গুরু অসীমবন্ধু ভট্টাচার্য : নৃত্যমঞ্চে এনেছেন যৌন-সংখ্যালঘুর কথা থেকে ঘুঙুরের আত্মজীবনী

পর্ব ৩১

সেই কত বছর আগে উত্তম মঞ্চে দেখেছিলাম ‘শিখণ্ডিনী’। কথকের মতো শাস্ত্রীয়নৃত্যের আঙ্গিকে মহাভারতের এক অনামী চরিত্রকে, তার ঘাতপ্রতিঘাতকে এত অপূর্ব যত্নে ফুটিয়ে তোলা এবং খুব গুঢ় প্রশ্ন কিছু রেখে যাওয়া, সহজ কাজ নয়। তবে কলকাতার গর্ব গুরু অসীমবন্ধু ভট্টাচার্য (Ashim Bandhu Bhattacharya) সারাজীবনই বহু কঠিন কাজকে সহজ করে নিয়েছেন। সেই শিখণ্ডিনী-তে উনি একটা গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা জুড়ে দিয়েছিলেন যে শিখণ্ডীকে মহাভারতের মতো মহাকাব্যও কেবল ব্যবহার করেছিল মাত্র। তাঁর শৌর্য তো কম ছিল না। কেবল ভীষ্মপিতামহের মৃত্যু রচনা করতেই কী শিখণ্ডীর প্রয়োজন ছিল? তারপর তাঁর চরিত্রের বিস্তার মহাভারতে আর পেলাম না কেন? তবে কি সমাজে আজ লিঙ্গের বেড়াজাল যাঁরা মানেন না, এক লিঙ্গ থেকে অন্য লিঙ্গে রূপান্তরিত হতে যাঁরা প্রস্তুত, ওটাই যাঁদের পরিচয়- সেইসব মানুষদের অপাংক্তেয় করে রাখার শিক্ষা কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাসের মহাভারত থেকে আমাদের প্রাপ্ত হয়েছে?

আমি এমন একটা পরিবারে বড়ো হয়েছি যেখানে আমার মা বড়ে গুলাম আলি খানের শিষ্যা, দিদি ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা-ক্রিকেটার এবং আমার দাদাও ভারতীয় ক্রিকেটের জুনিয়র দলের সদস্য ছিলেন। কিন্তু আমি নাচ শিখছি আর দিদি ক্রিকেট- এটা যেন আমাকে হাসির পাত্র করে তুলেছিল। কারণ তখনকার দিনে মানে আজ থেকে পঞ্চান্ন বছর আগের কলকাতায় কেবল মেয়ে মানে নাচ আর ছেলে নাচ শিখছে মানে মেয়েলি।

অসীমদা এ-ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা পোষণ করেন। তিনি বলেন, “হ্যাঁ, তা তো বটেই। ভীষ্মপিতামহের মৃত্যুর পর কোথায় গেল শিখণ্ডী? রূপান্তরকামী মানুষদেরও তো আমাদের সমাজ একইরকম ব্রাত্য করে রাখে। এই প্রশ্নগুলো জরুরি। কিন্তু কী জানো নৃত্যশিল্প যে সেই জিজ্ঞাসা সব সময় তুলে ধরতে পারে তা নয়। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাই। ধরো, শিখণ্ডিনীতে যেমন আমি যৌন-সংখ্যালঘু মানুষের কথা বলেছি, তেমন আমার আরেকটি প্রযোজনা মুনস্ট্রাক (Moonstruck by Ashim Bandhu Bhattacharya), সেখানে একাকী মানুষের কথা বলেছি। একদিন অটো করে যাচ্ছি দেখছি আকাশের বিরাট চাঁদ একা একা ফুটেছে। হঠাৎ মনে হলো, আরে! আমিও তো ওই চাঁদের মতোই একা। তারপর জয় গোস্বামীর একটা কবিতায় পেলাম এক মধ্যবয়স্ক মহিলার কথা যিনি একাকী এবং ছাদে গিয়ে আকাশের চাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছেন। তৈরি হল, মুনস্ট্রাক। তারপর আমার আরেকটা প্রযোজনা ছিল ঘুঙুরের আত্মজীবনীর ওপর। এখন যেমন আমি গীতগোবিন্দের ওপর কাজ করছি। এটা বহু বছর আগে আমার ফরাসি ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে করেছিলাম। এখন আরও বিস্তারিত রূপে আসছে।”

নৃত্যশিল্পী অসীমবন্ধু ভট্টাচার্য-এর যে-কোনও প্রযোজনাই দেখার-মতো। কথক তথা সব শাস্ত্রীয়নৃত্যকেই কীভাবে আরও সময়োচিত করতে হয় অসীমদা সেক্ষেত্রে একজন প্রকৃত পথপ্রদর্শক। কিন্তু এই শিক্ষা তিনি পেলেন কোথায়? অসীমদা আলতো হেসে ওঠেন। ডুব দেন আনন্দের স্মৃতিতে। বলেন, “নাচকে কন্টেম্পোরাইজ করার শিক্ষাটা আমি কিন্তু কোনও নৃত্যগুরুর কাছে পাইনি। পেয়েছিলাম শ্রদ্ধেয় শ্যামানন্দ জালানের কাছে। উনি পদাতিক-এর সূত্রে বহু নৃত্যশিল্পীর জীবনের এক নতুন মোড় তৈরি করেছিলেন। কুমুদিনী লাখিয়া, সিতারাদেবী, কলানিধি মামি সহ অনেক দিকপাল শিল্পীকে পদাতিক-এ আহ্বান করে কলকাতার নৃত্যবিশ্বে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন জালানজি। আমি কুমুদিনী লাখিয়ার সঙ্গে কাজ করেছি। বহু কিছু শিখেছি। এবং আরেকজন ছিলেন যাঁর কাছ থেকে আমি রবীন্দ্রনাথ শিখেছি তিনি হলেন মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার। আমার আজ বলতে দ্বিধা নেই যে মঞ্জুশ্রীদির মতো নাচে রবীন্দ্রনাথকে অমন করে ইন্টারপ্রেট না কেউ করতে পেরেছে আর না কেউ কোনওদিন পারবে।”

