রঞ্জাবতী সরকার, ৯০-এর দশক ও নৃত্যশিল্পে নারীবাদী চেতনার নতুন ভাষা

পর্ব ৩৫

‘নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু’ ধারাবাহিকের সাপ্তাহিক কলামটির কিঞ্চিৎ গুরুত্ব এখানেই যে একজন সাধারণ মানুষের নাচের ভালোলাগা, মন্দলাগা নিয়ে, শিল্পীদের নিয়ে লেখা। নাচের মতো এত বিরাট একটা শিল্প এবং ততোধিক প্রতিভাধর শিল্পীদের নিয়ে লেখা বাংলা ভাষায় কম তৈরি হয়েছে। সংগীতশিল্পীদের নিয়ে বড়ো বড়ো কাগজে শুধু অনুষ্ঠানের কেজো সমালোচনা নয়, শিল্পীদের রঙিন জীবনযাত্রা নিয়েও সাহিত্য হয়েছে। সে-ব্যাপারে নৃত্যশিল্পীদের ভাগ্য শিকে ছেঁড়েনি। তা বলে এই লেখক কি অনেক কিছু লিখে ফেলেছেন? সব শূন্যস্থান পূরণ হয়ে গেছে? তা নয়। কিন্তু নৃত্যশিল্পীদের যে বাঙ্ময় জীবন, নৃত্যশিল্পের যে ঘাতপ্রতিঘাতে ভরা গূঢ় প্রশ্নের জগৎ- সেগুলি নিয়ে কিছু শব্দ লিখিত হয়েছে, এটা গুরুত্বপূর্ণ। কখনও স্মৃতির ঝাঁপি খুলে গেছে কখনও ব্যক্তিগত জীবন উঠে এসেছে। এসব লেখাকে কেউ ধৃষ্টতা মনে করতে পারেন, আবার এগুলোই হয়তো নৃত্যশিল্পীরা যে রক্ত-মাংসের মানুষ সেটা একটু হলেও কোথাও চেনায়। নৃত্যশিল্প ও নৃত্যশিল্পীদের কথা উঠলে ওই নাট্যশাস্ত্র খুলে বসার যে-রীতি কিংবা নৃত্যশিল্পীদের কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ভাবে জানার যে অকারণ দম্ভ সেসব থেকে ‘নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু’ অনেক দূরে। কিন্তু, এই সাহিত্য, শিল্পী-মানুষগুলোকে যেন অনেকদিন চেনে। এই লেখার মাঝে হয়তো ঘুঙুর বাজে। কেউ শোনে কেউ শুনতে নারাজ। তা বলে নৃত্যশিল্প ও শিল্পীদের ঘিরে এ-লেখাগুলির যে একলব্য-ব্রত, সেটা থেকে কি আর সরে আসা যায়?

তখন আমাদের তারুণ্য। তখন আমাদের বহির্বিশ্বের জানালা বলতে খবরের কাগজ, কিছু পত্রিকা আর দূরদর্শন। এমনই এক গ্রীষ্মের দুপুরে ‘ছুটি ছুটি’ অনুষ্ঠানের পরই একটা নাচের অনুষ্ঠান শুরু হল। ডিডি সেভেন বোধহয় তখন নতুন এসেছে। অনুষ্ঠানটি ইংরেজিতে। প্রকৃতিপ্রেম বিষয়ক। এর আগে আমাদের দেখা নাচের অনুষ্ঠান মানে ‘ঋতুরঙ্গ’ টাইপের ছোটো ছোটো অনুষ্ঠান। খুব বেশি হলে রবীন্দ্রনৃত্যনাট্য। আর নয় তো রাত দশটা নাগাদ ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশনের জন্য ডিডি ওয়ানে শাস্ত্রীয়নৃত্য। কিন্তু এই অনুষ্ঠানটি যার নাম ‘অরণ্য অমৃতা’ তার কুশীলবরা সব মোটামুটি বাঙালি কিন্তু শাড়িগুলো কী সুন্দর ধুতির মতো অন্যরকম করে পরা! চুলের কারুকাজ অনন্য। আর নাচ? সে-নাচ একবার দেখলে আর চোখ ফেরানো যায় না। চোখের সামনে থেকে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট যে কী হয়ে গেল যা আমাকে যারপরনাই মুগ্ধ করে দিয়ে গেল। এমন অভিজ্ঞতা জীবনে আমার বারবার হয়নি।

রঞ্জাবতী সরকারের নাচে, প্রতিটি ভঙ্গিমায়, মুদ্রায়, ওই ভাস্কর্যসম শরীরে কী একটা বিদ্যুৎ খেলে যেত এবং দর্শককে আষ্টেপৃষ্টে ধরত যা থেকে আর মুক্তি ছিল না। আর কে না মুগ্ধ ছিল ওই নাচে? কলকাতায় কোনও একটা অনুষ্ঠান হলেই পত্র-পত্রিকায় কত লেখালেখি।

চরিত্রলিপিতে একটা নাম দেখলাম রঞ্জাবতী সরকার (Ranjabati Sircar)। এরপর থেকে এই নামটা যেখানেই দেখেছি আমার চোখ আটকে গেছে। খবরের কাগজ হলে বাড়ি নিয়ে এসে পড়েছি, মূলত মেয়েদের জন্য একটি প্রখ্যাত পত্রিকা বের হত, আমার এক শিক্ষিকা সে-পত্রিকা বাড়িতে রাখতেন, সেটাতে রঞ্জাবতী সরকারকে নিয়ে কোনও আর্টিকেল বেরোলেই পত্রিকাটা আমি বগলদাবা করতাম। কিন্তু কেন? নব্বইয়ের দশকের মাঝের বছরগুলোতে, যখন এই লেখক ছোটো ক্লাসে পড়ে তখন এত তীব্রতায় সে কেন রঞ্জাবতী সরকারের নামটুকু লেখার অক্ষরে দেখার জন্য হাঁকুপাকু করতো? এর উত্তর বোধকরি যাঁরা সামনে থেকে ওই নাচ দেখেছেন তাঁরা আরও ভালো দিতে পারবেন। রঞ্জাবতী সরকারের নাচে, প্রতিটি ভঙ্গিমায়, মুদ্রায়, ওই ভাস্কর্যসম শরীরে কী একটা বিদ্যুৎ খেলে যেত এবং দর্শককে আষ্টেপৃষ্টে ধরত যা থেকে আর মুক্তি ছিল না। আর কে না মুগ্ধ ছিল ওই নাচে? কলকাতায় কোনও একটা অনুষ্ঠান হলেই পত্র-পত্রিকায় কত লেখালেখি। ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেনদের লেখায় কতবার কত রকম উল্লেখ, স্মৃতিচারণ। অনিতা রত্নম, গীতা চন্দ্রণ, মল্লিকা সারাভাই, দক্ষা শেঠ, ওস্তাদ দেবু, নভতেজ জোহার, মধুবনী চট্টোপাধ্যায়- কে না পরবর্তীকালে রঞ্জাবতী সরকারের নাচ নিয়ে প্রশস্তি লিখেছেন! নব্বইয়ের দশকে দেখা গেছে বহু প্রতিষ্ঠিত শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী তাঁদের অনেক প্রযোজনাতে সৃজনশীল নৃত্যের আঙ্গিক এনেছিলেন। কেউ প্রত্যক্ষভাবে রঞ্জাবতীর প্রভাবের কথা স্বীকার করতেন কারও নাচ দেখলে বোঝা যেত আসলে ছোঁয়াচটা কার। মঞ্চোপস্থিতি রঞ্জাবতীর তীক্ষ্ণ ছিল তো নিশ্চয়ই কিন্তু সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও পুরোনো ভিডিওতে ওঁর নাচ যখন দেখেছি কিংবা ছবি, তাতে বারবার মনে হয়েছে নারীর সৌন্দর্য ছাপিয়ে উনি চরিত্র হয়ে উঠতে যথেষ্ট পটু ছিলেন। যেটা খুব উচ্চমানের শিল্পী ছাড়া সম্ভব নয়।

