চাহিদা কমলেও উস্তাদ বিসমিল্লাকে মাথায় করে রেখেছে বাংলার নহবৎ পার্টিরা

 

বাঁকুড়ার সত্যনারায়ণ নহবৎ পার্টি, ছবি: সঞ্জয় কালিন্দী

যাঁদের নহবৎ বসানোর মতো আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না, তাঁরা রেকর্ড বাজাতেন কিন্তু সচ্ছল পরিবারে বিয়ে মানে নহবৎ থাকবেই। এ ছিল বিয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সদর দরজার প্রবেশপথে তৈরি হত নহবৎখানা। চার-পাঁচজনের দল, পরনে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি-পাজামা, মাথায় টুপি, কখনও কখনও গায়ে জহর কোট। সকাল থেকে আরম্ভ হত সানাই, বিয়ের গোটা দিন সানাই বাজানোর রেওয়াজ ছিল। সানাইয়ের সুরই বুঝিয়ে দিত কখন, কী হচ্ছে। কনে-বাড়িতে বাসি বিয়ের দিন বাজত বিষাদের সুর। সুর মূর্চ্ছনায় বিষাদময় হয়ে উঠত কনে বিদায়ের পর্ব। নয়ের দশকেও এমন চিত্র ভালো মতো দেখা যেত, আজ যা অনেকটাই ম্লান। আদতে বিয়ে ব্যাপারটাই বদলে গেছে। আধুনিক বিনোদনের উপাদানের ভিড় বাড়তে বাড়তে অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে সানাইয়ের ব্যবহার। নহবৎ আজকের প্রজন্মের কাছে অচেনা। নহবৎখানার জায়গা দখল করেছে ব্যান্ড।

মাঙ্গলিক নহবৎ পার্টির প্রভাতকুমার পাত্র জানালেন তাঁদের নিজেদের কথা। প্রভাতকুমার ব্যবসায়িক দিকটা দেখেন। তাঁর বাবা বংশী পাত্র সানাইশিল্পী। প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা সানাইশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, বংশানুক্রমে।

বিয়েতে অবাঙালি সংস্কৃতির ‘মেহেন্দি’ আর হিন্দি গানের সুরে চটুল বিনোদন পছন্দ হাল আমলের বাঙালির। সংস্কৃতির আদানপ্রদান এক জিনিস আর নিজের সংস্কৃতিকে বিসর্জন দেওয়া আর এক। সানাইয়ের সুরে অন্তরাত্মায় যে মুর্ছনা তৈরি হতো, যে বোধ জন্ম নিতো, তার কদর কমেছে। শিকড়ের সঙ্গে সংস্কৃতির বাঁধন অনেকখানি আলগা হয়েছে। তবু কিছু কিছু বাড়িতে আজও সানাইশিল্পীদের ডাক পড়ে। কেমন আছেন তাঁরা? কথা হচ্ছিল এখনও সানাইশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, বেশ কয়েকটি নহবৎ পার্টির সঙ্গে।

সানাইকে বলা হয় মঙ্গলবাদ্য, যেকারণে বিয়েতে বা কোনও অনুষ্ঠানে সানাই বাজানোর রীতি। ফার্সি শব্দ শেহনাই থেকে সানাই – শোনা যায় মুঘল আমলেই এই নামকরণ হয়েছিল। যন্ত্রটি একান্তই এ উপমহাদেশের। এককথায় বাঁশির রাজা। বৈদিক সাহিত্যে, পোড়ামাটির ভাস্কর্যে সানাইয়ের উপস্থিতি লক্ষণীয়। উস্তাদ বিসমিল্লা খান, পণ্ডিত অনন্ত লাল প্রমুখ সানাইকে সংগীতের অচ্ছেদ্যে অবস্থানে নিয়ে গেছেন। তাঁদের জন্যই সানাই মঙ্গলবাদ্য থেকে শুদ্ধ সংগীতের মূল ঘরানার অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। আগে মূলত তিন ঘরানার চর্চা হতো। বেনারসে বিসমিল্লা ও অনন্ত ঘরানা এবং মহারাষ্ট্রে গাইকোয়াট ঘরানা। শিল্পীদের কথায়, তাঁরা বর্তমানে চন্ডিগড়, বেনারস, এলাহবাদ সহ বিষ্ণুপুর ঘরানা-য় সানাই চর্চা করছেন।

