শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পে তরুণ প্রজন্ম : সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ

পর্ব ২৪

যে-কোনও শিল্প তারুণ্য ব্যতীত এগিয়ে চলা দুষ্কর। তরুণতর শিল্পীরা একটা শিল্পের সম্ভাবনা আরও বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। ভারতীয় নৃত্য বিশেষত শাস্ত্রীয়নৃত্যের শিল্পীদের নিয়ে, নৃত্যজগতের নানা ঘাতপ্রতিঘাত, সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে ‘নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু’ ধারাবাহিক। এ যাবৎ বেশিরভাগ কলকাতা কেন্দ্রিক শিল্পীদের বিষয়ে আলোচনা চলেছে। তবে তাঁদের প্রত্যেকেই বরিষ্ঠ এবং প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। কিন্তু নৃত্যের ভবিষ্যৎ যাঁদের হাতে, তাঁদের কথাও বলা জরুরি। আমি নৃত্যবিশারদ নই, সমালোচক তো নই-ই। আমি দর্শক। হয়তো কখনও রসিকও। যেখানে যেমন ভাবেই মানুষ নেচে উঠুক আমি দু-চোখ ভরে দেখি। মানুষ যখন নৃত্য করে তখন আমার মনে হয় পৃথিবীর প্রথম নিয়মটা সে পালন করছে: কোথাও থেমে না থাকা! নৃত্য মানুষের সত্যিকারের ‘বেসিক ইন্সটিঙ্ক্ট’।

কলকাতার একটি নামী নৃত্য-উৎসবের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার সুবাদে অনেক তরুণ শিল্পীর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। আবার সমাজ মাধ্যমে বহু শিল্পীর নৃত্য আমি খুঁজেও বেড়াই। তাতে নিশ্চিত হই প্রবীণ শিল্পীরা অন্তত নৃত্যজগতকে অপটু হাতে ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছেন না। বরং, সঠিক রূপে লালিত হতে পারলে তরুণ শিল্পীরা কোনওদিন হয়তো তাঁদের বড়োদেরও ছাপিয়ে যেতে পারবেন একদিন। তবে এ-ও ঠিক যে বরিষ্ঠ শিল্পীদের শুধুমাত্র নৃত্যশিল্পী হিসেবে গড়ে উঠতে যেসব বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, আজকের শিল্পীদের সামনে সেসবের চেয়েও অনেক বেশি বন্ধন। তাঁদের নৃত্যজীবনের চ্যালেঞ্জ আরও জোরালো। তবু তাঁরা থেমে থাকছেন না।

পারমিতা ব্যানার্জি (গৌড়ীয়নৃত্য)
পারমিতা গৌড়ীয়নৃত্যের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। যেমন তাঁর নাচ তেমন নৃত্যবিষয়ক গবেষণাতে তিনি নিবেদিত প্রাণ। পারমিতাকে তো আজ থেকে দেখছি না। সেই কোন ছোটোবেলা থেকে। জীবনের প্রথম দিকে পারমিতা কথকনৃত্য অধ্যয়ণ করতেন। আরেকটু বড়ো হতে গৌড়ীয়নৃত্যের দিকে যান। ২০০০ সনের গোড়ায় ডঃ মহুয়া মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্য পাবার পর থেকে তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি (ডঃ মহুয়া মুখোপাধ্যায় : বাংলার গৌড়ীয়নৃত্যকে বিশ্বের মঞ্চে হাজির করেছিলেন যিনি)। সাংসারিক ঘাতপ্রতিঘাত এসেছে। বয়স্ক বাবা-মায়ের সেবা কিংবা ছোটো সন্তানটির পালন-পোষণ। সবকিছু করেও নৃত্যসাধনায় তিনি পথভ্রষ্ট হননি। তার সঙ্গে চলেছে গবেষণার কাজ। আমাদের দেশে মেয়েদের, বিশেষত বিবাহিত মেয়েদের নাচ চালিয়ে যাওয়া যেমন সহজ নয় তেমনই পিএইচডির অতগুলো বছর টিকে থাকাও ভালোরকম কঠিন। পারমিতা সবটাতেই জিতেছেন। ওঁর গৌড়ীয়নৃত্য প্রথম দেখেছিলাম কলকাতা রথযাত্রাতে জগন্নাথ রথের সামনে। একটা কমলা রঙের কস্টিউম পরে তিনি দেখিয়েছিলেন কৃষ্ণের কোনও একটি লীলা। যেমন এক্সপ্রেশন তেমন সুন্দর মুদ্রা। মহুয়াদির সৈনিক হয়ে বাংলার এই শাস্ত্রীয়নৃত্যকে পারমিতা দর্শকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন বিশ্বজুড়ে। আরও অনেক পথ হয়তো তাঁকে চলতে হবে কিন্তু প্রতিবারের মতো সেবারও তিনি সাফল্যের সঙ্গেই উত্তীর্ণ হবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।

