণবিবরণ।
শুধুই কি তাই! আফগানিস্তানের রাস্তায় অচেনা মানুষের একাকীত্বের প্রেমের গান, সাহারার শূন্যতার শব্দ শোনা, দুর্লভ সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন তাঁরা। এমনকি বেদুইনদের গুপ্ত জপ প্রক্রিয়া, এক দরবেশের নিষিদ্ধ পারফর্মেন্সও সুকৌশলে রেকর্ডারবন্দি করে ফেলেছিলেন দেবেন। এই অনবদ্য সফরনামার বিমূর্ত ও ঐতিহ্যবাহী সংগীতরেখা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংগীতপ্রেমী মানুষদের অনুপ্রাণিত করেছে।
১৩০ বছরের পুরোনো বারাণসীর পৈতৃকভিটেতে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম দেবেনের। গোটা একটা স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব সামলাতো তাঁর পরিবার। বাবা ছিলেন একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক। বারাণসীর আধ্যাত্মিক পরিবেশে ছেলেবেলা কাটানোর সুবাদে ঢাকঢোলের তালের ব্যঞ্জনা ও ঘণ্টার মুহুর্মুহু ধ্বনি তাঁর কাঁচা মনে ছাপ ফেলেছিল। তার বেশ কিছু বছর পর, ১৯৪৯-এ বাড়ি ছাড়েন। তখন তিনি যুবক। লুই থম্পসনের কবিতা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙালি কবি হিসেবে নতুন জীবন আবিস্কার করেন। শিল্পচর্চার প্রতি প্রেমই তাঁকে ইংল্যান্ড যাওয়ার দিকে ঠেলে দেয়, যেখানে তিনি জীবনের বেশ কিছু মূল্যবান বছর বিবিসির রেডিও প্রযোজক হিসেবে কাটান।
বিবিসিতে আসার সুবাদে ওয়ার্ল্ড মিউজিকের জ্যান্ত আর্কাইভ চলে আসে তাঁর হাতের মুঠোয়। লন্ডনে বেশ কিছু ভারতীয় বন্ধুর সাহায্যে একটি টেপ রেকর্ডারে ভারতীয় লোকসংগীত-সংগীতশিল্পীদের ধরতে শুরু করেন। হয়তো এখান থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রথম ভারতীয় হিসেবে তাঁর ফিল্ড রেকর্ডিং-এর যাত্রাপথ। ফিল্ড রেকর্ডিং-এর কাজে ভারতে ফিরে এলেও তাঁর এই অভিনব অভিযানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় টাকা। সেসময় ভালো মানের টেপ রেকর্ডার ও খালি ক্যাসেটের চড়া দাম ছিল। তবে, কাজ চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে কয়েকজন বন্ধুর বদান্যতায় ও নিজের চেষ্টায় প্রয়োজনীয় টাকাপয়সা জোগাড় করে ফেলেন। লেখালিখি করে রয়্যালটি বাবদ বেশ কিছু টাকা পেয়েছিলেন।৫টি রেকর্ডের জন্য রেকর্ডিং-এর যাবতীয় সামগ্রী নিয়ে ফিরে যান লন্ডনে। সেখানে রেকর্ডের কাজ সম্পন্ন করেন, যার মধ্যে ‘সংস্ অফ বোম্বে’ অ্যালবামটি তাঁর জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তাঁর এই অ্যালবাম। মধ্য পূর্বের দেশগুলি ঘুরে বেড়াতে গিয়ে সেখানকার মানুষদের জীবনচিত্র রেকর্ডারে তুলে ধরার প্রবল ইচ্ছে জাঁকিয়ে বসে তাঁর মনে। গাড়ি চালাতে জানতেন না, তাই ১২,০০০ মাইল জার্নির জন্য বন্ধু কোলিনের স্মরণাপন্ন হন। দুজনের শিল্পপ্রেম ছিল দু’ধরনের। দেবেন পছন্দ করতেন গান বাজনা, অন্যদিকে স্থাপত্যবিদ হওয়ার কারণে কোলিনের টান ছিল স্থাপত্যশৈলীর প্রতি। ভ্রমণাকাঙ্ক্ষায় রসদ জোগাতে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হন তাঁরা। চুক্তি হয়, কোলিন ১২,০০০ মাইল একটি মিল্ক ভ্যান চালাবেন, যদি তাঁকে চন্ডীগড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রসঙ্গত, ভারতের চন্ডীগড় শহরটির ‘আর্কিটেকটনিক’ রূপদান করেছিলেন তৎকালীন আধুনিক স্থাপত্যবিদ লে করবিউসিয়ার। প্রখ্যাত স্থাপত্যবিদের পাশাপাশি একজন উচ্চমানের চিত্রশিল্পী ছিলেন করবিউসিয়ার।
কোলিনের প্রস্তাবে দেবেন রাজি হওয়ার পর হেনরিও জুড়ে যান তাঁদের সফরসঙ্গী হিসেবে। অ্যাডভেঞ্চারের খিদেই তাঁদের নিয়ে চলে এক দেশ থেকে অন্য দেশের লৌকিক যাত্রায়। গোটা সফরে অন্তত ৪০ ঘণ্টা সাউন্ড রেকর্ডারে ধরে রেখেছিলেন তিনি আর সেই সুবাদেই সংগীতপ্রেমী ও অপেশাদার রেকর্ডিস্ট থেকে ক্রমে বিশ্বের সর্বকালের সর্বোচ্চ জনপ্রিয় এথনোমিউজিকোলজিস্টে রূপান্তরিত হন দেবেন ভট্টাচার্য। এই সফরের মাধ্যমে সারা বিশ্বের লোকজীবনে প্রবাহিত অনন্য সংগীতের মূর্ছনাকে এক নতুন দৃষ্টিকোণে মানুষের সামনে পেশ করতে পেরেছিলেন তিনি।
টেপ রেকর্ডার ও ক্যামেরার প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি ডায়েরি লেখার অভ্যাস ছিল তাঁর। সফরে বেরিয়ে যাঁদের সঙ্গে আলাপ হত, প্রত্যেকের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা লিখে রাখতেন সেই ডায়েরিতে। প্রায় ৬০ বছর সেই পাণ্ডুলিপি ধুলোয় পড়ে থাকার পর দেবেনের জীবনাবসান হলে, স্ত্রী ঝর্ণা ২০০১-এ মূল্যবান পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। প্রকাশিত হয় ‘প্যারিস টু ক্যালকাটাঃ মেন অ্যান্ড মিউজিক অন দ্য ডেজার্ট রোড’। ছ’মাসের সেই অবর্ণনীয় সফরের স্মৃতি আজও মনে করিয়ে দেয় এই তিন শিল্পপ্রেমী পাগলকে। একদিন গ্রীষ্মের দুপুরে শব্দের টানে, শিল্পের টানে ‘অন দ্য রোড’ বেরিয়ে পড়তে না পারলে হয়তো এক মূল্যবান সাউন্ড আর্কাইভ থেকে বঞ্চিত হতেন বিশ্বের তামাম শব্দ-সংগীতরসিক মানুষ।
১৯৭১-এ বাংলাদেশের রিফিউজি ক্যাম্পে ঘুরে ঘুরে ওপার থেকে আসা আবালবৃদ্ধবনিতার জীবনযাপন এবং লোকসংগীত রেকর্ড করেছিলেন দেবেন। তুলনাহীন সে কাজ। বাংলাদেশে মুক্তযুদ্ধ সংগ্রহশালায় আজও সেই রেকর্ডিং সংরক্ষিত আছে, যা বাংলার সম্পদ। অথচ…আক্ষেপ হয় শব্দ-শিল্পী রবার্ট মিলিস যাঁকে অবিস্মরণীয় ‘ফিল্ড রেকর্ডনিস্ট, কবি, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অপেশাদার নৃ-সংগীতজ্ঞ’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন, যাঁর রেকর্ডিংয়ের বেশ কয়েকটি অ্যালবাম ফ্রাঙ্ক জাপা সহ বিশ্বের বহু সংগীতশিল্পীকে প্রভাবিত করেছে, সেই দেবেন ভট্টাচার্যকে তাঁর জন্মভূমি ভুলে গেছে!