কথা বলে যা বুঝলাম, নহবৎ পার্টি আদতে বংশানুক্রমিক ব্যবসা। এক একটি পরিবার কয়েক প্রজন্ম যাবৎ এই পেশায় যুক্ত। বাড়িতেই পূর্বপুরুষদের থেকে সানাই শেখা, এভাবেই বংশ পরম্পরায় কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা। বলা ভালো শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁরা। কথা হচ্ছিল বর্ধমানের জয়গুরু নহবৎ পার্টির সঙ্গে। প্রাণ প্রতিহারবাবু জানাচ্ছিলেন, শহরের দিকেই তিনি কাজ পান মূলত। গ্রামে কাজের পরিমাণ কম। প্রাণ প্রতিহারবাবু বাবা-ঠাকুরদার কাছে সানাই বাজানো শিখেছেন। বলছিলেন, “আমার বাবাদের সময় প্রচুর কাজ ছিল। এত চাহিদা ছিল যে বাজিয়ে শেষ করা যেত না। সব জায়গা বাজাতে যাওয়ার সময় থাকত না। তারপর একেবারে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছিল। এখন কাজের অবস্থা একটু ভালোর দিকে। করোনার সময় খুব খারাপ অবস্থা ছিল। বিয়ে ছাড়াও, বিভিন্ন পুজো, সম্মেলন, প্রতিযোগিতা; এ’সব অনুষ্ঠানে বাজাতে যাই। সানাই শিল্প টিকে আছে। আমাদের ছেলেপুলেরা আসছে, শিখছে টুকটাক।” তাঁর দলে পাঁচজন রয়েছে, সানাই, সুর সানাই, হারমোনিয়াম, বেহালা আর তবলা থাকে। এক একজন এক একটি বাজান। বলছিলেন, “খরচ হয় ভালোই। যন্ত্রপাতি কিনতে হয়। খরচা অনুপাতে পয়সা পাওয়া যায় না। চাহিদা অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাই না।” 

মাঙ্গলিক নহবৎ পার্টি, ছবি: প্রভাতকুমার পাত্র

মাঙ্গলিক নহবৎ পার্টির প্রভাতকুমার পাত্র জানালেন তাঁদের নিজেদের কথা। প্রভাতকুমার ব্যবসায়িক দিকটা দেখেন। ফোনের মাধ্যমেই যাবতীয় কাজ আসে, যোগাযোগ হয়। তাঁর বাবা বংশী পাত্র সানাইশিল্পী। প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁরা সানাইশিল্পের সঙ্গে যুক্ত, বংশানুক্রমে। প্রভাতের প্রিয় সানাইশিল্পী উস্তাদ বিসমিল্লা খান। বললেন, “ওঁকে নিয়েই আমরা করে খাচ্ছি। উনি ক্লাসিকাল জগতের মাস্টার লোক। আমাদের তো ওঁর মতো যোগ্যতা নেই, সাধ্যমতো অনুসরণ করে চলি। মূলত বিষ্ণুপুর ঘরানায় ইমন, ভৈরবীর গজল, বাগেশ্বরী, শিবরঞ্জনী রাগ বাজিয়ে থাকি। সাধারণত আমার বাবা-ই বাজায় এখন, আমি সঙ্গে থাকি।” প্রভাতকুমারের কথায়, “বিয়েতে, অন্যান্য অনুষ্ঠানে সানাইয়ের চাহিদা থাকে। খুব যে ভালো চলছে সে’রকম নয়। টুকটাক চলছে আরকি। শহরের দিকে এখন বেশি চলছে, আসানসোল-দুর্গাপুরে বেশি কাজ পাই। দেওঘর, কলকাতার গড়িয়ায়, বারাসাতে, রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের মেলায় আমরা বাজিয়ে এসেছি। আমাদের চারজনের সেট-আপ। সানাই, সুর সানাই, বেহালা, তবলা থাকে। রাগ প্রধান বাজানো হয়। গজল থাকে।” বলছিলেন, খুব একটা লাভ থাকে না। গাড়ি ভাড়া, যাতায়াত খরচ নিয়ে প্রায় সমান সমান হয়ে যায়। চোদ্দ-পনেরো হাজারে এক একটা কাজ হয়। আহামরি লাভ হয় না।

