
সেদিন পূর্ণিমা। সারা আকাশ জুড়ে ঝকঝকে চাঁদের আলো। লেক রোডের রাধামাধব কুঞ্জ সেজে উঠেছে। এই বাড়িতে শ্রীরাধিকা ও শ্রীকৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ নিত্যপূজিত। প্রায় পঞ্চাশ বছর একইরকম ভাবে তাঁদের আরাধনা চলে আসছে। বাড়ির সর্বময় কর্ত্রী শ্রীমতি নবনীতা বোস (Nabaneeta Bose) দরজা খুলে দেন। তাঁকে আমরা গোপাদি বলে ডাকি। রাশভারী চেহারা। কেন্দ্রীয় সরকারের আইন বিভাগের উচ্চপদে চাকরি করেছেন। কিন্তু ভদ্রতায়, আভিজাত্যে যেন মাটির মানুষ। রাধামাধবের জন্য সমস্ত ভোগ রান্না করেছেন তিনিই। তাঁর হাতের বিশেষ সুস্বাদু আতার পায়েস সুবিদিত। বছরে পাঁচ-সাতটি অনুষ্ঠান এ-বাড়িতে রাধামাধবের জন্য হয়ে থাকে। কিন্তু সেসব অনুষ্ঠান শুধু পুজোআচ্চা নয়। কলকাতার শাস্ত্রীয়নৃত্যের একেকটি সুবৃহৎ সম্মেলন।

আজ আমি যেমন রাধামাধবকুঞ্জ-এ বৈঠকের ব্যবস্থা করেছি, তেমন কলকাতার আরও অনেক বাড়িতে আরও অনেক মানুষ যদি ছোটো ছোটো অনুষ্ঠান শুরু করেন, তবে সংস্কৃতি আরও এগিয়ে যায় না কি? শুধু সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা কেন! সকলে মিলে যদি একেকটি পাড়ায়, সংগঠনে নাচের অনুষ্ঠানের নিয়মিত আয়োজন করি তবে তো সমাজেরও উপকার হয়। – নবনীতা বোস
শ্রীমতি নবনীতা বোস নৃত্যশিল্পের একজন প্রকৃত পৃষ্ঠপোষক। তিনি বলেন, “পৃষ্ঠপোষোক কথাটা বেশ ভারী। আমি এতকিছু নই। ঠাকুরের জন্য যতটুকু ব্যবস্থা করতে পারি আর কী। আমাদের বাড়ির এই অনুষ্ঠানগুলি আজ প্রায় দশ-বারো বছর আগে শুরু হয়েছিল। এখন প্রতিটি অনুষ্ঠানই একেকটি বৈঠকে পরিণত হয়েছে। এবং এগুলো আয়োজন করতে গিয়ে দেখি যে কলকাতায় এত ট্যালেন্টেড সব নৃত্যশিল্পী আছেন যাঁরা ক্রমাগত এই নৃত্যধারাগুলির নিয়মিত চর্চা করে চলেছেন যে, কোনও প্রশংসাই যেন তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। হ্যাঁ, আমি হয়তো এই নৃত্যশিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠানগুলো করবো বলে একশো বছরেরও বেশি পুরোনো এই বাড়িটাকে রিডিজাইন করেছি, হয়তো আমার ডাকে সাড়া দিয়ে শহরের কিছু মান্যগণ্য মানুষেরা আসেন অনুষ্ঠান দেখতে আর তাতে আরও অনেক জায়গায় আরও কিছু অনুষ্ঠান হবার সুযোগ তৈরি হয় কিন্তু নৃত্যশিল্পীদের যা পরিশ্রম, যে অধ্যবসায় সেই তুলনায় আমাদের এই উদ্যোগগুলি নগন্য।”