নব্বইয়ের দশকে রঞ্জাবতী সরকার নিজস্ব ভাবনা ও উপস্থাপনায় বদলে দিয়েছিলেন নাচের গতানুগতিক পরিভাষাকে। তাঁর নৃত্যরতা শরীরের ভঙ্গিমায় প্রকাশ পেয়েছিল উত্তর আধুনিক সময়ের আখ্যান। আর সেই আখ্যানের মধ্যে দিয়েই উপস্থাপিত হয়েছে নারীবাদী চেতনার নতুন ভাষা।

নৃত্যশিল্পী মানে একটা দেখার বস্তু যেমন আর মহিলা নৃত্যশিল্পী হলে তো কথাই নেই। কিন্তু খুব কম শিল্পীই পারেন দর্শকের সেই খানিক লোলুপ অবলোকনকে নাচের মধ্যে ঢুকিয়ে একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিতে। যাতে নাচ দেখে এসে এটুকু মনে না হয় শিল্পী দেখতে খুব সুন্দর। যেন মনে থেকে যায় কী অপূর্ব একটি উপস্থাপনার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এলাম। অভিনয়েও নিশ্চয়ই রঞ্জাবতীর প্রতিভা ছিল। তা না হলে অপর্ণা সেনের ছবিতেও রঞ্জাবতীকে কাস্ট করতে চাওয়ার কাহিনি কোথাও পড়েছিলাম মনে পড়ে। রঞ্জাবতী সরকার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের কৃতি ছাত্রী এবং অনায়াসেই অধ্যাপনাতে মনোনিবেশ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন নাচ। এই আত্মত্যাগের জন্য, প্রথম থেকেই ঠিক করে রাখা জীবনের অগ্রাধিকারের জন্য ওঁর নাচ ছিল শিল্প হিসেবে এত উঁচু পর্যায়ের। নাচে শিক্ষক হওয়া এক জিনিস, পারফর্মার হয়ে উঠতে পারা আর এক জিনিস এবং পারফর্মার হিসেবে প্রতিটি প্রযোজনাতেই দর্শকদের মুগ্ধতা ধরে রাখতে পারেন যিনি, তিনি অচিরেই লেজেন্ডে পরিণত হন। রঞ্জাবতী সরকার প্রকৃত অর্থেই ছিলেন একজন লেজেন্ড।

 

আর কী অপূর্ব সব ছবি! এখনও দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। ব্যক্তি রঞ্জাবতী সরকারকে দেখিনি, সামনে থেকে ওঁর নাচও দেখিনি কিন্তু একটা কথা না বললে নয় ওই মেয়েদের পত্রিকাতেই আজ থেকে তিরিশ-বত্রিশ বছর আগে সমকামিতা বিষয়ক একটা মতামত নেওয়া হয়েছিল। নামোল্লেখ করবো না কিন্তু আজকের বহু প্রতিষ্ঠিত মানুষ সেখানে বলেছিলেন যে সমকামিতা অস্বাভাবিক এবং কেউ কেউ বলেছিলেন প্রকৃতিবিরূদ্ধ কারণ পশুপাখিদের মধ্যে তা দেখা যায় না। একমাত্র রঞ্জাবতী সরকার তাতে বলেছিলেন, যে-কোনও যৌনতাই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একে অপরের সঙ্গে কী সম্পর্ক রাখবেন তা কেউ ঠিক করে দিতে পারে না। ভাবা যায়! একটা মানুষ সময়ের থেকে কতটা এগিয়ে থাকলে এমন কথা বলতে পারেন?