আর প্রাথমিক ভাবে অসীমদা কার কাছে নৃত্যশিক্ষা করতেন? অসীমদা বলে ওঠেন, “আমি ছ’বছর বয়সে ঘুঙুর পড়ি। এবং তখনকার আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনে সেটা সাড়া ফেলে দিয়েছিল। আমি এমন একটা পরিবারে বড়ো হয়েছি যেখানে আমার মা বড়ে গুলাম আলি খানের শিষ্যা, দিদি ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা-ক্রিকেটার এবং আমার দাদাও ভারতীয় ক্রিকেটের জুনিয়র দলের সদস্য ছিলেন। কিন্তু আমি নাচ শিখছি আর দিদি ক্রিকেট- এটা যেন আমাকে হাসির পাত্র করে তুলেছিল। কারণ তখনকার দিনে মানে আজ থেকে পঞ্চান্ন বছর আগের কলকাতায় কেবল মেয়ে মানে নাচ আর ছেলে নাচ শিখছে মানে মেয়েলি। যেন মেয়েদের মতো হওয়াটা কত বড়ো অপরাধ! আমাকে টিটকিরি কেটেছে, হিজড়া বলেছে। পেছনে হেসেছে। অথচ সেই মানুষগুলোই আমার প্রোগ্রামের টিকিট চায় এখন। তবে আমাকে আগলে রাখতেন মা। তিনিই আমার জীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা। তারপর আমি গুরু রামগোপাল মিশ্র ও সুস্মিতা মিশ্র-এর কাছে কথক শিখি। তাঁদের কাছেই আমার কথকে হাতেখড়ি এবং সেই সময়, সেই বিরাশি সাল নাগাদ আমি জাতীয় স্কলারশিপ পাই। ছোটোবেলায় কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতাম আমি নাচই করবো। কাউকে তেমন চিনতাম না বলে বলতাম আমি উদয়শঙ্কর হব। জাতীয় স্কলারশিপ পাবার পর সিদ্ধান্ত নিলাম আমি নাচেই থাকবো। কিন্তু পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। জুলজিতে অনার্স ছিল আমার। মাস্টার্সে ভর্তি হবার আগেই সুনীল কোঠারিজি আমায় রবীন্দ্রভারতীতে পড়তে নিয়ে গেলেন। সেটা অন্য প্রসঙ্গ যদিও। এরপর পরই ডোভারলেন মিউজিক কনফারেন্সে নৃত্যে প্রথম হলাম। আবার রাজ্য সংগীত আকাদেমিতেও প্রথম স্থান অধিকার করলাম। তবে আমার জীবনের এক আমূল পরিবর্তন এলো যখন আমি পণ্ডিত বিজয়শঙ্করজির সংস্পর্শে এলাম। দিল্লিতেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। আমার ঘরানা তখন জয়পুর। খুব স্পিডে নাচতাম। কিন্তু বিজয়শঙ্করজির কাছে শিখলাম কথকের অ্যাসথেটিক্স। নিজের শরীরকে জানলাম। কোন বিভঙ্গে শরীরে কী গতি আসে, এক্সপ্রেশন কাকে বলে-এইসব আমার গুরু বিজয়শঙ্করজির কাছেই শিখেছি। লখনৌ ঘরানার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা গড়ে উঠেছে। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।”

আমার ঘরানা তখন জয়পুর। খুব স্পিডে নাচতাম। কিন্তু বিজয়শঙ্করজির কাছে শিখলাম কথকের অ্যাসথেটিক্স। নিজের শরীরকে জানলাম। কোন বিভঙ্গে শরীরে কী গতি আসে, এক্সপ্রেশন কাকে বলে-এইসব আমার গুরু বিজয়শঙ্করজির কাছেই শিখেছি।

আর নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে অসীমবন্ধু ভট্টাচার্যের মত কী? অসীমদা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, “দ্যাখো! নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা ভীষণ ইন্টেলিজেন্ট এবং তাদের হাতের মুঠোয় অনেক সুযোগ আছে। এখন এমনকি অনলাইনেও বড়ো বড়ো শিল্পীদের কাছে নাচ শেখা যায়, ওয়ার্কশপ করা যায়। কিন্তু মুশকিলটা হল এত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা গভীরতায় যেতে চায় না। তারা সাহিত্য পড়ে না। শুধু অ্যাচিভমেন্ট নিয়ে মেতে থাকতে চায়। লার্নিং যে একটা দীর্ঘ প্রসেস- সেই ধৈর্য তাদের নেই টিকে থাকার। আর এই ধৈর্যের অভাবেই আজ এই গুরু তো কাল সেই গুরুদের কাছে ছোটাছুটি করে। এতে হয় কী শাস্ত্রীয়নৃত্যের পরিসরটা সঙ্কুচিত হয়ে যায়। এটা তাদের বুঝতে হবে।” সেটা তো অবশ্যই। শিল্পীরা যত তাঁদের শিল্পের গভীরে প্রবেশ করবেন তত উৎকর্ষতা বাড়বে। আর তাতেই হয়তো গুরু অসীমবন্ধু ভট্টাচার্যের মতো শিল্পী তৈরি হবেন। এবং নির্মাণ হবে অপূর্ব সুন্দর সব প্রযোজনা।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by