মানুষ যখন নৃত্য করে তখন আমার মনে হয় পৃথিবীর প্রথম নিয়মটা সে পালন করছে: কোথাও থেমে না থাকা! নৃত্য মানুষের সত্যিকারের ‘বেসিক ইন্সটিঙ্ক্ট’।

দিব্যেন্দু তরফদার (কথাকলি)
বহু বছর আগে একাডেমিতে একদিন মণীশ মিত্রের সারারাতব্যাপী ‘উরুভঙ্গম’ নাটক দেখতে ঢুকেছি। নাটকটি এমনিতেই এত অসাধারণ যে চোখ ফেলা যায় না। তার ওপর এমন সব কুশীলব কাজ করতো সে-সময় যাদের অভিনয়ের ক্ষমতা ছিল দুর্দান্ত। একটা দৃশ্য ছিল অর্ধেক কথাকলি নৃত্যবেশে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পড়ে যাবে। ভয় নেই ডর নেই, ফটাস করে মঞ্চে পড়ে যাওয়া ছেলেটিকে দেখে খুব অবাক লাগত। তারপর যে বছর কলামণ্ডলম গৌতম আমাদের নৃত্যোৎসবে কথাকলি করলেন দেখলাম ওই দলেই সেই ছেলে রয়েছে। তারপর আর দিব্যেন্দুকে সামনাসামনি দেখিনি। গৌতমদা চলে যাবার পর সমাজ মাধ্যমে দিব্যেন্দুর কাজ দেখতাম। গৌতমদা যখন ছিলেন তখন নৃত্যশিল্পী হিসেবে খুব সাংঘাতিক দিব্যেন্দু ছিল না। কিন্তু গুরু প্রয়াণের পর নিজেকে ভেঙেচুরে, পরিশ্রম করে এমন একটা পর্যায়ে উন্নীত করলো যে সকলেই অবাক হল। এবার নিজের দল নিয়ে সে আমাদের উৎসবে কথাকলি পারফর্ম করলো যখন চার-পাঁচশো মানুষ সেই নাচ দেখে একেবারে মুগ্ধ। নাচ হিসেবে কথাকলি কঠিন। এবং কথাকলির মাধ্যমে অন্য ভাষার দর্শকদের মনোনিবেশ ধরে রাখা বেশ দুরূহ। কিন্তু দিব্যেন্দু যেন সবটাই পেরেছিল সেদিন। অভূতপূর্ব ছিল তার পারফরম্যান্স। এখন দেশ-বিদেশের নানা জায়গায় কথাকলি প্রদর্শন করে সে। এখন গুরু কলামণ্ডলম শুচিন্দ্রনের শিষ্য। ভবিষ্যতে বাংলাকে সে আরও গর্বিত করবে।