প্রভাতকুমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরলেন, “এখন পরিস্থিতি খারাপ। আগামীদিনে চাহিদা বাড়ার মতো কিছু বুঝছি না। সামনে বৈশাখ মাস, বিয়ের লগ্ন আছে। দুটো কী চারটে কাজ পাচ্ছি। খুব কমে যাচ্ছে কাজ। এখন ডিজে, স্যাক্সোফোনের অনুষ্ঠান হয়। সানাই তো সবাই একদম ভুলে গেছে। বিয়েতে অবাঙালি কালচার ঢুকে গেছে। যেগুলো আমাদের বাঙালিদের হয় না বা ছিল না, যেমন ধরুন মেহেন্দি। এসব জিনিস এখন বেশিরভাগ বাঙালিরাই করছে দেখছি। জিনিসটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। সবাই আধুনিক হতে যাচ্ছে। বাঙালি বিয়েবাড়ির যে ভাব, সেটা এখন আর নেই। যুগের পরিস্থিতি অনুযায়ী আমাদের চলতে হয়।”

বাঁকুড়ার সত্যনারায়ণ নহবৎ পার্টির সঞ্জয় কালিন্দীর একই মত। তাঁর কথায়, বিয়েবাড়ি মানেই সানাই ‘মাস্ট’ ছিল। কিন্তু এখন সে জায়গার দখল নিচ্ছে স্যাক্সোফোন। সানাইয়ের চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। তবে কিছু কিছু ডাক আসে। অসম, নদিয়া থেকে ডাক আসে। শহরের দিকে চাহিদা বেশি। গ্রামে কম। দিনের সময় অনুযায়ী ইমন, দরবারী, বেহাগ, রাগেশ্রী, বাগেশ্রী, শিবরঞ্জনি, আসাবরি, ভিমপলাশী, ভূপালি, পূরবী, কাফি রাগগুলি বিষ্ণুপুর ঘরানায় বাজিয়ে থাকেন তাঁরা।

সঞ্জয়ের দাদু, মদন কালিন্দী সানাই বাজান, বয়স প্রায় ৬৭-৬৮ বছর। চারজনের দলে তিনিই সানাইশিল্পী। জিজ্ঞাসা করছিলাম, সামনে বৈশাখ মাস, বিয়ের মরশুম কাজ এসেছে? বললেন, “এখনও একটাও কাজ আসেনি।” তবে সঞ্জয় আশাবাদী, আগামী দিনে সানাইয়ের ভালো সম্ভাবনা তৈরি হবে। বললেন, “অন্য কিছু জানি না, সানাই থাকবেই। এখন কেউ নজর দিচ্ছে না যন্ত্রটার দিকে কিন্তু ভবিষ্যতে একদিন ঠিক কাজে লাগবে। এখন সন্ধ্যায় দাদুর কাছে বসি। একটু একটু করে শিখছি।”

সামগ্রিকভাবে একটা ছবি উঠে আসে, বাঙালির অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো বিয়েতেও অবাঙালি রীতিনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। যার জেরে নহবৎ, সানাইয়ের মতো বাঙালি ঐতিহ্যের ধারক-বাহকও আজ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে নিজেদের শিল্প ও আত্মগরিমা। সানাইশিল্পের আশু পুনরুজ্জীবন প্রয়োজন। কথা বলে বুঝেছি, সানাইশিল্পীদের কাজ চাই এবং ভীষণভাবে চাই। তবেই এই শিল্প বাঁচবে।

Written by