আমরা অবশ্য তা বলতে পারি না। নৃত্যশিল্পের প্রচার-প্রসারে সরকারি উদ্যোগ যখন ক্ষীণতর হচ্ছে, যখন ‘পে অ্যান্ড পারফর্ম’-এর মতো কর্কটরোগ সংস্কৃতিতে ঢুকে আসছে, যখন রিয়েলিটি শো নৃত্যশিল্পের ধৈর্য, গড়ে-ওঠা আর সৌন্দর্যবোধ গ্রাস করে নিচ্ছে আর যখন এসবে নতুন নতুন ছেলেমেয়েরা বিফলমনোরথ হচ্ছে তখন গোপাদিদের এমন উদ্যোগগুলির মূল্য অপরিসীম। কলকাতায় ধনী মানুষেরা যথেষ্ট আছেন, কলকাতায় অনেক বড়ো বড়ো বাড়ি আছে, কিন্তু কজন আর তাঁদের আঙিনা নৃত্যশিল্প চর্চার জন্য খুলে দিচ্ছেন? আর কজনই বা চিন্তা করছেন শিল্পীদের নিয়ে? আমার কৌতূহল হয় গোপাদি এই উদ্যোগে সামিল হলেন কীভাবে? তিনি মুখে হালকা হাসি রেখে বলেন, “আসলে ছোটোবেলাতে অনেক নাচ করেছি। মনে আছে যখন ক্লাস টু-তে পড়ি আমাদের স্কুল বেলতলা গার্লসের শেফালিদি একটি ইংরেজি গানের ওপর আমাদের নাচ করিয়ে ছিলেন। সেই আমার প্রথম স্টেজে ওঠা। তারপর অবশ্য গলায় সুর ছিল বলে আমাকে গানে দেওয়া হয়েছিল। আমার মায়ের দূর সম্পর্কের একজন ভাই মদন বোস আসতেন আমাকে গান শেখাতে। মদন মামা ছিলেন দৃষ্টিশক্তিহীন। তিনি প্রথম গান আমায় তুলিয়ে ছিলেন লাল ঝুটি কাকাতুয়া। আমাদের ডোয়ার্কিনের একটা হারমোনিয়াম ছিল। সেটা বাজিয়ে আমি গান গাইতাম। পরবর্তীকালে আমাদের বকুলবাগান রোডে থাকতেন পণ্ডিত এ কানন ও মালবিকা কানন; আমি বেশ কয়েক বছর তাঁদের কাছে তালিম নিই। আর সে সময়ে আরেকটা জিনিস হত- মণিমালা। আজকালকার ছেলেমেয়েরা যেমন ফেসবুকে গ্রুপ করে আমাদের তেমন ছিল সাংস্কৃতিক দল মণিমালা। আমাদের সংগঠনের নাম ছিল বৈজয়ন্তী মণিমালা। নাচ-গান-নাটকের পাশাপাশি আমরা নানা রকমের খেলাধূলা করতাম। পাহাড়ে ট্রেকেও যেতাম। অনেক কিছুই করেছি, কিন্তু নাচ আমাকে ছাড়েনি। লম্বা ছিলাম বলে স্কুল-কলেজে আমাকে সব নৃত্যনাট্যে হিরো বানানো হত! আমি কচ ও দেবযানীতে কচের চরিত্র, শ্যামাতে বজ্রসেন, চণ্ডালিকার আনন্দ, চিত্রাঙ্গদাতে অর্জুন- এগুলো নিয়মিত করেছি। তারপর অফিসে নাচ-গানের পাশাপাশি নিয়মিত নাটক করতাম। কেন্দ্রীয় সরকারি অফিস হবার দরুন হিন্দি নাটকের প্রচলন ছিল আর হিন্দিটা বেশ পরিষ্কার বলতে পারি বলে চুটিয়ে সেসব নাটকে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করতাম। আমি বিভিন্ন মহিলা-সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কলকাতার বিভিন্ন ক্লাবের মেম্বারশিপ আমার আছে বলে সেখানকার কালচারাল উইঙের সঙ্গেও আমি যুক্ত আছি। এবং সব জায়গাতেই আমি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকি।”

আর নাচ? “দ্যাখো, নাচের মতো, নৃত্যশিল্পের মতো উচ্চমানের সংস্কৃতি তো আর কিছু হয় না। কিন্তু আমি মনে করি নৃত্যশিল্পীদের যা ডেডিকেশন, যা পরিশ্রম তাতে তাঁদের শিল্প নিয়ে আমজনতার মধ্যে আরও চর্চার প্রয়োজন। এই যে দুর্গাপুজো বা অন্যান্য উৎসবে কত সংগীতশিল্পীদের ডাকা হয়, তেমন নাচের শিল্পীদেরও তো একই সম্মান দিয়ে পারিশ্রমিক দিয়ে আহ্বান করা উচিত। নয় কি? আজ আমি যেমন এই রাধামাধবকুঞ্জ-এ বৈঠকের ব্যবস্থা করেছি তেমন কলকাতার আরও অনেক বাড়িতে আরও অনেক মানুষ যদি ছোটো ছোটো অনুষ্ঠান শুরু করে তবে সংস্কৃতি আরও এগিয়ে যায় না কি? শুধু সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা কেন! সকলে মিলে যদি একেকটি পাড়ায়, সংগঠনে নাচের অনুষ্ঠানের নিয়মিত আয়োজন করি তবে তো সমাজেরও উপকার হয়। আজকের প্রজন্মের তো জানা প্রয়োজন শাস্ত্রীয়নৃত্য আসলে কী অপূর্ব জিনিস! আমাদের দেশের শিকড় শাস্ত্রীয়নৃত্য। আমাদের গর্ব। যাঁরা এগুলি এত অসুবিধার মধ্যেও চর্চা করে চলেছেন, আমাদের তো উচিত তাঁদের পাশে দাঁড়ানো। আমার বাড়িতেই তো কত শত তরুণ শিল্পীদের প্রতিবার দেখি আর অবাক হই। এখনও কত ছেলেমেয়ে শাস্ত্রীয়নৃত্যের চর্চা করছে। আমাদের তো কর্তব্য আছে তাদের প্রতি। আমাদের সংস্কৃতির প্রতি। আছে না? তবে হ্যাঁ সব অনুষ্ঠানের শেষে কিন্তু শিল্পীদের সঠিক ও যোগ্য পারিশ্রমিকটি আমাদের দিতে হবে।”

সে তো বটেই। নবনীতা বোস তথা গোপাদিদের মতো এমন মানুষগুলো যতদিন নৃত্যশিল্পের সংগঠনের সঙ্গে থাকবেন ততদিন আশা আছে। আমি গোপাদির বাড়ির অনুষ্ঠান শেষ করে বেরিয়ে আসি আর ভাবি আজও কলকাতার বুকে এমন মানুষ আছেন যাঁরা নৃত্যশিল্পের উন্নতির জন্য কত কাজ করে চলেছেন। এঁরা বেঁচে থাকুন। সমাজের জন্য, সংস্কৃতির জন্য এঁরা খুবই জরুরি।
______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