মৃণালিনী বিশ্বাস (ভরতনাট্যম)
আমাদের উৎসবে অংশগ্রহণ করবেন বলে অনেক শিল্পী সিভি পাঠান। উৎসবের মান ধরে রাখতে সব শিল্পীদের আমরা নিতে পারি না ঠিকই, কিন্তু তরুণ শিল্পীরা নৃত্যশিল্পে নিজেদের ধরে রাখতে এত পরিশ্রম এবং কৃচ্ছসাধন করেন যে ইচ্ছে করে সবাইকেই সুযোগ করে দিই। সে-কারণে বড়ো উৎসবের পাশাপাশি অনেকগুলি ছোটো অনুষ্ঠান আমরা করতাম। এমনই একবার মৃণালিনীর নাচ আমরা সংগঠিত করি। এবং কলকাতা শহরে ভরতনাট্যমের এত ভালো একজন তরুণ শিল্পী আছেন আমরা ভাবতেও পারিনি। নৃত্ত, নৃত্য ও নাট্য- প্রতি ক্ষেত্রেই মৃণালিনী অতুলনীয়। যে-কোনও মানের দর্শক মৃণালিনীর নাচ দেখে অভিভূত হয়ে পড়তে পারে। যামিনী কৃষ্ণমূর্তি, ইন্দিরা রাজন আর ইন্দিরা কদম্বীর সুযোগ্য ছাত্রী মৃণালিনীর এমন উচ্চাঙ্গের ভরতনাট্যম চালিয়ে গেলে সেদিন দূরে নয় তিনি একদিন ভুবন বিখ্যাত হবেন। মনখারাপ হলে আমি সমাজমাধ্যমে মৃণালিনীর নাচ খুলে বসি। মন নিমেষে ভালো হয়ে উঠতে এক্কেবারে সময় লাগে না।

সন্দীপ কুণ্ডু (কুচিপুড়ি)
এই একটি শাস্ত্রীয়নৃত্যের চর্চা কলকাতায় তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। গুরু বলতে শ্রদ্ধেয়া মাধুরীদি কিংবা চেন্নাইয়ে শ্রীময়ীদি। বেশিরভাগ শিল্পীই শাখা-প্রশাখায় এই দুজন গুরুর শিষ্য-প্রশিষ্য। শ্রীময়ীদির সঙ্গেই আমি সন্দীপকে প্রথম দেখি। হাড়গিলে, লিকলিকে শরীরের একটা ছেলে যার হাসিটা খুব সুন্দর। তখন বিরাজ রায়ের ছাত্র সন্দীপ। এখনও বিরাজের শিষ্যত্বেই আছে। কিন্তু এই কয়েক বছরে সন্দীপ এত অপূর্ব নিজেকে কুচিপুড়ি নৃত্যে সাফল্যমণ্ডিত করেছে শুধু নয় পুরুষ শিল্পী হিসেবে বোধ করি সে প্রথম যে কলকাতা থেকে কুচিপুড়িতে কেন্দ্রীয় সরকারের স্কলারশিপ পেয়েছে। বাংলাকে গর্বিত করেছে সন্দীপ। যেমন সুন্দর শারীরিক গঠন তার, তেমন সুন্দর নাচ। কুচিপুড়ি নৃত্য কঠিন। থামার জায়গা কম এই নাচে। দম লাগে প্রচুর। কী অপূর্ব ভাবে পুরোটাই সন্দীপ অধ্যয়ণ করে নিয়েছে তা দেখলে অবাক হতে হয়। অনেক, অনেক সম্ভাবনা এই তরুণ শিল্পীর।