নব্বইয়ের দশকে রঞ্জাবতী সরকার নিজস্ব ভাবনা ও উপস্থাপনায় বদলে দিয়েছিলেন নাচের গতানুগতিক পরিভাষাকে। তাঁর নৃত্যরতা শরীরের ভঙ্গিমায় প্রকাশ পেয়েছিল উত্তর আধুনিক সময়ের আখ্যান।

এর বহু বছর পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুবাদশিক্ষার একটা সান্ধ্যকালীন কোর্সে ভর্তি হয়েছি। খুব ভালো ক্লাস চলছে আর সবচেয়ে বড়ো কথা বাংলা, ইংরেজি আর তুলনামূলক সাহিত্যের তাবড় অধ্যাপক আমাদের পড়াচ্ছেন। একদিন সুমুখশ্রী, দাড়িওয়ালা এক প্রফেসর এলেন। অপূর্ব পড়ালেন। অনুবাদ কীভাবে ঝরঝরে করা যায় শেখালেন। কিন্তু মেজাজটা তাঁর স্কুলশিক্ষকের মতো। বেশ রেগে রেগে থাকেন। আমাদের কোর্স কো-অর্ডিনেটর শ্রদ্ধাঞ্জলি তামাং আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে সেই অধ্যাপককে বলেছিলেন, “ও ভালো কবিতা লেখে। কবিতার বই বেরিয়েছে।” উনি সঙ্গে সঙ্গে চোখের পাশ দিয়ে আমায় দেখে বললেন, “সব বাঙালির জীবনে অন্তত একটা কবিতার বই আছে!” আমি হেসে উঠি। আবার সার্টিফিকেট দেবার দিন উনিই পিঠে চাপড় মেরে বলেছিলেন, “এবার অনুবাদের বই করতে হবে!” সেই বছরের শেষের দিকে শীতকালীন এক কবিতা উৎসব থেকে ফিরছি এক গাড়িতে বিশিষ্ট ঘোষক, আবৃত্তিকার ও কবি পঙ্কজ সাহার সঙ্গে। পঙ্কজদাকে অনুবাদশিক্ষার ক্লাসের কথা, সেই অধ্যাপকের কথা বলছি। পঙ্কজদা বললেন, “স্যমন্ত্যক ওই রকমই। বড়ো ভালো ছেলে। ওদের বাড়ি অনেক গিয়েছি। তখন রঞ্জা বেঁচে ছিল।” আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম কথাগুলো শুনে। তারপর স্যমন্ত্যকদাও চলে গেলেন যখন অনেক জায়গায় পড়লাম স্যমন্ত্যক দাস ও রঞ্জাবতী সরকার-এর একসময়কার যৌথজীবনের কথা।

১৯৯৯ সালে রঞ্জাবতী সরকারের অকালপ্রয়াণ-এর পর অনেক কাগজে লেখালেখি হয়েছিল। তারপর আস্তে আস্তে জনমানস থেকে সেই স্মৃতিও ফিকে হয়ে যায়। মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার-এর মৃত্যুর পর সেই রকম প্রযোজনাও তেমন গড়ে ওঠেনি। তবে ‘ডান্সার্স গিল্ড’ আজও আছে এবং জোনাকি সরকার সেটা চালিয়েও নিয়ে চলেছেন। রঞ্জাবতী সরকারের মতো প্রতিভাশালী নৃত্যশিল্পী তো আর বারবার আসেন না, তাই যতই ধুতি করে শাড়ি পরা হোক, ওইরকম মেকআপ করার চেষ্টা চলুক যেটা বহু নৃত্যদল করে থাকে কিন্তু রঞ্জাবতী সরকারের মতো নাচ, তাঁদের উচ্চমানের নৃত্যসাহিত্য আর মঞ্চোপস্থিতি-সেগুলোর পুনর্নিমাণ এখন আর একেবারেই সম্ভব নয়।

ছবি কৃতজ্ঞতা: ডান্সার্স গিল্ড

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by