সায়নী মণ্ডল (কথক)
গুরু মধুমিতা রায়ের ছাত্রী সায়নী কলকাতার মেয়ে নয়। সে প্রবাসী বাঙালি। কিন্তু ছাত্রাবস্থা থেকে সে এই শহরে এবং কথকনৃত্যের একজন চেনা মুখ। সায়নীর নাচের একটি বিশিষ্টতা তার স্টাইল। স্টাইল জিনিসটাই কথকের মূল কথা। এই নাচের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে ‘অদা’র কথা বিশেষজ্ঞরা বলেন সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সায়নী প্রথম থেকেই তার নাচে ধরেছে। ও যখন একটা চক্কর দিয়ে এসে বসে এবং ঘাগরাটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে সেটা একটা প্রকৃত দেখার মতো দৃশ্য হয়ে ওঠে! এত নরম হাত-পায়ের মুদ্রা, এত নির্মল অভিনয় সে এই সামান্য কয়েকটি বছরে অর্জন করেছে সেটা তার নাচকে শুধু নয় সমগ্র নৃত্য ধারণাকেই একটা সুন্দর অভিব্যক্তিতে মিশিয়ে দিয়েছে। কলকাতার বুকে কথক একটি জনপ্রিয় শাস্ত্রীয়নৃত্য এবং এই নৃত্যের চর্চায় রয়েছে বহু বাঙালি ছেলেমেয়ে। কিন্তু সায়নীর নাচ অনেককে ছাপিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। সায়নী আরও যে নাম করবে তা নিয়ে আমাদের কোনও সংশয় নেই।

বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী (ওডিসি)
সারা দেশের মধ্যে কলকাতা শাস্ত্রীয়নৃত্য বিশেষত ওডিসির একটা পীঠস্থান যদি বলি তবে ভুল হয় না। প্রায় পঞ্চাশটি বছর কলকাতার বহু শিল্পী এই নৃত্য চর্চা করে চলেছেন এবং ভুবনজয়ী হয়েছেন। যেমন নারী শিল্পীরা ছিলেন তেমনই বহু পুরুষ শিল্পী। গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র এক সময় কলকাতাকে মনে করতেন তাঁর দ্বিতীয় বাসস্থান। কিন্তু এ-ও সত্য যে জনপ্রিয়তা এই নাচে যেমন আছে আভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাও কিছু কম নেই। কিন্তু তার মধ্যেও তরুণ শিল্পীরা টিকে রয়েছে শুধু নয়, গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রেখে যাচ্ছে। আজ কলকাতার তরুণ এবং পুরুষ ওডিসি নৃত্যের জনপ্রিয় মুখ বিশ্বজিৎ। বর্তমানে গুরু সুজাতা মহাপাত্রের শিষ্যত্ব সে গ্রহণ করেছে। যে-কোনও দর্শক তার ওডিসি দেখলে অবাক হয়ে যায়। ওডিসি নৃত্যের সব প্রকোষ্টে সে শক্তিমান। যেমন সুন্দর নৃত্য তেমন বলিষ্ঠ অভিনয়। বিশ্বজিত যে শুধু নিজে দুর্দান্ত পারফর্ম করে তা নয় ক্রমাগত বিভিন্ন ছাত্রছাত্রীদের ওডিসি শিখিয়ে এমন একটা গোষ্ঠী সে তৈরি করে নিয়েছে তা তার বয়স দেখলে অবাক হতে হয়। মুগ্ধও হতে হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় কলকাতার বড়ো বড়ো মঞ্চে তাকে সেই তুলনায় কম দেখা যায়। এটা হওয়া উচিত নয়। বিশ্বজিতের মতো তরুণ শিল্পীদের দর্শকরা যতো দেখবে শাস্ত্রীয়নৃত্য সম্বন্ধে তাদের ধারণা আরও উন্নত হবে।

আগেই বলেছি আমি বিশারদ নই। আর উপরের তালিকাটি কোনও গুরুত্বপূর্ণ দলিল নয়। সেজন্যই মাত্র কয়েকজন শুধু শাস্ত্রীয়নৃত্যের তরুণ শিল্পীদের কথা বলা গেল। কিন্তু এটা সত্য যে আমাদের শহর কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এমন অনেক তরুণ শিল্পী কাজ করছে যারা একদিন অনেক নাম করবে। তবে শুধু কলকাতাতেই নয় এমন শিল্পী সমগ্র বাংলা জুড়ে তো আছেই, অন্য শহরে গিয়ে এলেমের সঙ্গে কাজ করছে এরকম বহু বাঙালি ছেলেমেয়েও আছে। সংস্কৃতি জগৎ ও সরকারের উচিত আরও অনেকটা করে তাদের পাশে দাঁড়ানো।

______
কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।

Written by